এক যুগেও বাস্তবায়ন হয়নি হাইকোর্টের নির্দেশনা

ফৌজদারী কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেফতার এবং পুলিশ রিমান্ডের ক্ষেত্রে হাইকোর্টের নির্দেশনা এক যুগেও বাস্তবায়ন হয়নি। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে ওই নির্দেশনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সুপ্রীমকোর্টের আপিল বিভাগ থেকে ছয় মাসের সময় নিয়েছিল সরকার। ৫ বছর পর গত বুধবার পুনরায় মামলাটি শুনানির জন্য আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় আসলে সরকার পুনরায় সময়ের আবেদন করে। আপিল বিভাগ সরকারের আবেদন মঞ্জুর করে নির্দেশনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি আদালতকে অবহিত করতে নির্দেশ দিয়েছে।  এ প্রসঙ্গে সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী সাবেক অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এমকে রহমান ইত্তেফাককে বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার রক্ষায় এই রায়ের নির্দেশনাসূমহ সার্বিকভাবে বাস্তবায়ন হওয়া দরকার। হাইকোর্টের ওই নির্দেশনা অনুযায়ী আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দায়িত্ব পালন করলে ভুল কম হবে এবং মানবাধিকার রক্ষায় তারা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারবে। 
 
১৯৯৮ সালে ডিবি পুলিশ ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী এলাকা থেকে ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির ছাত্র শামীম রেজা রুবেলকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করে। পুলিশ হেফাজতে রুবেলের মৃত্যুর ঘটনায় বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট্রসহ (ব্লাস্ট) কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন সন্দেহজনক গ্রেফতার সংক্রান্ত ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা এবং রিমান্ড সংক্রান্ত ১৬৭ ধারার অপব্যবহারের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ১৯৯৮ সালে হাইকোর্টে রিট দায়ের করে। ২০০৩ সালের ২৭ এপ্রিল হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ এক রায়ে ছয় মাসের মধ্যে এ দুটি ধারার বিষয়ে প্রচলিত আইন সংশোধনের নির্দেশ দেয়। আইন সংশোধনের পূর্বে হাইকোর্টের কয়েক দফা নির্দেশনা মেনে চলার জন্য সরকারকে নির্দেশ দেয়া হয়। ওই নির্দেশনায় বলা হয়– (ক) আটকাদেশ (ডিটেনশন) দেয়ার জন্য পুলিশ কাউকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করতে পারবে না। (খ) কাউকে গ্রেফতার করার সময় পুলিশ তার পরিচয়পত্র দেখাতে বাধ্য থাকবে। (গ) গ্রেফতারের কারণ একটি পৃথক নথিতে পুলিশকে লিখতে হবে। (ঘ) গ্রেফতারকৃতের শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকলে তার কারণ লিখে তাকে হাসপাতালে চিকিত্সার জন্য নিয়ে ডাক্তারি সনদ আনবে পুলিশ। (ঙ) গ্রেফতারের তিন ঘন্টার মধ্যে গ্রেফতারকৃতকে এর কারণ জানাতে হবে। (চ) বাসা বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য স্থান থেকে গ্রেফতারকৃতর নিকটাত্মীয়কে এক ঘন্টার মধ্যে টেলিফোন বা বিশেষ বার্তাবাহক মারফত বিষয়টি জানাতে হবে। (ছ) গ্রেফতারকৃতকে তার পছন্দসই আইনজীবী ও নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে পরামর্শ করতে দিতে হবে। (জ) গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদের (রিমান্ড) প্রয়োজন হলে ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশক্রমে কারাগারের অভ্যন্তরে কাঁচ নির্মিত বিশেষ কক্ষে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। কক্ষের বাইরে তার আইনজীবী ও নিকটাত্মীয় থাকতে পারবেন। (ঝ) কারাগারে জিজ্ঞাসাবাদে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া না গেলে তদন্তকারী কর্মকর্তা ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশক্রমে সর্বোচ্চ তিন দিন পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন। তবে এ ক্ষেত্রে উপযুক্ত কারণ থাকতে হবে। (ঞ) জিজ্ঞাসাবাদের আগে ও পরে ওই ব্যক্তির ডাক্তারি পরীক্ষা করাতে হবে। (ট) পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে ম্যাজিস্ট্রেট সঙ্গে সঙ্গে মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করবেন। বোর্ড যদি বলে ওই ব্যক্তির ওপর নির্যাতন করা হয়েছে তাহলে পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ম্যাজিস্ট্রেট ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন এবং তাকে দণ্ডবিধির ৩৩০ ধারায় অভিযুক্ত করা হবে। পুলিশ হেফাজতে বা কারাগারে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি মারা গেলে সঙ্গে সঙ্গে নিকটস্থ ম্যাজিস্ট্রেটকে জানাতে হবে। (ড) পুলিশ বা কারা হেফাজতে কেউ মারা গেলে ম্যাজিস্ট্রেট সঙ্গে সঙ্গে তা তদন্তের ব্যবস্থা করবেন। মৃত ব্যক্তির ময়না তদন্ত করা হবে। ময়না তদন্তে বা তদন্তে যদি মনে হয় ওই ব্যক্তি কারা বা পুলিশ হেফাজতে মারা গেছেন তাহলে ম্যাজিস্ট্রেট মৃত ব্যক্তির আত্মীয়ের অভিযোগের প্রেক্ষিতে তা তদন্তের নির্দেশ দিবেন।
 
হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে আপিল করে সরকার। আবেদনে বলা হয়, সঠিকভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা না করেই ৫৪ ও ১৬৭ ধারা সম্পর্কে হাইকোর্ট নির্দেশনাসমূহ দিয়েছে। এ দুটি ধারা সংশ্লিষ্ট যে আইনে রয়েছে তা যথেষ্ট এবং সঠিক। এর জন্য আইন প্রণয়ন বা সংশোধনের কোন প্রয়োজন নেই। এছাড়া সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্ট আইন সংশোধনের জন্য সংসদকে কোন নির্দেশ দিতে পারে না। আপিল বিভাগ রায়ের নির্দেশনাসমূহ স্থগিতের আবেদন নাকচ করে দেয়। ফলে ওই নির্দেশনাসমূহ এখনো বহাল রয়েছে বলে জানিয়েছেন রিটকারী পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন।
 
৫ বছর পর আবার কার্যতালিকায়
 
আজ থেকে ৫ বছর আগে (২০১০ সালের ১১ আগস্ট) ব্লাস্ট বনাম সরকার মামলাটি শুনানির জন্য আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় আসে। তত্কালীন প্রধান বিচারপতি মোহাম্মদ ফজলুল করিম আইন কর্মকর্তার উদ্দেশে বলেন, গ্রেফতার এবং রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষেত্রে হাইকোর্টের দেয়া নির্দেশনাসমূহ বাস্তবায়ন করার জন্য সরকারকে ৬ মাসের সময় বেধে দেয়া হয়েছিল। সরকার নির্দেশনাসমূহ বাস্তবায়নের বিষয়ে কোন সার্কুলার জারি করেছে কিনা? জবাবে তত্কালীন অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল এডভোকেট এমকে রহমান বলেছিলেন, বিষয়টি জেনে আমি আদালতকে অবহিত করব। এরপর আদালত ওই বছরের ১৭ আগস্ট পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করে। ওই আদেশের পর পেরিয়ে গেছে ৫ বছর। এরপর গত বুধবার মামলাটি শুনানির জন্য পুনরায় আপিল বিভাগের দৈনন্দিন কার্যতালিকায় অন্তভুক্ত হয়। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চ হাইকোর্টের নির্দেশনাসমূহ বাস্তবায়নে কি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তা ৯ ফেব্রুয়ারির মধ্যে লিখিত আকারে অবহিত করতে অ্যাটর্নি জেনারেলকে নির্দেশ দেয়।
 
এ প্রসঙ্গে এমকে রহমান বলেন, ২০১০ সালে আমি যখন মামলাটির দায়িত্ব পাই তখন আদালত এ বিষয়ে অগ্রগতি কি জানতে চেয়েছিলো? ওই সময়ে আমি স্বরাষ্ট্র সচিবসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আপিল বিভাগের আদেশের বিষয়টি অবহিত করি এবং হাইকোর্টের রায়ের নির্দেশনাসমূহের কপি সরবরাহ করি। এছাড়া অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় থেকে চিঠি দিয়ে নির্দেশনাগুলো প্রতিপালন করতে বলা হয়েছিলো। তিনি বলেন, আমি মনে করি সার্বিকভাবে ওই রায় বাস্তবায়িত হচ্ছে না। এমনকি অনেক পুলিশ কর্মকর্তাও রায়ের নির্দেশনাসমূহ সম্পর্কে অবহিত নন। রায় বাস্তবায়িত হলে মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা পাবে।