বিনোদন প্রতিদিনের সাপ্তাহিক আড্ডার আসরে এবারে দু’জন গানের মানুষকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। এ দু’জন হলেন ‘সখীরে’ খ্যাত জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী তানভীর শাহীন ও প্রতিভাবান গায়িকা কর্নিয়া। ইত্তেফাক বিনোদন ইনচার্জ তানভীর তারেকের পরিকল্পনায় ইত্তেফাক বিনোদন উদ্যোগ-এ পুরো একবেলা গান নিয়ে নানা বিষয়ে কথা বলেন তারা। ইত্তেফাক অনলাইন ইনচার্জ এনামূল মনি’র সহযোগিতায় আড্ডার আনুসাঙ্গিক প্রয়োজন পূরণ করে অফিস ম্যানেজমেন্ট। গত ৯ জানুয়ারি গানের আড্ডা আর ফটোশ্যুটে অংশ নেন তারা। আড্ডার গ্রন্থনা ও সঞ্চালনায় ছিলেন মোস্তাফিজ মিঠু। লিখেছেন মেহেদী সোহেল।
ছবি তুলেছেন সোহেল মামুন ও মারুফ রহমান
পৌষের আকাশে কুয়াশা সেদিন যেন দল বেঁধে নেমে ছিল। তাই দিনের বেশিরভাগ সময়জুড়ে সূর্যের দেখা ছিল না। বলছি গত শনিবারের কথা। তারকাদের সাথে ইত্তেফাক-এর সাপ্তাহিক আড্ডার নির্ধারিত দিন। এ পর্বের আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন দু’জন। ‘সখীরে’ খ্যাত কণ্ঠশিল্পী তানভীর শাহীন ও প্রতিভাবান কণ্ঠশিল্পী কর্নিয়া। দুপুর গড়িয়ে তখন প্রায় বিকেল। আড্ডার নির্ধারিত সময় তখন ছুঁই ছুঁই, অতিথিরা তখনও অনুপস্থিত। তানভীর শাহীনকে মোবাইলে কল দিলাম, অপর প্রান্ত থেকে জানালেন রাস্তায় প্রচুর জ্যাম। যে কারণে গাড়ি বের করেননি। রিকশা করে আসছেন বলে একটু সময় লাগছে। আরও জানালেন তিনি কারওয়ান বাজারে চলে এসেছেন, খুব অল্পসময়ের মাঝেই ইত্তেফাক কার্যালয়ে চলে আসবেন। কর্নিয়ার অবস্থান জানার জন্য কল দিলাম। তার ফোন বেজেই যাচ্ছে। সময় তখন পাঁচটা পেরিয়ে গেছে। এরমধ্যেই তানভীর শাহীন অফিসের নিচে চলে এসেছেন। তাকে নিয়ে সোজা চলে গেলাম অফিসের ছাদে। সেখানে আমাদের ফটোগ্রাফার আগে থেকেই ক্যামেরা প্রস্তুত করে অপেক্ষা করছিলেন। দিনের আলো কিছুটা পাওয়া গেল। সেই আলোতেই চললো ফটোশ্যুট। এরমধ্যেই কর্নিয়ার কল এলো। তার কল রিসিভ করতেই জানালেন জ্যামের জন্য গাড়ি বের না করে রিকশায় আসছি। দশ-পনেরো মিনিট লাগবে। পশ্চিমের আকাশে তখন আর লালের আভাটা দেখা যাচ্ছে না। কর্নিয়া এতোক্ষণে এসে পৌঁছেছেন। অল্প আলোতেই ফটোশ্যুট চললো কিছুক্ষণ। এরপর শুরু হলো যথারীতি আড্ডা। অতিথি কর্ণিয়া ও তানভীর শাহীনের সাথে কিছু সময়ের জন্য আড্ডায় যোগ দিলেন আমাদের বিভাগীয় সম্পাদক তানভীর তারেক ও অনলাইন ইনচার্জ এনামূল মনি। খানিকক্ষণ আলাপচারিতার পর কাজের ব্যস্ততায় তারা ফিরে গেলেন ডেস্কে। শুরুতেই স্টেজ শো নিয়ে ভীষণ ব্যস্ততার কথা জানালেন কর্নিয়া। বললেন, নিয়মিতভাবেই স্টেজে গান গাইতে হচ্ছে। এর পাশাপাশি টেলিভিশন লাইভ। সব মিলিয়ে দারুণ ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনি। নিজের একক অ্যালবামের খবর কি? জানতে চাইলে কর্নিয়া বলেন, ‘এখনও নিজের প্রথম অ্যালবাম প্রকাশ হয়নি। একটু একটু করে অ্যালবামটির কাজ গোছাচ্ছি। লাইভ শো নিয়ে ব্যস্ততার কারণে অ্যালবামের জন্য পর্যাপ্ত সময় বের করতে পারছি না।’ তানভীর শাহীন মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনছেন। রিয়্যালিটি শো থেকে আসা শিল্পীদের কণ্ঠে স্টেজে নিজেদের গানের চেয়ে প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের গানই বেশি শোনা যায়। আমার এই কথার সাথে কর্নিয়ার খুব একটা যোগসূত্র নেই বলে জানালেন তিনি। কর্নিয়া একটু মুচকি হেসে বলেন, ‘আমার নিজের একক অ্যালবাম না থাকলেও বেশকিছু মৌলিক গান রয়েছে। যেগুলো আমি অন্যের সাথে মিক্সড অ্যালবামে করেছি। আমি প্রতিটি শোতেই সেই গানগুলো শ্রোতাদের সামনে গেয়ে থাকি। এছাড়া আমাদের দেশের সিনিয়র শিল্পীদের হিট গানগুলো থেকে অনুরোধ আসে প্রচুর। পাশাপাশি ইংরেজি গানও গাইতে হয়।’ তানভীর শাহীন কিছু বলবেন বলে উসখুস করছিলেন। কর্নিয়ার বিরতিতে মুখ খুললেন তিনি। অনেকটা অভিযোগের সুরেই বললেন, ‘রিয়্যালিটি শো থেকে যে সব শিল্পীরা উঠে আসে তাদের মৌলিক গান নেই বললেই চলে। রিয়্যালিটি শোর তারকা খ্যাতিকে পুঁজি করে তারা অন্যের গান দিয়ে স্টেজ শো করে বেড়ায়।’ তার কথা কাটলেন কর্নিয়া। বললেন, ‘একজন তরুণ শিল্পীর শুধু নিজের মৌলিক গান নিয়ে স্টেজ শো করাটা সম্ভব না। কারণ নতুনদের নিজেকে ও তার গানকে পরিচিত করতে যথেষ্ট সময়ের প্রয়োজন। স্টেজে দর্শক-শ্রোতারা হিট গান শুনতে চায়। সেখানে আমাদের নতুন গানের চেয়ে সেই গানগুলোই বেশি গুরুত্ব পায়। এটা শ্রোতাদের চাহিদা। স্টেজে গান করতে হলে সেই বিষয়গুলো মেইন্টেইন করতে হয়। স্টেজে দর্শকদের চাহিদাকে গুরুত্ব দিতে হয়। এই কারণেই তরুণরা স্টেজ শো’তে সিনিয়রদের গান গায়।’ আমি প্রসঙ্গ পরিবর্তনের জন্য বললাম, ‘এখন পরিচিতির জন্য তো মিউজিক ভিডিওর প্রচলন খুব বেশি দেখা যাচ্ছে।’ তানভীর শাহীন আমার কথায় সুর মেলালেন। বললেন, ‘এখন সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে শ্রোতা-দর্শকদের রুচির পরিবর্তন এসেছে। প্রযুক্তির উন্নতি মানুষের এই পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রাখছে। যে কারণে এখন মানুষ গান শোনার সাথে সাথে দেখতেও পছন্দ করছেন। আর সেই তালে তাল মিলিয়ে চলতে মিউজিক ভিডিওটা এখন সময়ের দাবি।’ এক ফাঁকে বললেন, ‘আমিও অল্পদিনের জন্যে দেশে এসেছি আমার দ্বিতীয় অ্যালবামের দুটি গানের মিউজিক ভিডিও নির্মাণের জন্য।’ আমেরিকা থেকে মিউজিক ভিডিও নির্মাণের জন্য বাংলাদেশে কেন, সেখানে তো অনেক সুন্দর লোকেশন আছে? তানভীর শাহীন জানালেন, ‘আমার বাংলাদেশেই মিউজিক ভিডিও নির্মাণ করতে ভালো লাগে। এর আগেও আমি দুটি গানের মিউজিক ভিডিও বাংলাদেশে নির্মাণ করেছি। কর্নিয়া এতোক্ষণ দর্শকের ভূমিকায়। এবার মুখ খুললেন। বললেন, ‘আমাদের দেশ থেকে অনেকেই আমেরিকায় যায় আর আপনি আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে, খুব ভালো লাগলো।’ মিউজিক ভিডিওকে পুঁজি করে উঠতি শিল্পীদের জনপ্রিয় হওয়ার একটা প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। লাখ লাখ টাকা মিউজিক ভিডিওতে খরচ করলেও গানের বিষয়ে তাদের খুব একটা যত্নশীল মনে হচ্ছে না। তানভীর শাহীন এ প্রসঙ্গে বললেন, ‘গান হচ্ছে শিকড়। এটা মজবুত না হলে মিউজিক ভিডিও জনপ্রিয় হলেও সেই জনপ্রিয়তা কিন্তু ক্ষণিকের। অনেক মিউজিক ভিডিওই গানের চেয়ে বেশি জনপ্রিয়। এটা কিন্তু আমাদের জন্য নেতিবাচক সেটা বলবো না। গানের চেয়ে মিউজিক ভিডিওর গল্প জনপ্রিয় হতেই পারে। কিন্তু গানটা মনে না ধরলে কিন্তু সেই গল্পও এক সময় হারিয়ে যাবে।’
ঘড়ির কাঁটা এরইমধ্যে ছয়টা পেরিয়েছে। টেবিলে নাস্তাও দেওয়া হয়েছে। আমাদের ফটোগ্রাফাররা মাঝে মাঝেই বিভিন্ন দিক থেকে ছবি তুলছেন। কর্নিয়া কিছুটা আক্ষেপ করে বললেন, ‘ইস, ফটোশ্যুট হবে বিষয়টা ভুলেই গিয়েছিলাম।’ বললাম, কিন্তু ফটোশ্যুটের জন্য প্রস্তুতির কোনো অভাব তো পরিলক্ষিত হচ্ছে না। একগাল হেসে কর্নিয়ার উত্তর, ‘রাতে একটি বিয়ের দাওয়াতে যেতে হবে। সে কারণেই একটু প্রস্তুতি নিয়ে বের হয়েছি।’ তানভীর শাহীন খানিকটা খোঁচা দিয়ে বললেন, ‘এই বুঝি একটু প্রস্তুতি? ফুল প্রস্তুতি নিলে তো...’ বলে হা হা করে হেসে ফেললেন। একইসাথে সবার মুখে হাসির একটা রোল পড়ে গেল। অনেকেই গায়িকা থেকে নায়িকা হয়েছেন। কর্নিয়াকে প্রশ্ন করলাম, মডেলিং বা নাটকে কি কর্নিয়াকে দেখা যাবে? কর্নিয়ার সোজাসাপ্টা জবাব, ‘না’। এবার একটু ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক গলালাম। বিয়ের খবর শুনতে পাচ্ছি কত দিনে? মুচকি হেসে বললেন, ‘এ গল্প অনেক পরের’। গল্পে গল্পে তখন সময় প্রায় সাতটা। বিদায়ের সময়টা চলেই এলো। কর্নিয়ারও সময় হয়ে যাচ্ছে বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার। চায়ের কাপে শেষ চুমুকটা দিয়ে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়ালেন। দু’জনকে বিদায় জানিয়ে নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।