শিক্ষকরা কর্মবিরতিতে, স্থবির ৩৭ বিশ্ববিদ্যালয়

অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামোতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ ও অন্যান্য অসঙ্গতি দূর করার দাবিতে দেশের ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা গতকাল সোমবার লাগাতার কর্মবিরতি পালন শুরু করছেন। দাবি আদায় না পর্যন্ত এই কর্মসূচি চলবে এমন ঘোষণা রয়েছে শিক্ষকদের।
 
শিক্ষকদের এই কর্মবিরতিতে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায়। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থীদের ইয়ার ফাইনাল বা সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা চলছিল। মাঝপথে শিক্ষকদের এই কর্মবিরতি শুরু হওয়ায় শিক্ষার্থীরা অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।
 
গতকাল দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কর্মবিরতিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে বটতলায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের  মহাসচিব অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেন, শিক্ষকদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির কারণে শিক্ষার্থীরা সেশনজটে পড়লে সে জন্য অর্থমন্ত্রী দায়ী থাকবেন। তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে আমরা গত আট মাসে কঠোর কোনো আন্দোলনে যাইনি। আমরা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু অর্থমন্ত্রী আমাদের একবার আশ্বাস দেন, আবার সেই আশ্বাস সম্পর্কে আর কোনো অগ্রগতির কথা জানান না। এখন অর্থমন্ত্রী বলছেন, শিক্ষকদের বেতন কাঠামো নিয়ে তিনি কিছু জানেন না। আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। তাই দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের পূর্ণ কর্মবিরতি চলবে।’ এ সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ব নির্ধারিত পরীক্ষাগুলো অনুষ্ঠিত হয়েছে, তবে কোন বিভাগে ক্লাস হয়নি বলেও তিনি জানান।
 
কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগরসহ দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকরা কর্মবিরতি পালন করছে।
 
ঘোষণা অনুযায়ী, কর্মবিরতি চলাকালে সান্ধ্যকালীন কোর্সসহ সব ধরনের নিয়মিত ক্লাস বন্ধ থাকবে। তবে সেমিস্টার ফাইনাল বা কোর্স ফাইনাল পরীক্ষা গ্রহণের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে স্ব স্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি।
 
এদিকে কর্মবিরতির প্রথম দিনে গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ ছিল। শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষকদের রুমগুলোতে ঝুলেছে তালা। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও কম।
 
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা জানান, শিক্ষক ধর্মঘটের কারণে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গতকাল কোন বিভাগে ক্লাস, পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক মো. খবির উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ফেডারেশনের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এ কর্মবিরতি চলবে। কর্মসূচি চলাকালে সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনার জন্য ডাকা হলেও কর্মসূচি চলবে। বেতন কাঠামো ঠিক করে নতুন করে প্রজ্ঞাপণ জারি না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ারও ঘোষণা দেন তিনি।
 
রাজশাহী অফিস জানিয়েছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে গতকাল কোনো ক্লাস হয়নি। গত ১ জানুয়ারি থেকে ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত শীতকালীন ছুটি থাকায় ক্যাম্পাসে এমনিতেই  রাবিতে ক্লাশ বন্ধ রয়েছে। তবে ১ থেকে ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত বন্ধ থাকার পর ৯ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসসমূহ খুলেছে। অফিস খোলা থাকায় বিভিন্ন বিভাগে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। গতকাল শিক্ষকরা কোনো পরীক্ষা নেননি। রাবি শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর রেজাউল করিম জানান, প্রথম বর্ষের ভর্তি সংক্রান্ত কাজ বাদে সব ধরণের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রয়েছেন শিক্ষকরা।
 
চট্টগ্রাম অফিস জানায়, শিক্ষকদের কর্মবিরতির কারণে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম। গতকাল শাটল ট্রেন যথারীতি চলাচল করলেও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে। এছাড়া ফেডারেশনভুক্ত সব বিশ্ববিদ্যালয়েই গতকাল শিক্ষকরা কর্মবিরতি পালন করেন।
 
প্রকৃচি ও ২৬ ক্যাডার : বেতন স্কেল ও চাকরিতে বৈষম্য নিরসনের দাবিতে প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, চিকিত্সক এবং ২৬টি ক্যাডার ও বিভিন্ন ফাংশনাল সার্ভিসের কর্মকর্তারা গতকাল দু’ঘন্টার কর্মবিরতি পালন করেন। ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত এ কর্মসূচি চলবে। গতকাল দুপুর ১২টা থেকে দুইটা পর্যন্ত এ কর্মবিরতি পালন করে। এ সময় সব ধরনের দাপ্তরিক কাজ থেকে কর্মকর্তারা বিরত ছিলেন। ২৬ ক্যাডারের অন্তর্ভূক্ত রয়েছে সরকারি কলেজ শিক্ষকরা। তারাও গতকাল দুই ঘন্টা কর্মবিরতিতে ছিলেন। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির মহাসচিব অধ্যাপক সেলিম উল্লাহ খন্দকার জানান, ২৬ ক্যাডারের অন্তর্ভূক্ত হওয়ায় তারাও দুই ঘন্টার কর্মবিরতি পালন করেছেন।
 
বেতনস্কেলে সিলেকশন গ্রেড ও টাইমস্কেল পুনর্বহাল, সরকারি প্রথম শ্রেণির চাকুরিতে যোগদানের ক্ষেত্রে ক্যাডার-ননক্যাডার বৈষম্যের সিদ্ধান্ত বাতিল, ইউএনওকে কর্তৃত্ব প্রদানমূলক মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অফিস স্মারক বাতিল, আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন এবং সকল ক্যাডার ও সার্ভিসে পদোন্নতির সমান সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টি, নিজস্ব ক্যাডার ও ফাংশনাল সার্ভিসবহির্ভূত সব ধরনের প্রেষণ বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছে প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় কমিটি।
 
প্রধামন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় শিক্ষক সমিতি
 
সিলেকশন  গ্রেড বহাল ও বেতন  গ্রেডের সমস্যা নিরসনের দাবিতে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আন্দোলন প্রসঙ্গে সোমবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক জনসভায়  প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা সকলের ১২৩ ভাগ বেতন বৃদ্ধি করেছি। বাড়ানোর পরও অনেকের মধ্যে অসন্তোষ। এত বেতন বাড়ানোর পর কেন এত অসন্তোষ, তা আমার বোধগম্য নয়।
 
প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ফেডারেশনের সভাপতি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বেতন বৃদ্ধির পরও কেন এই অসন্তোষ তা প্রধানমন্ত্রীরই খুজে বের করা উচিত। তিনি বলেন, আমাদের বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে সত্য, তবে একই সঙ্গে মর্যাদা কেড়ে নেয়া হয়েছে। শিক্ষা ও ব্যাংকিং সেক্টরকে ধ্বংস করার জন্য একটি গ্রুপ কাজ করছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।