বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার এবং রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষেত্রে হাইকোর্টের নির্দেশনাসূমহ বাস্তবায়নে কি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তা আগামী ৯ ফেব্রুয়ারির মধ্যে লিখিত আকারে আদালতকে অবহিত করতে অ্যাটর্নি জেনারেলকে নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চ বুধবার এই আদেশ দেন।
১৯৯৮ সালে ডিবি পুলিশ ঢাকার সিদ্ধেশরী এলাকা থেকে ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনির্ভাসিটির ছাত্র শামীম রেজা রুবেলকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করে। পরে পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় রুবেল মারা যায়। পুলিশ হেফাজতে রুবেলের মৃত্যুর ঘটনায় কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠনের দায়ের করা রিট মামলায় ২০০৩ সালের ৭ এপ্রিল হাইকোর্ট এক রায়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেফতার ও রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রচলিত বিধান ৬ মাসের মধ্যে সংশোধন করতে সরকারকে নির্দেশ দেয়। পাশাপাশি উক্ত ধারা সংশোধনের পূর্বে কয়েক দফা নির্দেশনা মেনে চলার জন্য সরকারকে বলা হয়। এরপর হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে ২০০৪ সালে আপিল দায়ের করে তত্কালীন চার দলীয় জোট সরকার। তখন আপিল বিভাগ লিভ পিটিশন মঞ্জুর করলেও হাইকোর্টের নির্দেশনাসূমহ স্থগিত করেনি।
এদিকে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সরকারের করা আপিল আজ শুনানির জন্য আপিল বিভাগের দৈনন্দিন কার্যতালিকার সাত নম্বর ক্রমিকে অন্তর্ভূক্ত ছিলো। শুনানির শুরুতে হাইকোর্টের নির্দেশনাসূমহ বাস্তবায়নের কি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে আপিল বিভাগ তা অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে জানতে চায়। এ পর্যায়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে বাস্তবায়নের বিষয়টি জানাতে হবে। এজন্য তিনি চার সপ্তাহ সময় চান। আপিল বিভাগ দুই সপ্তাহ সময় মঞ্জুর করে ৯ ফেব্রুয়ারি শুনানির দিন ধার্য করে দেয়। এ সময় রিটকারী পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম ও ব্যারিস্টার সারা হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
২০১০ সালের ১১ আগষ্ট মামলাটি শুনানির জন্য আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় আসে। তখন আদালত হাইকোর্টের নির্দেশনাসূমহ বাস্তবায়নে কি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে সরকারকে তা জানাতে বলা হয়েছিলো। কিন্তু দীর্ঘ ৬ বছর পেরিয়ে গেলেও জনগুরুত্বপূর্ণ মামলার ওই নির্দেশনাসূমহ বাস্তবায়নের কি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তা আদালতকে অবহিত করতে পারেনি সরকার।
হাইকোর্টের নির্দেশনাসূমহ হচ্ছে: ক. আটকাদেশ (ডিটেনশন) দেয়ার জন্য পুলিশ কাউকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করতে পারবে না। খ. কাউকে গ্রেফতার করার সময় পুলিশ তার পরিচয়পত্র দেখাতে বাধ্য থাকবে। গ. গ্রেফতারের তিন ঘন্টার মধ্যে গ্রেফতারকৃতকে এর কারণ জানাতে হবে। ঘ. বাসা বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য স্থান থেকে গ্রেফতারকৃতর নিকটা্তীয়কে এক ঘন্টার মধ্যে টেলিফোন বা বিশেষ বার্তাবাহক মারফত বিষয়টি জানাতে হবে। ঙ. গ্রেফতারকৃতকে তার পছন্দসই আইনজীবী ও নিকটা্তীয়র সঙ্গে পরামর্শ করতে দিতে হবে। চ. গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদের (রিমান্ড) প্রয়োজন হলে ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশক্রমে কারাগারের অভ্যন্তরে কাঁচ নির্মিত বিশেষ কক্ষে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। কক্ষের বাইরে তার আইনজীবী ও নিকটা্তীয় থাকতে পারবেন। ছ. জিজ্ঞাসাবাদের আগে ও পরে ওই ব্যক্তির ডাক্তারি পরীক্ষা করাতে হবে। ট. পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে ম্যাজিস্ট্রেট সঙ্গে সঙ্গে মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করবেন। বোর্ড যদি বলে ওই ব্যক্তির ওপর নির্যাতন করা হয়েছে তাহলে পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ম্যাজিষ্ট্রেট ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন এবং তাকে দণ্ডবিধির ৩৩০ ধারায় অভিযুক্ত করা হবে। এইসব নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে তখন ৬ মাসের সময় বেধে দেয়া হয়েছিলো।