জ্বালানি তেল নিয়ে জটিল হচ্ছে বিশ্ব পরিস্থিতি

জ্বালানি তেল নিয়ে একপ্রকার তেলেসমাতি চলছে। কোনো কারণ না থাকলেও শিল্প উত্পাদন এবং নিত্য ব্যবহার্য এ পণ্যটির দাম কমে যাচ্ছে হু হু করে। গত বছরের মাঝামাঝিতেও প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম ছিল ১১০ মার্কিন ডলারের ওপরে। কিন্তু এক বছরের ব্যবধানে এসে সে তেলের দাম এসে পড়েছে ৩৫ ডলারে।
 
অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে তেল কোম্পানিগুলো থেকে দুই লক্ষাধিক শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে। এছাড়া তেল খনিতে খননের কাজ দুই-তৃতীয়াংশ কমিয়ে দিয়েছে কোম্পানিগুলো। নতুন নতুন কূপ খনন কাজও বন্ধ রেখেছে তারা। এর ওপর যুক্তরাষ্ট্র তার কাছে থাকা রিজার্ভের তেল বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হচ্ছে। যেসব দেশের অর্থনীতি জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল সেসব দেশ পড়বে বেশ সমস্যায়।
 
যুক্তরাষ্ট্র তার বাজেট ঘাটতি কমিয়ে আনতে মজুদ করা জ্বালানি বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ লক্ষ্যে একটি বিল শিগগির কংগ্রেসে উঠার অপেক্ষায়। গত ছয় বছরে যুক্তরাষ্ট্র তার তেল উত্পাদন দ্বিগুণ করেছে। এর আগে সৌদি আরব, নাইজেরিয়া এবং আলজেরিয়া থেকে তেল কিনে তা যুক্তরাষ্ট্র মজুদ করলেও এখন এই দেশগুলো তাদের তেল বিক্রির জন্য এশিয়ার দিকে বেশি নজর দিচ্ছে।
 
কানাডা এবং ইরাকের তেল উত্পাদনও দিন দিন বাড়ছে। অর্থনৈতিক মন্দায় পড়ে রাশিয়াও তেল বিক্রি বাড়িয়েছে। এসব কারণে তেলের দাম দিন দিন পড়ে যাচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এছাড়া ইউরোপসহ অনেক উঠতি অর্থনীতির দেশের অর্থনৈতিক মন্দা এবং দিন দিন জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি আবিষ্কার হবার কারণে তেলের চাহিদা সেসব দেশেও কমে যাচ্ছে।
 
তবে তেলের দাম কমে যাবার পেছনে অনেকে ষড়যন্ত্রের তত্ত্বও আবিষ্কার করেছেন। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান এবং রাশিয়াকে বিপদে ফেলতে সৌদি আরব তেলের উত্পাদন বাড়িয়ে দাম কমানোর ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রও তাই করছে বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করে বলা হয়, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পেছনেও এই ষড়যন্ত্র কাজ করেছে। এই ষড়যন্ত্রের পক্ষে যুক্তিও দেয়া হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরবের সামপ্রতিক কর্মকাণ্ড সবার মনে এ ধারণার জন্ম দিয়েছে। ওবামা প্রশাসন ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মকাণ্ড চালানো কোম্পানিগুলোকে শেয়ারহোল্ডারদের কাছে জবাবদিহিতা বাড়াতে বলেছেন। অনেকে এটিকে একটি প্রচ্ছন্ন চাপ হিসাবে ধরে নিয়েছেন।
 
যুক্তরাষ্ট্রের একজন ভোক্তা পরিবহনের জ্বালানি খাতে এখন বছরে আগের চাইতে ৭৫০ ডলার কম খরচ করছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোও অনুরূপ সুবিধা পাচ্ছেন। কিন্তু বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশে তেলের দাম কমার কোনো লক্ষণ নেই। তেলের দাম কমে যাবার কারণে অনেক দেশের অর্থনীতি সঙ্কটের মধ্যে পড়েছে। বিশেষ করে ইরান, নাইজেরিয়া, রাশিয়া, ইকুয়েডর, ব্রাজিল প্রভৃতি দেশ তাদের তেল উত্পাদন বাড়িয়ে অর্থনীতি ঠিকঠাক রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু তেলের চাহিদা কমে যাওয়ায় সে চেষ্টায়ও সফল হচ্ছে না তারা। শেভরন এবং শেল কোম্পানি ইতোমধ্যে তাদের কোম্পানি থেকে কর্মী ছাঁটাইয়ের পাশাপাশি সুবিধা কমানোর ঘোষণা দিয়েছে।
 

পড়তি বাজার থেকে তেলকে উদ্ধারের কোনো পরিকল্পনা তেমন দেখা যাচ্ছে না। তেল নিয়ে যে যুদ্ধ চলছে তা ২০১৬ সালের মধ্যেও থামার সম্ভাবনা নেই। কিছু কিছু উদীয়মান অর্থনীতির দেশ তাদের অর্থনীতি চাঙ্গা করার উদ্যোগ নিয়েছে। এটি চলতে থাকলে আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে দাম কিছুটা বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।