অষ্টম জাতীয় পে-স্কেলে বেতন বৈষম্য আর পদমর্যাদা নিয়ে সৃষ্ট জটিলতায় সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থা অবসানের দাবিতে তারা আন্দোলন-সংগ্রামের পথে অগ্রসর হচ্ছেন। বস্তুত ক্ষোভে ফুঁসছেন কর্মচারীরা। সরকারি কলেজের শিক্ষকরা পরীক্ষা বর্জন করার মতো কঠিন পথ নিয়েছেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আন্দোলনে নামার যৌথ ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন। আন্দোলন শুরু করেছেন প্রশাসন বহির্ভূত অন্য সব ক্যাডার-নন-ক্যাডার কর্মচারীরা। কেন্দ্রীয় বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মচারীরাও আন্দোলনে নেমেছেন।
প্রকৃচি-বিসিএস (২৬ ক্যাডার) সমন্বয় কমিটি
জাতীয় বেতন স্কেলের মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে সৃষ্ট বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত বাতিল এবং বিরাজমান অন্যান্য বৈষম্য নিরসনের দাবিতে প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, চিকিত্সক ও বিভিন্ন ফাংশনাল সার্ভিসের কর্মচারীরা আজ বুধবার সারাদেশে বেলা ১২টা থেকে এক ঘন্টার মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করবেন। কেন্দ্রীয়ভাবে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এ কর্মসূচি পালন করা হবে। এছাড়া ২৪ ডিসেম্বর সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি প্রদান, ২৭ থেকে ৩০ ডিসেম্বর প্রতিদিন বেলা ১২টা থেকে এক ঘন্টার কর্মবিরতি পালন করা হবে। ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে দাবি মানা না হলে লাগাতার কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। ঘোষিত কর্মসূচির আওতায় ২০ ডিসেম্বর থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত কালো ব্যাজ ধারণ কর্মসূচি চলছে।
প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় কমিটি সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল পুনর্বহাল করা, প্রথম শ্রেণির চাকরিতে যোগদানের ক্ষেত্রে ক্যাডার, নন-ক্যাডার বৈষম্যের সিদ্ধান্ত বাতিল, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিতের সিদ্ধান্ত বাতিল, ইউএনওকে কর্তৃত্ব প্রদানমূলক মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অফিস স্মারক অবিলম্বে বাতিল, আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন, সকল ক্যাডার ও সার্ভিসে পদোন্নতির সমান সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে সুপারনিউমারারি পদ সৃজন করা, নিজস্ব ক্যাডার ও ফাংশনাল সার্ভিস বহির্ভূত সকল ধরনের প্রেষণ বাতিল ও কৃত্য পেশাভিত্তিক প্রশাসন গড়ে তোলার জোর দাবি জানিয়েছেন।
বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতি
সমিতির সভাপতি নাসরীন বেগম অভিযোগ করেন, ঘোষিত পে-স্কেলে বৈষম্য দূর করার পরিবর্তে নতুন করে আরও বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছে। তিনি বিভিন্ন দাবি তুলে ধরে সরকারকে আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান। না হলে আগামী ৪ ও ৫ জানুয়ারি সারাদেশে সকল সরকারি কলেজের শিক্ষক পরীক্ষা বর্জনসহ পূর্ণ দিবস কর্মবিরতি পালন করবে। আগামী ২২ জানুয়ারি ঢাকায় জরুরি সাধারণ সভা করে পরবর্তী কর্মসূচি দেয়া হবে।
নাসরীন বেগম বলেন, বেতন কাঠামো চূড়ান্তের আগে অর্থ সচিবের সঙ্গে শিক্ষকদের সভায় শিক্ষা ক্যাডারের বৈষম্য নিরসনে সচিব আশ্বস্ত করেছিলেন। কিন্তু গেজেটে কোনো দিক-নির্দেশনা নেই। এটা আমাদের সঙ্গে রীতিমত প্রতারণা করা হয়েছে। অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মতো ১ জুলাই থেকেই পঞ্চম গ্রেডের সহযোগী অধ্যাপকদের, অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে তৃতীয় গ্রেডের বেতন দিতে সরকারি আদেশ জারির দাবি জানান নাসরীন। নায়েম মহাপরিচালক, এনসিটিবি চেয়ারম্যান, সব শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং জেলা সদরের অনার্স ও মাস্টার্স কলেজের অধ্যক্ষের পদকেও গ্রেড-১ এ উন্নীত করাসহ ৬ দফা দাবি জনানো হয়। বিকল্প ব্যবস্থা চালু না হওয়া পর্যন্ত সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল বহাল রাখার দাবি জানানো হয়।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন আগামী ২৭ ডিসেম্বর সকাল ১১টায় সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একযোগে সংবাদ সম্মেলন, ২ জানুয়ারির পূর্বেই সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাধারণ সভা করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ, ২ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ১০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাব ভবনে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের ডাকে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রতিনিধি সম্মিলন হবে। পরে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে কর্মসূচি ঘোষিত হবে।
গতকাল সকালে ফেডারেশনের সভায় বেতন কাঠামো পর্যালোচনা করে বলা হয়, বর্তমান অবস্থায় অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামো বাস্তবায়িত হলে সপ্তম জাতীয় বেতনকাঠামোর তুলনায় গ্রেড-১ প্রাপ্ত শিক্ষকের সংখ্যা অর্ধেক কিংবা তারও নিচে নেমে আসবে। উপরন্তু, গ্রেড-১ প্রাপ্ত শিক্ষকদের থেকে সুপারগ্রেডের ২য় ধাপে যাওয়ার কোনো সুযোগ ও নির্দেশনা এই গেজেটে কিংবা অন্য কোনো পরিপত্রে এ পর্যন্ত পরিলক্ষিত হয়নি।
সভায় সংগঠনের সভাপতি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ ও মহাসচিব অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল উপস্থিত ছিলেন। সভা থেকে জানানো হয়, গত ৬ ডিসেম্বর অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে তার বাসভবনে শিক্ষক প্রতিনিধিদের সাক্ষাতে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের দাবিসমূহ পূরণের সুষ্পষ্ট আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রকাশিত গেজেটে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক
অষ্টম পে-স্কেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মর্যাদার অবনমন করার সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা। বৈষম্য দূর করে সর্বোচ্চ পদ নির্বাহী পরিচালককে গ্রেড-১ এবং প্রবেশ পদ সহকারী পরিচালককে ৮ম গ্রেড করার দাবি জানিয়েছেন তারা। দাবি না মানা হলে কঠোর কর্মসূচি পালনের হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে। গতকাল এসব দাবিতে প্রতিবাদ সমাবেশ ও সংবাদ সম্মেলন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল।
গতকাল বিকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুক্তিযোদ্ধা পরিষদ কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবদান থাকা সত্ত্বেও গেজেটে বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়ন অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। বাংলাদেশ ব্যাংককে কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক, আনসার-ভিডিপি ব্যাংক, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক ও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের সমমর্যাদার করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকাকে খাটো করা হয়েছে।
তিনি বলেন, জাতীয় পে-স্কেলে কোনো প্রতিষ্ঠানে ১০০ জন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তার বিপরীতে একজন করে গ্রেড-১ কর্মকর্তা নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৩ হাজার প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা রয়েছে। কিন্তু সর্বোচ্চ প্রমোশনাল পদ নির্বাহী পরিচালককে গ্রেড-২ করা হয়েছে। আগে সহকারী পরিচালক পদে নিয়োগপ্রাপ্তরা বিসিএস ক্যাডার ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মতো প্রথম শ্রেণির মর্যাদা পেতেন। এখন অন্যদের অষ্টম গ্রেড করা হলেও সহকারী পরিচালক পদকে নবম গ্রেড করা হয়েছে। এটি হঠকারী সিদ্ধান্ত।
কাউন্সিলের সভাপতি মো. ছিদ্দিকুর রহমান মোল্লা বলেন, বৈষম্য দূর করতে আমাদের তিন দফা দাবি হচ্ছে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংককে গেজেটে আলাদাভাবে প্রদর্শন করতে হবে। নির্বাহী পরিচালক পদকে ১ম গ্রেডে উন্নীত করতে হবে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যোগদানকারী সহকারী পরিচালক প্রবেশ পদ জাতীয় স্কেলে ৮ম গ্রেডে নির্ধারণ করতে হবে।
ছিদ্দিকুর রহমান আরো বলেন, আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি স্বতন্ত্র পে-স্কেল বাস্তবায়ন না করে আমাদের অবনমন করা হয়েছে। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকে মেধাবীরা আসবে না।
ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী দাবি আদায়ের জন্য আজ বুধবার প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করবে কাউন্সিল। আগামী ২৭ ডিসেম্বর থেকে ক্যালোব্যাজ ধারণ করা হবে। এরমধ্যে দাবি আদায় না হলে কঠোর কর্মসূচি পালন করার হুঁশিয়ারী দিয়েছেন নেতারা।
এর আগে সকালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চত্বরে প্রতিবাদ সমাবেশ করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।