রেলওয়ের উন্নয়নে ২০১১ সালের ডিসেম্বরে গঠন করা হয় রেলওয়ে মন্ত্রণালয়। বেড়েছে বরাদ্দ। গত ৫ বছরে ২১ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় করা হয়েছে রেলওয়ের জন্য। রেলপথে চলাচলকারী মানুষ আশা করেছিল, রেলযাত্রা সুগম হবে। কিন্তু বরাদ্দ বাড়ানো এবং ভালো সেবার লক্ষ্যে ভাড়া বাড়ানোর পরও বাড়েনি যাত্রী সেবার মান। অপরদিকে উন্নয়নে গৃহীত ৫৩টি প্রকল্পের অর্ধেকেরই বাস্তবায়নের গতি খুবই শ্লথ। শুধু এখানেই শেষ নয়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যাত্রী নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়েও কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। নিরাপত্তা প্রদানকারী রেলওয়ে পুলিশের অবস্থা ‘ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার’-এর মতোই রয়ে গেছে।
প্রাপ্ততথ্যে জানা যায়, ১৯ কামরার এক্সপ্রেস ও মেইল ট্রেনের নিরাপত্তা দেয় ৪-৫ জন রেল পুলিশ সদস্য। যাদের বেশির ভাগ লাঠিধারী কনস্টেবল। টহল বাহিনীর নেতৃত্ব দেন বড়জোর একজন এএসআই কিংবা এসআই। তাও আবার রাতের ট্রেনগুলোতে। টহল পুলিশ কর্মীরা যাতে নিজেদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে পারেন সেজন্য নেই কোনো ওয়াকিটকি। ফলে ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনেই যোগাযোগ রাখতে হয় টহল পুলিশকে। রেলওয়ের (দুই অঞ্চলের) প্রতিদিন ২৮০৭ কিলোমিটার রেলপথে ২৮৮টি ট্রেনে প্রায় আড়াই লাখ যাত্রী চলাচল করে থাকেন। আর সারাদেশে রেলওয়ে স্টেশন ৪৪৩টি।
যাত্রী নিরাপত্তায় নিয়োজিত রেলওয়ে পুলিশের আধুনিকায়ন ও তাদের লজস্ট্রিক সাপোর্টের ব্যাপারে রেলপথ মন্ত্রী মুজিবুল হক বলেন, পর্যায়ক্রমে তা বৃদ্ধি করা হবে। তবে তিনি যাত্রী নিরাপত্তা, যাত্রী সেবা এবং কোনো ধরনের অব্যবস্থা রয়েছে বলে মনে করেন না।
যারা নিয়মিত ট্রেনে যাতায়াত করেন তারা বলেছেন, অনেক সময় নির্ধারিত সময়ে ট্রেন পৌঁছায় না। এটা মানুষের গা সওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নিরাপত্তা। তারা বলেন, ট্রেনের ভাড়া বেড়েছে। কোনো কিছুর মূল্য বৃদ্ধিতে কেউ সন্তুষ্ট হতে পারে না। তবে যদি এর মান উন্নত হয় তবে সহজেই তা সবাই মেনে নেবে।
তারা বলেন, ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে আন্তঃনগর ট্রেনে সময় লাগে ৭-৮ ঘণ্টা। কখনো কখনো ১০ ঘণ্টাও লেগে যায়। অথচ নব্বইয়ের দশকে ৫ ঘণ্টায় এ পথে যাতায়াত করা যেত। স্টপেজ ক্রমেই বাড়ানোয় আন্তঃনগর ট্রেন এখন অনেকটাই লোকাল ট্রেনে পরিণত হয়েছে। এছাড়া ট্রেনের সিটের অবস্থা খুবই নাজুক। ছারপোকায় ভর্তি সিটগুলো। টয়লেটে যাওয়ার উপায় নেই। নেই পানি, দরজা বন্ধ হয় না, জ্বলে না আলো। টিকেটধারী যাত্রীদের পাশাপাশি বিনা টিকেটের যাত্রী, শত শত হকার ইত্যাদির ঠেলায় ট্রেনে যাতায়াত করাই দায়। যাত্রীদের এসব সমস্যা দেখার কেউ নেই। নিয়মিত মনিটরিংয়ের অভাব, মন্ত্রণালয়ের গাছাড়া ভাব, মাঠে না গিয়ে অফিসে বসে রেল নিয়ন্ত্রণ, রেল বেসরকারিকরণ, মান্ধাতার আমলের লাইন মেরামত না করা, কর্মীর অভাবসহ নানাবিধ অনিয়ম-দুর্নীতিকে দায়ী করেছেন যাত্রীরা।
রেলওয়ে পুলিশের প্রধান ডিআইজি এম রুহুল আমিন রেল পুলিশের জনবল সংকটের ব্যাপারে বলেন, রেল পুলিশের দুটি জোন রয়েছে, চট্টগ্রাম এবং সৈয়দপুর জোন। চট্টগ্রাম জোনে ১২ রেলওয়ে থানা, সতেরটি ফাঁড়ি ও চারটি সার্কেল রয়েছে। আর সৈয়দপুর জোনে ১২ থানা, সতেরটি ফাঁড়ি এবং চারটি সার্কেল রয়েছে। মোট জনবল ১ হাজার ৬০৪ জন। রয়েছে ১১৯ কিলোমিটার পথের জন্য একটি থানা। নতুন জনবল ৭৮১ জন মঞ্জুর হয়েছে। কিন্তু এখনও পাওয়া যায়নি।
রেল পুলিশের থানা ও ফাঁড়ির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, এগুলো দীর্ঘ দিনের পুরনো। অধিকাংশ ভবনের প্লাস্টার খসে পড়েছে। কর্মকর্তাদের বসার মতো ভালো কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে রেলওয়ে থানা ও ফাঁড়ির জন্য রেল কর্তৃপক্ষের কাছে জায়গা বরাদ্দ দেয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে রেলকর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেল পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে রেল পুলিশ বরাবরই উপেক্ষিত। রেল কর্তৃপক্ষের যেটুকু সহায়তা প্রদান করার কথা তার সিংহভাগই অনুপস্থিত। বার বার তাগিদ দেয়ার পরও এদিকে কারও নজরও নেই। দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যের নির্ধারিত সময়ের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়। কিন্তু তাদের বসা ও বিশ্রামের নেই কোনো ভালো ব্যবস্থা।
গতকাল বুধবার কমলাপুর স্টেশনে চট্টগ্রামগামী ট্রেনের একাধিক যাত্রী অভিযোগ করে বলেন, চলতি মাসে যাত্রী সেবার লক্ষ্যে যাত্রী সেবাসপ্তাহ পালন করে রেল কর্তৃপক্ষ। উদ্বোধনের দিন রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কমলাপুর স্টেশনের প্লাটফরমে দাঁড়ানো ট্রেনে যাত্রীদের ফুল ও চকলেট দিয়ে সেবা সপ্তাহের শুভেচ্ছ জানান। সেবা বলতে ওইটুকু।