রাবির চার শিক্ষককে মোবাইলে হুমকি, চাঁদা দাবি

 
গত সোমবার রাতে 'চাঁদা চেয়ে' রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) দুই শিক্ষককে হুমকির পর মঙ্গলবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের আরো দুই শিক্ষককে একই মোবাইল নম্বর থেকে (০১৬৩০-২৯৮১৫৭) হুমকি প্রদানের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগীরা হলেন, প্রাণিবিদ্যার প্রফেসর ড. বিধান চন্দ্র দাস, এনিমেল হাজবেন্ডী অ্যান্ড ভেটেরিনারি সায়েন্সের সহযোগী অধ্যাপক ড. এস এম কামরুজ্জামান, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সভাপতি ড. আজিজুল হক এবং একই বিভাগের ও এসএম হলের প্রাধ্যক্ষ ড. জাহাঙ্গীর আলম।
 
এদিকে শিক্ষকদের ফোন করে হুমকির ঘটনা অব্যাহত এবং হুমকিদাতারা চিহ্নিত ও গ্রেফতার না হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের নিরাপত্তার জন্য এসব হুমকিদাতাদের দ্রুত চিহ্নিত ও আইনের আওতায় আনতে জোর দাবি জানিয়েছে শিক্ষক সমিতি।
 
ঋুক্তভোগী ড. বিধান চন্দ্র দাস জানান, মঙ্গলবার দুপুর দেড়টার দিকে অপরিচিত (০১৬৩০-২৯৮১৫৭) মোবাইল নম্বর থেকে তাঁর মোবাইলে ফোন করে অজ্ঞাত ব্যক্তি বলেন, 'রাজশাহী নিউমার্কেটের ছেলেরা কি আপনার অফিসে গেছে?' জবাবে আমি না বললে সেই ব্যক্তি বলেন, 'তারা আপনার কাছে যেতে যাচ্ছে, আমরা তাদের আটকে রেখেছি। আমাদের বস আপনার সঙ্গে কথা বলবেন, কথা বলুন।'
 
এসময় তিনি ব্যস্ততার কথা জানালে ওই ব্যক্তি ফোন লাইন কেটে দেয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হলের প্রাধ্যক্ষ ড. জাহাঙ্গীর আলমের সাথে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছেন, ওই একই নম্বর থেকে আগের দিন সোমবার রাতে তাকে (জাহাঙ্গীর আলম) এবং ইসলাম ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সভাপতি ড. আজিজুল হককে ফোন করে চাঁদা দাবি করা হয়েছে।
 
অন্যদিকে ড. কামরুজ্জামান বলেন, 'মঙ্গলবার দুপুর ২টার দিকে মোবাইলে ফোন করে সর্বহারা দলের জিয়াউদ্দিন জিয়া পরিচয়ে আমার কাছে চাঁদা দাবি করা হয়েছে। বিষয়টি প্রক্টরকে জানিয়েছি। প্রক্টরের পরামর্শে থানায় জিডির প্রস্তুতি নিচ্ছি। একই নম্বর থেকে একাধিক শিক্ষককে হুমকির ঘটনায় আমরা নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছি।
 
অনুসন্ধানে জানা যায়, গতবছর ১ মার্চ রাবির ভারপ্রাপ্ত রেজিস্টার এম এন্তাজুল হক ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক আজিজুল ইসলামকে, ৫ মার্চ দর্শনের সহযোগী অধ্যাপক শরমীন হামিদ ও মার্কেটিংয়ের অধ্যাপক একেএম গোলাম রব্বানী মন্ডলকে, ৬ মার্চ রসায়নের অধ্যাপক আখতার ফারুক ও একই বিভাগের অধ্যাপক আজাহার আলীকে, ১০ জুলাই বাংলার ড. সফিকুন্নবী সামাদীকে, ১০ নভেম্বর ঢাবির ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে, ১৫ নভেম্বর রাবির দর্শনের সাবেক অধ্যাপক কথা সাহিত্যিক হাসান আজিজুল হককে, ২৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাশেমকে, ইতিহাসের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মোহাম্মদ শাফি ও অধ্যাপক মো. মাহবুবর রহমান ও তাঁর স্ত্রী তাহদিনা নাজনীনকে, গত বছর ডিসেম্বরে রাবির উপাচার্য অধ্যাপক মুহম্মদ মিজানউদ্দিনকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেয়া হয়।
 
এ বিষয়ে রাবি প্রক্টর প্রফেসর তারিকুল হাসান বলেন, ফোনে চার শিক্ষকের কাছে চাঁদা চেয়ে হুমকির বিষয়টি জেনেছি। ভুক্তভোগীদের থানায় জিডি করে প্রক্টর অফিসে অভিযোগ দিতে বলেছি। এক দিনের ব্যবধানে চার শিক্ষককে হুমকির বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
 
রাবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি ড. আনন্দ কুমার সাহা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একের পর এক হুমকির ঘটনায় জড়িতরা আটক না হওয়ার বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। আমরা পুলিশ প্রশাসনকে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানিয়েছি, এখনো জানাচ্ছি। জড়িতদের চিহ্নিত ও আটকের জন্য সরকারের কাছেও জোর দাবি জানাচ্ছি। তিনি আরো বলেন, হুমকির ঘটনায় জড়িতরা আইনের আওতায় না আসায় এধরণের হুমকির ঘটনা বাড়ছেই।
 
নগরির মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির বলেন, 'যেসব হুমকির বিষয়ে অভিযোগ এসেছে, সেগুলো পৃথকভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। আমরা প্রাথমিক তদন্তে জানতে পেরেছি, শরীয়তপুর-মাদারীপুর এলাকা থেকে এসব হুমকি দেয়া হচ্ছে। আমরা কাজ করছি। জড়িতদের চিহ্নিত ও আটকের চেষ্টা চলছে।'
 
প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালের বিভিন্ন সময়ে একই কায়দায় ফোন করে কখনো লাল বাহিনী, পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি, চরমপন্থী গ্রুপ কিংবা সর্বহারা পরিচয়ে চাঁদা চেয়ে রাবির ১৫ শিক্ষককে হুমকি দেয়া হয়েছে। এসব ঘটনায় ১০ জন শিক্ষক নগরীর মতিহার থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। কিন্তু হুমকিদাতাদের পুলিশ এখনো চিহ্নিত ও গ্রেফতার করতে পারেনি। এনিয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষকদের অনেকে পুলিশের বিরুদ্ধে গাফিলতি ও রহস্যজনক নিরবতার অভিযোগ তুলেছেন।