পারিনি। তারপর আস্তে আস্তে জানলাম। খুব ভয় পেয়েছিলাম, প্রতিদিন সকালে দাদা দেখতে যেতেন কী হচ্ছে। তখন হত্যাযজ্ঞ চলছে। প্রতিদিনই দাদা এসে বলতেন, কিছু নেই, সব শেষ হয়ে গেছে। এভাবেই ভয়ে ভয়ে দিনরাত কেটেছে। এপ্রিলের মাঝামাঝি, আমাদের বাড়ির সামনে আর্মি টহল বসলো। দিনের বেলা তারা হাঁটাহাঁটি করতো। রাত হলেই ঠকঠক বুটের শব্দ, মনে হতো যেন বুকের মাঝে আঘাত হচ্ছে। তখন আমরা শুনেছি বাড়ি বাড়ি গিয়ে মা-বোন ও সন্তানদের হত্যা করছে ওরা। ওদের ভয়ে রাতে ঘুমাতে পারতাম না। আমার বয়স কম, মাত্র এক বছর আগে বিয়ে হয়েছে। আমার মা ও ভাইয়েরা বললো, যুবতী মেয়েদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে, তুমি চলে যাও। মে মাসে ভারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। মায়ের বোরখা পড়েছি, যাতে কেউ সহজে বয়সটা অনুমান করতে না পারে। আমার গহনাগুলো মা আমাকে সাথে নিয়ে যেতে বলেন, ছয় ভরি সোনার গহনা ও দেড় ভরি ওজনের চেইন সাথে নয়শ’ টাকা। মা বললো, পথে যদি হানাদার বাহিনীরা ধরে তাহলে এই গহনাগুলো দিয়ে অন্তত ইজ্জত বাঁচানোর চেষ্টা করবে। পয়সার চেয়ে ইজ্জত বড়। রাস্তায় শসা ও পানি নিয়ে অনেক লোক বসে আছে। বিক্রির জন্য নয়, যারা ঢাকা ছাড়ছে তাদের এমনিতেই খাওয়াতেন তারা। আমিও খেয়েছি। ভাগ্য ভালো, ভালোভাবেই বর্ডারের কাছাকাছি একটি গ্রামে আশ্রয় নিলাম। ওই গ্রাম দিয়ে হাজার হাজার মানুষ পার হচ্ছে বলে একটি বাড়িতে গ্রামের বৌ-ঝিরা বিরাট বিরাট হাঁড়িতে রান্না করছে। লাউ, লেবু, ডাল আর ভাত। যে যাচ্ছে তাকেই বিনামূল্যে খেতে দিচ্ছে। খুব তাড়াহুড়ো রান্না করছে বলে প্রায় অর্ধসিদ্ধ। সেই অর্ধসিদ্ধ খাওয়া খেয়ে মনে হয়েছে জীবনের শ্রেষ্ঠ খাওয়া খেয়েছি। উঠোনে বসে খেয়েছি। রাতে যাওয়ার পথে গ্রামের মানুষের এই আচরণ, সহানুভূতি, মমতা, ভালোবাসা, একের প্রতি অন্যের টান যে কতটা মধুর তা উপলব্ধি করেছি। পরদিন বর্ডার ক্রস করবো, হঠাত্ জিপ ও গোলাগুলির শব্দ। দৌড়ে জঙ্গলে পালালাম। গাড়িটা চলে গেলে বর্ডার ক্রস করলাম। আগরতলার আগের একটি গ্রাম বসন্তপুর, সেখানে উঠেছিলাম। একই বাসায় আমরা প্রায় চারটি পরিবার থেকেছি। সেখানে রাত প্রায় ৪টার দিকে গোলাগুলি হচ্ছে। মাটির ঘরে ছিলাম, ঘর কাঁপতে শুরু করলো। আমরা ভেবেছি, বোধহয় আর বাঁচবো না। অনেকক্ষণ ধরেই এ অবস্থা, তাই একটু দরজা দিয়ে উঁকি দিই। দেখি চার-পাঁচজন লোক লুঙ্গি অর্ধেক ভাজ করে পরে আছে। তাদের পাশে অনেক অস্ত্র। হঠাত্ তারাও আমাকে দেখে ফেললো। বললো, ‘আপনারা ভয় পাবেন না, আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা অপারেশন চালাচ্ছে, আমরা দেশ স্বাধীন করবো।’ এই কথাটি শোনার পর কী যে ভালো লেগেছিল। তারপর আগরতলা এবং সেখান থেকে দিল্লিতে চলে যাই। তারপর ১৬ ডিসেম্বরের কথা শুনে দেশে ফিরি। কিন্তু এই যুদ্ধে আমি আমার ভাইকে হারিয়েছি। তবুও এই মহান একাত্তর আমার, আমাদের অহঙ্কার।