বেদনা-নাট্যগীত নকশীকাঁথার মাঠ

 
১৪ জানুয়ারি নাট্যাচার্যের প্রয়াণ দিবস। এই দিবসকে ঘিরে ২২ জানুয়ারি শুরু হয় নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন স্মরণোত্সব ২০১৬। এটি উদ্বোধন করেন সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। ওইদিনই সন্ধ্যা ৭টায় স্মরণোত্সব উপলক্ষে এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটারে মঞ্চস্থ হয় ‘নকশীকাঁথার মাঠ’। নির্দেশনা দিয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আনন জামান। আনন জামান এরমধ্যে বাংলা নাট্যমঞ্চে নাট্যকার ও নির্দেশক হিসেবে তার ভিতটি শক্ত করেছেন। এই প্রথম আনন জামান নির্দেশিত ‘নকশীকাঁথার মাঠ’ নাটকটি দেখার সুযোগ ঘটল। হল-ভর্তি উপস্থিতি না থাকলেও যে কজন দর্শক গ্যালারিতে বসেছিলেন, তারা টান টান উত্তেজনা ও মনোনিবেশে নাটকটি উপভোগ করেছেন। খোলা চৌকোনা মঞ্চের চারদিকে দর্শকের বসার স্থান। মঞ্চের চার কোণ অভিনেতা-অভিনেত্রীদের প্রবেশ-প্রস্থানের জন্য নির্ধারিত। শুরু হলো ‘নকশীকাঁথার মাঠ’। কবি জসীমউদ্দীনের এ অমর সৃষ্টি পড়েননি অথবা নামটির সঙ্গে পরিচয় নেই, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সাজু-রুপাইয়ের প্রেমকাহিনি সেকাল থেকে একালে যেন নকশীকাঁথার বুননে লেখা হয়ে আছে। হায় সাজু! হায় রুপাই! দুজনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এক সবুজ প্রেমের পরিসমাপ্তি ঘটে। সেই করুণ পরিণতি দর্শকদের মনে দাগ কেটে চোখের কোণ ভিজিয়ে তাদের নিয়ে যায় মৃত্যুহীন এক প্রেমজ অনুভবে। যে প্রেম সূচ ও আঙুলেরও নানা ভঙ্গিতে ছবি হয়ে আছে সাজু ও রুপাইয়ের প্রেমের স্মৃতি হয়ে। নকশীকাঁথাই কথা বলে সাজু রুপাইয়ের হয়ে। বৃষ্টির জারি আর মাঙনের গীত গেয়ে শিন্নির উপাদান সংগ্রহের সময় যে মেয়েটি রুপাইয়ের মন কেড়ে নিয়েছিল, সে সাজু। রুপাই প্রেমে পড়ে সাজুর। প্রেমের চিহ্ন হিসেবে রুপাই যে সাজুকে চুড়ি, লাল ফিতা উপহার দেয়। খাদ্য উপকরণ হিসেবে দেয় গজা। রুপাইয়ের এই প্রেম উপঢৌকন সাজুকে ভাবায়। যে মেয়েটি গীত গেয়ে গেয়ে বৃষ্টি নামাত, সে রুপাইয়ের এই উপকরণ অথবা উপঢৌকন দেওয়ার প্রেমকৌশলে মজে যায়। তাদের এই প্রেম অথবা প্রণয় নিন্দুকেরা অথবা সমাজের লোকেরা মেনে নিতে পারে না। তাদের প্রেমে যখন নিন্দুকের লাল চোখ হুমকি দেয়। তাদের জীবন যখন উলটপালট হওয়ার উপক্রম, ঠিক তখনই সাজু আর রুপাইয়ের বিবাহ হয়। সাজু ঘর-গেরস্থালিতে মজে যায়। মজে যায় প্রেমে। ঠিক তখনই এক রাতে সাজু স্বপ্ন দেখে। সেটা আসলে দুঃস্বপ্ন। সাজু দেখে রুপাই এক অজানা পথে হারিয়ে যাচ্ছে, যেখান থেকে আর কোনোদিন ফিরবে না। এর কিছুদিন পর চর দখলকে কেন্দ্র করে মানুষ খুন হলে রুপাই ফেরারী হয়। শুরু হয় সাজুর রুপাই-বিনে দুঃসহ সময়, যা সে এঁকে রাখে নানা রঙের সুতায় কাঁথার ভিতর। তাই তো নকশীকাঁথা। যে কাঁথা আসলে রুপাইয়ের জন্য সাজুর অশ্রুতে ভেজা। সাজু ভাবে এই বুঝি রুপাই এলো! না রুপাই আসে না। সাজু আঁকতে থাকে বিভিন্ন রঙের সুতায় তাদের প্রথম প্রেম সময়ের পূর্ণ চিত্র। তবুও রুপাই আসে না। সাজুর বেদনাহত মন শিল্প হয়ে ধরা দেয় নকশীকাঁথায়। সবশেষে সাজু আঁকে রুপাই ফেরারী হওয়ার আগ মুহূর্তের চিত্র। বিরহে শোকে সাজুর মৃত্যু হয়। প্রেম আর প্রণয়ের মিহি সুতায় বোনা ‘নকশীকাঁথার মাঠ’। বর্ণনা, সংলাপ, গান, অভিনয় মিলে এক আকাশস্পর্শী বেদনাগীতি এ ‘নকশীকাঁথার মাঠ’। মরণ এসে যেখানে সাজু আর রুপাইয়ের প্রেমকে নকশীকাঁথায় মুড়িয়ে এক অনবদ্য ট্র্যাজিক নাটকের আবহ তৈরি করে। যদিও আমি এই নাটকের ট্র্যাজিক পরিণতিকে আমলে আনি না। হয়তো ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে এক মহামিলনের আহ্বান শুনি! নাট্য নির্দেশক আনন জামান নিপুণ হাতে কবি জসীমউদ্দীনের ‘নকশীকাঁথার মাঠ’ মঞ্চে এনেছেন। তাকে অভিদান জানাই। সবশেষে বুনন থিয়েটারকে (সাভার) সাধুবাদ দিই এমন একটি প্রযোজনা আমাদের দেখার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। মঞ্চে মঞ্চে ‘নকশীকাঁথার মাঠ’ এই শীতে অথবা আর-শীতে ওম দিক সুধী দর্শকদের। এর বিভিন্ন চরিত্র সৃজনে অথবা অভিনয়ে ছিলেন শুভনন্দ করিম, তুষার কান্তি দে রাজন, আম্তাভ মিহির, দিদারুল দিপু, বুল বুল আহমেদ, রাতমনি, আর ফাহিম, পাপ্পু দাস, ফজলুল হক রানা, মৃদুল ইসলাম, শ্রাবন্তী লিজা, হাজেরা আক্তার কেয়া, ললিত মৌসুম, সিন্নি ফেরদৌস, উজ্জল হাসান, ইমতিল উমু, শম্পা রাজবংশী, মারিয়া বিনতে লতিফ, শাহ তুষার, সুবহে সাদিক, জসীম, সরব দাস।