গত বৃহস্পতিবার রাতে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবে থার্টি-ফার্স্ট নাইটে সঙ্গীত পরিবেশন করতে বাংলাদেশে আসেন উপমহাদেশের গুণী সঙ্গীতশিল্পী কুমার শানু। শুধু ভারতেই নয়, পুরো বিশ্বে ছড়িয়েছেন নিজের সুরের যাদু। এবার বাংলার মঞ্চও মাতিয়ে গেলেন তিনি। মঞ্চে টানা একঘণ্টা নিজের জনপ্রিয় গান গেয়ে নামেন তিনি। পরে পৌনে বারোটায় আবারও মঞ্চে ওঠেন এবং ইংরেজি নববর্ষকে বরণ করাসহ গানে গানে দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন। দর্শকদের বিভিন্ন অনুরোধের গানের পাশাপাশি নিজের পছন্দের গানও পরিবেশন করেন গুণী এই শিল্পী। মধ্যরাত পর্যন্ত মাতিয়ে রাখেন সবাইকে। এ যেন এলেন, গাইলেন এবং জয় করলেন। অনুষ্ঠানের পরে ইত্তেফাকের সাথে এক বিশেষ আড্ডায় বসেন কুমার শানু। আড্ডায় উঠে আসে বাংলাদেশ সফরসহ দুই বাংলার গানের বিভিন্ন দিক নিয়ে। এছাড়া নিজের সঙ্গীত জীবনের শুরুর দিকের কথাও বলেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইত্তেফাকের নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি হাবিবুর রহমান বাদল।
বাংলাদেশ সফর কেমন লাগছে?
বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের প্রতি আমার অপরিসীম ভালোবাসা সবসময় থাকে। বাংলাদেশে আমার যে এতো ভক্ত রয়েছে তা না এলে বুঝতাম না। আমার পৈতৃক নিবাস এই বাংলাদেশেই। তাই ডাক পেলেই ছুটে আসতে মন চায়। সবসময় হয়তো আসার সুযোগ হয় না। আমার বাবা ঢাকা রেডিওতে গাইতেন। সেখান থেকে বাংলাদেশের প্রতি একটা যোগসূত্র আমার আগে থেকেই। দুই বাংলার মধ্যে অভিন্ন সেতুবন্ধন রয়েছে। এ যেন বিনে সুতার মালার মতো। আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়ি নদীর তীরে এই বাংলায়। বাংলাদেশের মানুষ অনেক অতিথিপরায়ণ। আমি অনেক দেশে ঘুরেছি। যে ক’টি দেশ আমি উল্লেখ করতে পারি তার মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ। আর এদেশের খাবারের প্রশংসা তো করতেই হয়।
আমাদের দেশের গান প্রসঙ্গে বলুন—
বাংলাদেশের গান অনেক আগে থেকেই সমৃদ্ধ। রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, এছাড়া অনেক গুণী সঙ্গীতশিল্পীর জন্ম এই বাংলাদেশে। সেই জায়গার গানের অবস্থা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই আমার। এক সময় বাংলাদেশের গান অনেক শোনা হতো। এখন আসলে ব্যস্ততার কারণে গান শোনার জন্য আলাদা করে সময় বের করতে পারি না। তাই শুধু বাংলাদেশেরই না, আমাদের দেশের গানও আমার তেমন শোনা হয় না। এখন নতুনদের গান আর শোনা হয় না। এখানে এসে যতটুকু বুঝলাম, বাংলাদেশের মানুষ অনেক সঙ্গীত-প্রিয়। এখানে গানের পরিসর এখন অনেক বড়। দেশের বাইরেও বাংলাদেশের গান এখন সমৃদ্ধ ও প্রশংসিত।
এপার বাংলার গানের সাথে ওপার বাংলার পার্থক্য কেমন মনে করেন?
আমরা বাঙালি, এটাই আমার কাছে মূল বিষয়। বাংলাকে আমি কখনও বিভক্ত মনে করিনি। আর দুই বাংলার গানের মধ্যে কোনও পার্থক্য আছে বলে আমি মনে করি না। বাংলাদেশিরা যেমন নজরুলের পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথকে গ্রহণ করেছে ঠিক তেমনি আমরাও রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি নজরুলকে গ্রহণ করে নিয়েছি। দুই বাংলার গানের মধ্যে যারা পার্থক্য খোঁজে তারা মূলত সঙ্গীত-প্রেমী নয়। বাংলা ভাষা যেমন আমাদের সবার তেমনি বাংলা গান আমাদের সবার। পশ্চিমবঙ্গের শিল্পীদের গান যেমন এদেশে অনেক অনেক জনপ্রিয় তেমনি বাংলাদেশের অনেক শিল্পীও আমাদের দেশে অনেক জনপ্রিয়। আমাদের দেশের অনেক শিল্পীর চেয়ে রুনা লায়লা অনেক জনপ্রিয় পশ্চিম বাংলায়। শুধু তাই না, তার হিন্দি গানের ভক্তও অনেক। এই মেলবন্ধন কিন্তু আমাদের সব সময়েই দেখা যায়।
IMG0
ভারত ও বাংলাদেশের শিল্পীদের মধ্যে একযোগ হওয়া বিষয়ে কি বলবেন?
দুই বাংলার গানের মধ্যে কিন্তু এক সময় খুব ভালো একযোগ ছিল। এখন হয়তো সেই জায়গা থেকে অনেকটা সরে গেছে। এখন সবার ব্যস্ততা বেড়েছে। তাই বড় পরিসরে কিছু করার ইচ্ছে থাকলেও সম্ভব হয় না। তবে ইদানীং চর্চাটা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশে আমাদের কৈলাস খের গান গেয়েছে। কলকাতার চলচ্চিত্রেও বাংলাদেশের কয়েকজন গান গেয়েছে। এই চর্চাটা আবারও শুরু হয়েছে। আশা করি ভবিষ্যতে ভালো হবে। সময় সুযোগ পেলে বাংলাদেশের যেকোনো শিল্পীর সাথে অ্যালবাম বের করতে রাজি আছি। দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন যত সুদৃঢ় হবে ততোই উভয় দেশের সংস্কৃতি মজবুত হবে। দুই বাংলার মানুষের মধ্যেও আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার আহ্বান জানাই। আর আমার বিষয়ে বলবো, এই বাংলার মাটি ও মানুষ যখনই ডাকবে আমি ছুটে আসবো তাদের কাছে।
এবার বাংলাদেশ সফর নিয়ে বলুন—
এবার থার্টি-ফার্স্ট নাইটে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের আমন্ত্রণে এসেছি। আমার সাথে ১৪ জনের যন্ত্র-দল এসেছে। মঞ্চে ওঠার সাথে সাথে দর্শকরা চিৎকার করে আমার আগমনের যে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন তাতে তাদের ভালোবাসায় আমি সিক্ত। প্রথমবার থার্টি-ফার্স্ট নাইট বাংলাদেশে করলাম। নারায়ণগঞ্জ জায়গাটার নাম আমি আগেও শুনেছি।
আপনার সঙ্গীত-জীবনের গল্প খানিকটা জানতে চাই—
সঙ্গীত পরিবারেই আমার বেড়ে ওঠা। কিন্তু আমার এই পর্যন্ত আসার পথটা খুব সহজ ছিল না। ছোটবেলায় তবলা বাজাতাম। এক সময় গানের চর্চা করতে করতে মুম্বাই চলে যাই। সেখানে শুরু করি সঙ্গীত সাধনা। একসময় সুযোগ পেয়েও যাই। ‘জিনা তেরী গলিমে’ গানটি হিট হওয়ার পর জুলুম ছবিতে সঙ্গীত পরিবেশন করি আমি। এরপর ‘আশিকি’ ছবিতে গাওয়া সবগুলো গান সুপার হিট হওয়ার পর আমাকে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। কিন্তু এই পথটা আমাকে জীবনের মানে বুঝিয়েছে। স্বপ্ন কি সেটা বুঝিয়েছে। কখনও হার মানতে শিখিনি। অনেক জায়গায় ঘুরেছি একটি সুযোগের জন্য। তখন তো এখনকার মতো মিউজিক করা এতো সহজ ছিল না। আর পরিসরটাও ছিল খুব ছোট। সেখান থেকে নিজেকে প্রমাণ করে আজকে আমি কুমার শানু হয়েছি।