সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনকে জবরদস্তির শাসন (ব্রুট ল) হিসেবে অভিহিত করে হাইকোর্টের বিদায়ী বিচারক বিচারপতি শরীফ উদ্দিন চাকলাদার বলেছেন, ওয়ান ইলেভেনের সময় ফৌজদারি মোশন বেঞ্চের দায়িত্ব পড়েছিলো আমার ওপর। যেদিক দিয়েই জামিন দেই না কেন আপিল বিভাগ তা স্থগিত করে দেয়। যে পথেই জনগণকে পথ দেখাই না কেন -আপিল বিভাগ খড়গ হাতে দাঁড়িয়ে ছিলো। কিন্তু যে পথ করতে জানে তার পথ রুখবে কে? ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১ ধারায় চলে গেলাম। যেটি হাইকোর্টের একক অধিকার। প্রায় সকল রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী জামিন পেল। প্রশস্ত হলো নির্বাচনের পথ। তিনি বলেন, যদি আপিল বিভাগের দিকে তাকিয়ে থাকতাম তাহলে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মুক্ত আকাশে বিচারণ করার সুযোগ পেতেন না। মুচলেকা দিয়ে ‘ব্রুট ল’ এর তাবেদার হিসেবে বাঁচতে হতো। একজন বিচারককে বুঝতে হবে কোন্টা আইনের শাসন আর কোন্টা শাসনের আইন।
গতকাল মঙ্গলবার শেষ কর্মদিবসে সুপ্রিম কোর্টের এনেক্স ভবনের ২৩নং বিচারকক্ষে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ও অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের বিদায়ী সংবর্ধনার জবাবে বিচারপতি শরীফ উদ্দিন চাকলাদার এসব কথা বলেন। এ সময় বার সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন ও অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমসহ কয়েকশ’ আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন।
বিচারপতি চাকলাদার বলেন, একটি নজির দিচ্ছি ওয়ান-ইলেভেনের পর সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ জুড়ে ছিলো বিভিন্ন পেশার লোকজনের উপস্থিতি। বিচারকদের নিয়ে পোস্টারিং করা হল এই কোর্ট এলাকায়। তত্কালীন প্রধান বিচারপতি ছিলেন নিশ্চুপ। যাদের নাম ছিলো না তারা যাদের নাম পোস্টারে ছিলো তাদের এড়িয়ে চলতে লাগলেন। ওই সময়ে হাইকোর্টের বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মো. মোমিনুর রহমান বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিয়ে সমস্ত পোস্টারিং হাইকোর্টের বাইরে নিলেন। বিচারপতি নাঈম প্রথম সাহস করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে জামিন দিয়েছিলেন। আমার সে সময়ের ভূমিকার জন্য আমি বার এসোসিয়েশনের প্রত্যেকের কাছে ঋণী। বার যদি এক না হতো, কোর্টের পাশে এসে না দাঁড়াত, তবে হয়তো ওই জগদ্দল পাথর সরানো যেত না। তিনি বলেন, অপর একটি ঘটনা না বলে পারছি না। লম্বা ছুটির আগের দিন আমি মহিলা আইনজীবীদের কোর্টের সময়ের পরেও সময় দিয়েছিলাম। এক পত্রিকা কোর্ট এর সময় ধরে একদম সেকেন্ড হিসাব করে লিখল এতো রুল দেয়া এ সময় সম্ভব না। একজন সিনিয়র আইনজীবী, যিনি ওই জান্তার সাথে হাত মিলিয়ে ক্ষমতায় যেতে চেয়েছিলেন, সচিব দিয়ে তদন্তের কথা বলে চিত্কার করছিলেন। মানুষের স্বার্থে আঘাত হানলে তার স্বরূপ বেরিয়ে আসে। বিচারপতি চাকলাদার বলেন, বিচারক পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিচ্ছবি। ন্যায়বিচার করতে পারলে বিচারক হবেন। আর যদি পিছের মানুষটিকে খোঁজেন তবে এই অঙ্গনকে কলঙ্কিত করতে না আসাই ভালো। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এক পেশে কার্য-কলাপ দেখে মনে হয় এক সময় ফৌজদারি কার্যবিধির কিছু কিছু ধারা হয়ত পাল্টেই যাবে।
বিচারপতি চাকলাদার বলেন, ওকালতি পেশা হিসেবে শ্রেষ্ঠ। আগেই বলেছি আপনি ৩/৪ শত বছরের পুরনো বিচার, ঘটনা প্রবাহ দেখতে পাবেন আইন সাময়িকী ঘেঁটে। ৩/৪ শত বছর পূর্বে থেকে আজতক যত শুদ্ধ বিচার হয়েছে তার জন্য আইনজীবীরা শতভাগ দাবিদার। যে সমস্ত বিচার হয়েছে যা আমরা বিভিন্ন ল’ জার্নালে পড়ি তার বুননি আইনজীবীদের। বিচারকরা তা লিপিবদ্ধ করে আইনকে সঙ্গে নিয়ে। রায়গুলো বারবার যদি কেউ পড়তে পারে তবে দেখবেন লেখাগুলো আপনার সাথে কথা বলছে। যতক্ষণ না সেই পর্যায়ে লেখা পড়াটা উন্নতি করা যাবে ততক্ষণ এটা নিছক ছাপানো অক্ষর-একঘেয়েমি-কিন্তু একবার যদি বইয়ের সাথে কথা বলার পর্যায়ে চলে যান তবে যে মজা পাওয়া যায় তার আর কোথাও পাওয়া যায় না। তিনি বলেন, যে জিনিসটা খারাপ তা যেমন সকলের কাছে খারাপ, তেমনি আমার কাছেও। খারাপ জিনিসকে খারাপ বলতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই এবং যেখান থেকেই আসুক না কেন তার জন্য যদি কারণ দর্শাতে হয় তাতেও ভয় পাবার কিছু নেই।
বিচারপতি চাকলাদার বলেন, তৃতীয় বিশ্বে গণতন্ত্র ক্ষমতায় যাবার এক ধরনের অস্ত্র। ক্ষমতায় গেলে যাহা বাহান্ন তাহা তেপ্পান্ন, যে সেই। আমার বন্ধুবর প্রফেসর ড. মোশারফ হোসেন তৃতীয় বিশ্বের গণতন্ত্রের একটি সুন্দর সংজ্ঞা দিয়েছেন। আব্রাহাম লিঙ্কনের গণতন্ত্রের সংজ্ঞা ঠিক রেখেই উনি বললেন, সরকার জনবিচ্ছিন্ন, ভোট কিনে জনগণ থেকে দূরে। স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার পূর্ব শর্ত গণতন্ত্র। গণতন্ত্র সুসংহত না হলে স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার কথা চিন্তা না করাই ভালো।
বিচারপতি চাকলাদার বলেন, বিচার করাটা কঠিন এটা সত্য। অনেকে এবাদতের মাধ্যমে স ষ্টাকে দেখতে পায়, আবার অনেকে সারা জীবন এবাদত করেও স ষ্টার দেখা পাওয়া তো দূরের কথা শুদ্ধ হতেও পারে না। কারণ এবাদত তার সঠিক ছিল না, লোক দেখানো। ন্যায় বিচারক আল্লাহর প্রতিচ্ছবি। বিচার করাটা এক ধরনের এবাদত। নায় বিচার করা তখনই সম্ভব যখন যখন বিচারক লিটিগেশন (মামলা) টি মাথায় নেয়। কিন্তু যখন বিচারক লিটিগেশন এর পিছনে কে দাঁড়িয়ে আছে তার প্রতি দৃষ্টি দেয় তখন ন্যায় বিচার করা সম্ভব নয়। রায় দেয়া যায়। ওটা ন্যায় বিচার নয়। ন্যায় বিচারক আল্লাহর কণ্ঠস্বর। কোরআন শরীফে আছে, ‘বল, আমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার।’ কেন জানি আজ বিদায় বেলা মনে হচ্ছে আমরা যে কোন কারণেই হোক কেমন যেন ধোঁয়াটে করে ফেলছি। তিনি বলেন, এই সাড়ে ১৩ বছরে হয়ত অনেক ভুল করেছি। হয়ত কিছু ন্যায়ও করেছি। ওয়াসকরনীর (রা:) মতে, যদি একটা ন্যায় বিচারও করে থাকি-একজনকেও যদি অন্যায় থেকে রক্ষা করে থাকি-তা আমার জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে সেই একজনের জন্য হয়ত আল্লাহ তায়ালা আমাকে মাফ করে দেবেন।
তিনি বলেন, আমি যখন বারে প্রবেশ করি তখন অনেক নামকরা আইনজীবী ছিলেন। অনেকেই চলে গেছেন। কেউ কেউ এখনো আছেন। আইন পেশা সকল পেশার রাজা। এই পেশাটি চলে এক আইনজীবী থেকে অন্য আইনজীবীর মাধ্যমে। ডিগ্রী আপনাকে যোগ্যতা দিবে, একান্ত আইনজীবী হতে গেলে গুরু ধরতে হবে। এই গুরুর কাছ থেকে আপনি যা শিখলেন তা দিয়েই কোর্ট চলবে। গুরুর মেধা প্রবাহিত হয়ে আপনার কাছে আসবে। সম্পত্তি যেমন এক হাত থেকে আরেক হাতে যায়। সম্পত্তি অযোগ্য হাতে যেমন বিনষ্ট হয় আইন পেশাও তেমনি। তাই আমার নিবেদন আপনারা যারা প্রবীণ আইনজীবী আছেন যোগ্য নবীন আইনজীবী তৈরি করে যান। নবীন আইনজীবীর মাঝেই গুরু বা সিনিয়র আইনজীবী ও আদালত বেঁচে থাকে।
বিচারপতি চাকলাদার বলেন, মানুষ আশা নিয়ে বাঁচে। আমিও আশা নিয়ে বাঁচব। হয়ত কোন দিন আমার দেশে সকলেই কথা বলতে পারবে, নির্ভয়ে রাস্তায় চলতে পারবে। ঘরের বাইরে গেলে গুম হবাব ভয় থাকবে না। বিনা চিকিত্সায় কেউ মরবে না, সেই দিনের প্রতীক্ষায় আছি।
অ্যাটর্নি জেনারেলের উদ্দেশে তিনি বলেন, বিভিন্ন টিভি টকশোতে বার ও বেঞ্চকে নিয়ে যেভাবে সমালোচনা করা হচ্ছে তাতে উচ্চ আদালতের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। এতে আপনার সম্মান থাকলেও বিচারকদের সম্মান বলতে কিছু থাকছে না।
খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, আমরা বিচারপতি শরীফ উদ্দিন চাকলাদারকে আপিল বিভাগ থেকে বিদায় দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের এই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি। আপিল বিভাগে ৫ জন বিচারপতির পদ খালি থাকা সত্ত্বেও রহস্যজনক কারণে জ্যেষ্ঠ অভিজ্ঞ বিচারপতিদের নিয়োগ দেয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, ওয়ান ইলেভেনের সময়ে গণতন্ত্রহীন সমাজে হুমকির মধ্যেও বিচারপতি চাকলাদার বিচারক হিসেবে ন্যায় বিচার করতে পিছুপা হননি।
অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, বিচারপতি চাকলাদার দ্রুত মামলার নিষ্পত্তি করে রায় ঘোষণা করেছেন। যাতে করে কেউ তার রায়ের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ হলে আপিল করতে পারেন। সেখানে অনেক বিচারপতি দুই থেকে তিন বছর রায় ঝুলিয়ে রেখেছেন। ১/১১ এর সময়ের বিচারপতি চাকলাদার যে সাহসী ভূমিকা নিয়ে বিচার কাজ করেছেন তা অনুসরণীয়।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এজে মোহাম্মাদ আলী, অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, বার কাউন্সিলের ফাইন্যান্স কমিটির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শম রেজাউল করিম, বার সম্পাদক ব্যারিস্টার এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, সাবেক সম্পাদক ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদলসহ প্রমুখ আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান বিচারপতি কর্তৃক সংবর্ধনা
বিচারপতি শরীফ উদ্দিন চাকলাদারকে সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে বিদায়ী সংবর্ধনা প্রদান করা হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যায় সুপ্রিম কোর্টের জাজেস লাউঞ্জে দেয়া এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের সকল বিচারপতিগণ উপস্থিত ছিলেন। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা।