প্রতিদিন আবহমান সূর্য ওঠে দশ দিগন্ত আলো করে। দিন ফুরিয়ে দিন আসে নতুন হয়ে। উল্টে যায় গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের একেকটি জীর্ণ পাতা। জগতের এ এক শাশ্বত রীতি যে, পুরনো বিদায় নেয়। নতুন আসে। নতুনের হাত ধরে উন্মোচিত হয় সম্ভাবনার দ্বার। আবহমানকাল থেকেই নতুনের জন্য মানুষের অবিরল প্রতীক্ষা। নতুনকে ঘিরেই জন্ম নেয় দিগন্ত ছাড়িয়ে যাওয়া আকাঙ্ক্ষা। রাত যত গভীর হয়, নতুন সূর্য, নতুন সম্ভাবনা, নতুন দিন ততই নিকটবর্তী হয়। সেই সত্যের ওপর ভর করেই আজ বিদায় নিচ্ছে আরও একটি বছর। আজ কালস্রোতের ঊর্মিমালায় বিলীন করে পশ্চিম দিগন্তে মিলিয়ে যাবে যে সূর্য তা ‘পুরানো সেই দিনের কথা’। ‘কালের যাত্রার ধ্বনিতে’ কালপ্রভাতে ‘রবির কর’ পুবে আলোকের নাচন তুলে চোখ মেলবে নতুন দিনে, নতুন বছরে। বিদায় ২০১৫।
শুভ নববর্ষ ২০১৬। এক বছরের আনন্দ-বেদনা, আশা-নিরাশা আর সাফল্য ব্যর্থতার পটভূমির ওপর আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশ নতুন বছরে পর্বতদৃঢ় একতায় সর্ববিপর্যয়-দুঃসময়কে জয় করবে অজেয়-অমিত শক্তি নিয়ে-এ সংকল্পে।
সময় যেন এক প্রবহমান মহাসাগর। কেবলই সমুখে তার এগিয়ে যাওয়া, পেছনে ফেরার সুযোগ নেই। কিন্তু যে বছরটি হারিয়ে গেল জীবন থেকে, ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে, তার সবই কি হারিয়ে যাবে? মুছে যাবে সব? না, সবকিছু মুছে যায় না।
ঘটনাবহুল ২০১৫-এর অনেক ঘটনার রেশ টেনেই মানুষ এগিয়ে যাবে ২০১৬ সালের দিনরাত্রির পথে। অনেক ঘটনা মুছে যাবে বিস্মৃতির ধুলোয়। আবার পাওয়া-না পাওয়ার অনেক ঘটনা থাকবে উজ্জ্বল হয়ে। অতীতও মাঝে মাঝে স্মৃতির অলিন্দে কড়া নাড়বে।
দেশে এক ভোটময় পরিস্থিতির ভেতর কাল জানুয়ারির পয়লা দিন। ঘুরে তাকালে দেখা যাবে-২০১৫ সালটা শুরু হয়েছিল টানা হরতাল-অবরোধের সহিংসতার ভেতর। পুরনো আদলের রাজনীতি। সেই একই দৃশ্যপট। সেই হরতাল। জ্বালাও-পোড়াও। জনমনে আতঙ্ক। সরকারের সতর্কবাণী। মামলা-গ্রেফতার। মিছিল-সমাবেশে বিধিনিষেধ। সারাবছর চলেছে রাজনীতিতে এক অনিশ্চিত পরিবেশ। তবে নৌকা এবং ধানের শীষ নিয়ে একটি উত্সবমুখর প্রচারণাময় ভোটযুদ্ধের ভেতর দিয়ে শেষ হয়েছে পুরনো বছরের শেষ মাসটি।
এ বছর ৪ জানুয়ারি বেগম খালেদা জিয়া তার গুলশান কার্যালয়ে ‘অবরুদ্ধ’ থেকে ৯৩ দিনের আন্দোলন করেছেন। এসময় সারাদেশে পেট্রোলবোমা, আগুন, ককটেল, গুলি, হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনায় ঝরেছে ১৩৭ প্রাণ। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুতে মা বেগম খালেদা জিয়াকে সমবেদনা জানাতে ২৫ জানুয়ারি রাত ৮টা ৩৬ মিনিটে গুলশান কার্যালয়ে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চলতি বছরের ২০ অক্টোবর বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন পালক যুক্ত হলো। সরকারের বড় অর্জনের তালিকায় যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ-ভারত ল্যান্ড বাউন্ডারি চুক্তির বাস্তবায়ন ও ছিটমহল বিনিময়। দীর্ঘ ৬৮ বছর পর ছিটমহল বিনিময়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ভারতের মূল ভূখণ্ডের অংশ হয়ে গেছে ছিটগুলো। এতে পূর্ণ নাগরিকের পর্যাদা পেল ৫০ হাজার মানুষ। নিজেদের অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ শুরু হয়েছে এ বছর। ২০১৫ সালে কূটনৈতিক ক্ষেত্রে এসেছে অর্জন ও চ্যালেঞ্জ। যুদ্ধাপরাধের ফাঁসির রায় কার্যকর নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনা চরমে উঠেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফর ও স্থল সীমানা চুক্তি বাস্তবায়নসহ বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনার সাক্ষী এ বছরের ক্যালেন্ডারের পাতা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সর্বোচ্চ সম্মান ‘চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ’ পুরস্কার গ্রহণ করেছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিনজনের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে।
বছরজুড়েই ঘটেছে ব্লগার হত্যাকাণ্ড। বেশ কয়েকটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে। বেশ কয়েকজন বিদেশি নাগরিককে দুর্বৃত্তরা হত্যা করেছে। তাজিয়া মিছিলে হামলাও ছিল আলোচিত। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সোনা চোরাচালানের একটি প্রধান রুটে পরিণত হয়েছে। সাগরপথে মানবপাচার নিয়ে সারাবছরই আলোচনায় ছিল কক্সবাজার।
বাংলাদেশ নিয়ে মানুষের বিপুল প্রত্যাশা এই যে, নতুন বছরে অভিযাত্রা হবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার অচলায়তন ভেঙে ‘হঠাত্ আলোর ঝলকানি লেগে ঝলমল করে উঠুক চিত্ত।’