বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে বহুল আলোড়িত কথিত ‘ওয়ান-ইলেভেন’ এর নয় বছর পূর্তি আজ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি ঘটে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির এই দিনে। আমেরিকার টু ইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনাবহুল নাইন-ইলেভেনের (৯/১১) সাথে মিলিয়েই রাখা হয় দিনটির নাম।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অনাস্থা সৃষ্টি হওয়ার প্রেক্ষাপটে এক চরম রাজনৈতিক সংঘাত, অনিশ্চয়তা আর অস্থিরতার আবর্তের মাঝে ২০০৭ সালের আজকের রাতে আকস্মিক দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়। জারি করা হয় সান্ধ্য আইন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করা হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফখরুদ্দীন আহমদকে। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর তত্কালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে প্রধান উপদেষ্টা করে তার নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। তবে শুরু থেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে আওয়ামী লীগসহ বিএনপি বিরোধীদলগুলোর আপত্তির কারণে নানা বিতর্ক শুরু হয়। রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যেতে থাকলে সরকারের চার উপদেষ্টা পদত্যাগ করেন। নিয়োগ দেয়া হয় নতুন উপদেষ্টা। এরই মধ্যে ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি নির্বাচনের ঘোষণা দেয়া হলে আওয়ামী লীগ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়।
এ পরিস্থিতিতে দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষিত হয়। তত্কালীন রাষ্ট্রপতি প্রয়াত ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ভেঙে দিয়ে জরুরি অবস্থা জারি করেন। তখন সেনাপ্রধান ছিলেন জেনারেল মইন উ আহমদ। সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন তিনি।জেনালের মইন উ আহমেদ নিজেই এক অনুষ্ঠানে ১১ জানুয়ারির জরুরি অবস্থা জারির দিনটিকে ’ওয়ান-ইলেভেন’ বা এক-এগারো (১/১১) নামে আখ্যায়িত করেন। দুই বছর ক্ষমতায় ছিল বেসামরিকের মোড়কে মোড়ানো ওই সরকার। যদিও পর্দার আড়ালে থেকে প্রধান ভূমিকায় ছিলেন জেনালের মইন উ আহমেদ। এই সেনানিয়ন্ত্রিত সরকার আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াসহ দুই দলের শীর্ষ নেতাদের অনেককেই গ্রেফতার করে। সংস্কারের নামে দুই নেত্রীকে রাজনীতির বাইরে পাঠাতে ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ কার্যকরের চেষ্টা চালানো হয়। সামরিক বাহিনী ও দেশের একটি প্রভাবশালী মহল দুই নেত্রীকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিতে প্রচারণা-প্রপাগান্ডা শুরু করে। এ চেষ্টায়ই ‘মাইনাস-টু ফর্মুলা’ হিসেবে বহুল আলোচিত।
এদিকে এক-এগারো বাঙালির স্বপ্ন দেখার যে শক্তি, তা দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে যায়। ১২ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশের নিত্যদিনের চালচিত্র বদলে যায়। নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শপথ হয়। শুরু হয় অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের শাসন। প্রথমেই তারা দুর্নীতি উচ্ছেদের নামে রাজনীতিবিদদের ধরপাকড় শুরু করে। সারাদেশে চলে অবৈধ হাট-বাজার আর বস্তি উচ্ছেদ অভিযান। অন্যদিকে তাদের টার্গেটে ছিল দেশের সব অঞ্চলের সব শ্রেণীর ব্যবসায়ী। তাদের শিকার হন রাজধানী ও মফস্বলের উঁচু ও নিচু পর্যায়ের সব শ্রেণীর রাজনৈতিক নেতাকর্মী। এদিকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হলেও বিভিন্নভাবে আন্দোলন গড়ে ওঠে। দ্রুত নির্বাচনের দাবিতে অনির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দিক থেকে ক্ষোভ-বিক্ষোভ শুরু হয়।এক পর্যায়ে আন্দোলন রাজপথে নেমে আসে। এক পর্যায়ে কুশিলবরা রণেভঙ্গ দেন। এ পরিস্থিতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে। সেই সঙ্গে ঘরোয়া রাজনীতিরও অনুমতি দেয়। প্রায় দুই বছর নানা ব্যর্থতায় ভারাক্রান্ত হয়ে, দেশি-বিদেশি চাপ এবং বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদের নির্বাচন দিয়ে বিদায় নেয় এক-এগারোর ওই সরকার।