হারিয়ে যাওয়া নায়িকারা

ই ম রু ল  নূ র

 

নব্বই দশকে চলচ্চিত্রে আসা এক জনপ্রিয় নায়িকার নাম শিল্পী। পুরো নাম আঞ্জুমান আরা শিল্পী হলেও সর্বমহলে শিল্পী নামেই পরিচিত তিনি। ১৯৯৫ সালের দিকে চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে তার। মোহাম্মদ হোসেন প্রযোজিত ও রানা নাসের পরিচালিত ‘প্রিয়জন’ চলচ্চিত্রে প্রয়াত অমর নায়ক সালমান শাহর বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন তিনি। এই ছবিটি তাকে দর্শক প্রিয় করে তুলে অনায়সেই। প্রায় ৩৬টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন এই দর্শকনন্দিত নায়িকা। দর্শকপ্রিয়তার শীর্ষে থেকেও ২০০০ সালে চলচ্চিত্র থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন শিল্পী। তার অভিনীত মুক্তিপ্রাপ্ত সর্বশেষ চলচ্চিত্র দুটি হচ্ছে নায়করাজ রাজ্জাকের ‘প্রেমের নাম বেদনা’ এবং দেওয়ান নজরুলের ‘সুজন বন্ধু’। বর্তমানে অভিনয় ছেড়ে সংসার এবং দুই সন্তান ছেলে সানাদ ও মেয়ে অ্যাঞ্জেলিনাকে নিয়েই ব্যস্ত তিনি।

জীবন রহমান পরিচালিত ‘প্রেম যুদ্ধ’ ছবিতে ১৯৯৪ সালের শেষের দিকে সালমান শাহের সঙ্গে জুটি বাঁধেন নায়িকা লিমা। পরের বছর দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর ‘কন্যাদান’ ছবিতেও দেখা যায় এই জুটিকে। কিন্তু ১৯৯৫ সালের পর থেকেই অনেকটা হারিয়ে যান এই নায়িকা। 

১৯৯৭ সালে মুক্তি পেয়েছিল মোহাম্মদ হান্নান পরিচালিত ‘প্রাণের চেয়ে প্রিয়’ ছবিটি। সেসময় ব্লকবাস্টার ও ব্যবসাসফল হওয়া এই ছবিটি ছিল চিত্রনায়ক রিয়াজের ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট। এই ছবির ‘পড়ে না চোখের পলক’ গানটি হয়ে উঠল সবার প্রিয় গান। সদ্য প্রেমিক হয়ে ওঠা ছেলেটির মুখে ছাড়াও গানটি শোনা যেত গানপ্রেমীদের মুখে মুখে। আর সেই সুবাদে ছবিটি তো সুপারহিট হলোই, রিয়াজ হয়ে গেলেন তারুণ্যের হার্টথ্রব। তার সঙ্গে তারকা বনে গেলেন এক অপরিচিত নায়িকাও, যাকে দেখা গেছে রিয়াজের বিপরীতে। সে আর কেউ নয়, রাভিনা। ঢাকাই সিনেমায় এসেছিলেন আলোর ঝলক হয়ে। একটা নতুন শতাব্দীর শুরুর লগ্নে নতুন একটা প্রজন্ম এই নায়িকাকে দেখেছেন রোমান্টিকতার রাজমুকুট পরা। রাভিনা মূলত মুম্বাইয়ের নায়িকা হলেও সুন্দর চেহারা, ভুবন মাতানো হাসি, ডাগর ডাগর চোখ, মিষ্টি কণ্ঠের সংলাপ দিয়ে বাংলাদেশের দর্শক মাতিয়ে দিয়েছিলেন। হয়ে উঠেছিলেন দর্শকদের প্রিয়জন। ‘প্রাণের চেয়ে প্রিয়’ ছবিটির ব্যাপক সাফল্যের পর রিয়াজের সঙ্গে জুটি বেঁধে আবারও হাজির হয়েছিলেন ‘সাবধান’ ও ‘দলপতি’ সিনেমায়। ছবিদুটিও সাফল্য কুড়িয়েছিল, সেই সঙ্গে রাভিনাও। কিন্তু এরপর আর রাভিনাকে দেখা যায়নি পর্দায়। কোথায় হারিয়ে গেছেন তার আজ কোনো খোঁজ নেই কারও কাছে। বিভিন্ন সূত্রে খোঁজ নিয়ে এতটুকু জানা যায় যে মুম্বাইয়ের নায়িকা হিসেবে পরিচিতি পেলেও রাভিনা কলকাতারই মেয়ে। সেখানেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা। তবে তিনি ক্যারিয়ার গড়তে মুম্বাইয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে তিনি সাফল্য পাননি। এখন হয়তো কলকাতাতেই আছেন।

একসময়ের আলোচিত নায়িকা একা। গুণী নির্মাতা কাজী হায়াতের ‘তেজী’ ও ‘ধর’সহ বেশ কয়েকটি ছবিতে নায়ক মান্নার বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন এই নায়িকা। সেসময় এ জুটিকে বেশ গ্রহণ করেছিল দর্শক। চলচ্চিত্রমহলে বেশ সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন এই নায়িকা। অভিনয় করেছেন নায়ক রুবেলের বিপরীতে ‘বাবা কেন আসামি’ ছবিতেও। এখানেও নজর কাড়তে সক্ষম হন তিনি। নায়ক মান্না মারা যাওয়ার পরও একাধিক নায়কের সঙ্গে জুটি বেঁধে অভিনয় করেছেন। শাকিব খানের বিপরীতে ‘আজকের দাপট’ আলেকজান্ডার বোর সঙ্গে সর্বাধিক ছবিতে অভিনয় ছাড়াও ৩০টির বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। কিন্তু সেভাবে আর নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে একার নামে মাদক ব্যবসার অভিযোগ উঠলে তিনি আমেরিকা চলে যান। এরপর ২০১২-১৩ সালে দেশে ফেরেন। এরপর থেকে চলচ্চিত্রে আর দেখা যায়নি এই নায়িকাকে। বিদায় জানিয়েছেন চলচ্চিত্রকে। 

বাংলা চলচ্চিত্রের আরেক সম্ভাবনাময় নায়িকা ছিলেন সিমলা। যিনি অভিষেক ছবিতেই ‘ফুলি’ ও ‘সিমলা’ নামের দুটি চরিত্রে অভিনয় করে জিতে নিয়েছিলেন ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’। পরিচালক শহিদুল ইসলাম খোকনের ১৯৯৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ওই ছবিতে সিমলার অভিনয় দেখে অনেক চলচ্চিত্র বোদ্ধাই তাকে নিয়ে নানা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আর আলো ছড়াতে পারেননি এ নায়িকা। বরং ছড়িয়েছেন সমালোচনা। ২০১৫ সালে ‘নিষিদ্ধ প্রেমের গল্প’ নামের একটি ছবিতে ১৫ বছরের এক বালকের নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করে সমালোচিত হন তিনি। ছবিতে ওই বালকের সঙ্গে একাধিক যৌনদৃশ্যে দেখা গেছে তাকে। ‘ম্যাডাম ফুলি’র পর আর কোনো ছবিতেই সাফল্যের দেখা পাননি তিনি। তবে ‘ম্যাডাম ফুলি টু’ দিয়ে খুব শিগগিরই তিনি চলচ্চিত্রে ফিরে আসছেন বলে শোনা গেলেও আর ফিরে আসেননি তিনি। এদিকে কিছুদিন আগে আবারও নতুন করে সমালোচনার শিকার হন এই নায়িকা। সম্প্র্রতি ঘটে যাওয়া বিমান ছিনতাইকারী ঘটনা নিয়ে সমালোচনার শিকার হন। পলাশ নামের এক ছেলেকে অনেকটা গোপনে বিয়ে করেছিলেন সিমলা, পরে আবার তাকে ডিভোর্সও দিয়েছেন। এর পরই তার সাবেক স্বামী চট্টগ্রামে বিমান ছিনতাই করার সময় নিহত হন। নিহত হওয়ার আগে জানিয়ে গিয়েছিলেন তার স্ত্রী সিমলার কথা। 

২০০২ সালে ক্লাস সেভেনে পড়া অবস্থায় ‘কেন ভালোবাসলাম’ ছবির মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রে নাম লেখান রত্না। সেলিম আজম পরিচালিত এ ছবিতে তিনি নায়ক ফেরদৌসের বিপরীতে অভিনয় করেন। তবে একই বছর কাজী হায়াত্ পরিচালিত ‘ইতিহাস’ ছবিতে কাজী মারুফের বিপরীতে অভিনয় করে সবার নজরে আসেন এই নায়িকা। তার অভিনীত ছবির সংখ্যা ৪৮। ২০১৫-এর শুরু দিকে হঠাত্ করেই ধস নামে রত্নার ক্যারিয়ারে। সেই ধসেই হারিয়ে যান চলচ্চিত্রের সম্ভাবনাময় এ নায়িকা। এরপর ছোট পর্দায় অভিনয় করে টিকে থাকতে চেয়েছিলেন। শেষমেশ সেটাও পারেননি।

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ঢাকাই চলচ্চিত্রে যখন অশ্লীলতা গ্রাস করেছিল, তখন অনেক নায়িকায় অভিনয় ছেড়ে দেন। চিত্রনায়িকা মুনমুন, ময়ূরী ও পলি তাদেরকে অশ্লীল চলচ্চিত্রের নায়িকা হিসেবে অভিহিত করা হয়। সেসময়ে চিত্রনায়িকা মুনমুন অভিনয় ছেড়ে দিলেও ছাড়েননি পলি। মোহাম্মদ হোসেন পরিচালিত ‘ফায়ার’ ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে পলির। প্রথম ছবিতেই তার বিপরীতে অভিনয় করেন নায়ক মান্না। প্রথম ছবিতেই হন বিতর্কিত। ব্যাংককে ছবিটির চিত্রধারণ করার সময় সেখানে নগ্ন হয়ে নেচেছিলেন পলি, যদিও হলে প্রদর্শনের সময় সেই অংশটুকু দেখানো হয়নি। এরপর একের পর এক চলচ্চিত্রে নগ্ন বা অর্ধনগ্ন হয়ে অভিনয় করতে থাকেন পলি। সারাদেশব্যাপী বিতর্কিত হতে থাকেন। নায়ক মান্না ছাড়াও শাকিব খান, রুবেল, আমিন খান, অমিত হাসান, আলেক জান্ডার বো, মেহেদীসহ অনেকের সঙ্গেই কাজ করেছেন। অভিনয় করেছেন প্রায় ১১৫টি ছবিতে। বাংলাদেশের প্রশাসন যখন চলচ্চিত্রে অশ্লীলতার বিরুদ্ধে কঠোর হতে শুরু করে, তখন পলির অভিনয়ের জনপ্রিয়তা হারিয়ে যেতে থাকে। এরপর মূলধারার চলচ্চিত্র থেকে দূরে সরে যান তিনি।

পলি অভিনীত সর্বশেষ ছবি ‘এক নম্বর আসামী’ ২০১২ সালে মুক্তি পায়। রাজু চৌধুরী পরিচালিত এ সিনেমায় পলির বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন চিত্রনায়ক রুবেল। এরপর তাকে আর দেখা যায়নি। সিনেমায় দেখা না গেলেও চলচ্চিত্র অঙ্গনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখা মেলে তার। এছাড়া চলচ্চিত্র থেকে অবসর নিয়ে সাধারণ বাঙালি মেয়ের মতো সংসার শুরু করেন তিনি। সংসারের পাশাপাশি তিনি একটি বুটিক হাউস প্রতিষ্ঠা করেছেন। সেটা নিয়েই তার এখন যত ব্যস্ততা। সেই সঙ্গে স্বামী, সংসার ও সন্তান—এই তিন ‘স’-তেই নিজেকে এখন আটকে রেখেছেন।