‘কাজ করো নয়তো বিদেয় হও’

ভোটের আগে এলাকায় গিয়ে ‘ভাইরে-বাপুরে’ বলে হাত ধরে ভোট চাইবেন, আর ভোটের পর তাদের সঙ্গে জমিদারের মতো আচরণ করবেন। কিংবা উচ্চপদে বসার পর কাজে মনোযোগ না দিয়ে সরকারের বদনাম ডেকে আনবেন, এমনটি আর হবে না। নিজের দলের এমপি এবং আমলাদের এমন কড়া বার্তা দিয়ে দিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি বলেছেন, হুঁস করে বিমানে চেপে চারটি লোকের সঙ্গে দেখা করে দিল্লি ফিরে এসে বললেন, এলাকার জনগণের সঙ্গে মতবিনিময় করে এলাম। তারা সরকারের কাজে বেজায় বেজায় খুশি! এসব চাটুকারিতা আর চলবে না। হয় কাজ করুন, নয়তো বিদেয় হোন।

 
 মোদী বুঝতে পেরেছেন, নির্বাচনের সময় তার দলের পক্ষে যে ‘গণজোয়ার’ সৃষ্টি হয়েছিল তাতে বেশ খানিকটা ভাটার টান পড়েছে। এর জন্য দায়ী অবশ্যই তার দলের এমপিদের গা-ছাড়া ভাব এবং নির্বাচনী এলাকার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ না রাখা। এমপিদের অহংবোধকেও দায়ী করছেন অনেকে। এ কারণেই দিন দিন অনেক মন্ত্রী এবং এমপিদের প্রতি বিরক্ত হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। এ কারণে তিনি বলেছেন, গ্রামে গিয়ে রাত কাটিয়ে আনকোরা মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে তাদের মন বোঝার কাজটাই সবার আগে করতে হবে। প্রত্যেক মন্ত্রীকে মাসে অন্তত ৩০ ঘণ্টা করে দেশের কোনো প্রান্তে  কাটিয়ে আসতে হবে। ছোট-বড় মিলিয়ে এই মুহূর্তে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় ৬০ জন মন্ত্রী। অর্থাত্, মোদী চাইছেন গ্রাম-ভারতের জন্য তার মন্ত্রীরা মাসে অন্তত ১৮০০ ঘণ্টা বরাদ্দ করুক। কিন্তু কেন এই ফরমান? কেন্দ্রে বিজেপি জমানার দেড় বছর হয়ে গেছে। কোথায় ‘ধন্য ধন্য’ রব উঠবে! তা নয়, উল্টে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে, ‘আচ্ছে দিন এলো কোথায়?’ বিরোধীরা বলছেন, ভোটের আগে তো ভূরি ভূরি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যেন ক্ষমতায় এলেই জাদুর কাঠি দিয়ে ভারতের ছবিটাই বদলে দেবেন। সেই আশায় মানুষ হাত উপুড় করে ভোটও দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রাপ্তির ঝুলিটা তো এখনো প্রায় শূন্য!
 
মোদী বুঝেছেন, শহরকেন্দ্রিক উন্নয়ন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের মন জয় করা যাবে না। তাই মন্ত্রী-এমপিদের নির্দেশ দিয়েছেন, শুধু দিল্লিতে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। গ্রামে যেতে হবে। সরকার যে নীতি ঘোষণা করছে, সেটি আদৌ সব মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, জানতে হবে মন্ত্রীদেরই। মানুষ সরকারের থেকে আর কী চাইছে গ্রামে গিয়েই নিজ কানে শুনতে হবে।
 
কেন এমন সিদ্ধান্ত নিলেন মোদী? তার সরকারের মন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদ গণমাধ্যমকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই ভাবনা যথাযথ পালন করলে, তার ফল সুদূরপ্রসারী। কারণ, মন্ত্রী যদি নিজে গ্রামে গিয়ে সাধারণ মানুষের থেকে খোঁজ-খবর নেন, তা হলে তাতে বাস্তবের ছবিটি যেমন ফুটে উঠবে, তেমনই মন্ত্রীদের গ্রাম-সফরে আমলাতন্ত্রও চাঙ্গা হবে। কারণ, সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ তো সরাসরি মন্ত্রীদেরই। মানুষ তাদের ক্ষোভ-বিক্ষোভও সরাসরি জানানোর সুযোগ পাবেন।’ মন্ত্রীদের পাশাপাশি দলের এমপিদেরও এ ব্যাপারে সক্রিয় করতে চাইছেন প্রধানমন্ত্রী।  
 
অন্যদিকে, আমলাদেরও চাঙ্গা করতে চাইছেন মোদী। কাজে সন্তুষ্ট না হওয়ায় সরিয়ে দিলেন প্রভাবশালী টেলিকম সচিবকে। আমলাতন্ত্রের রদবদল ঘটিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিলেন, কাজ না করলে শাস্তি অবধারিত। মোদী বলেছেন, যারা মানুষের ক্ষোভ মেটাতে সক্রিয় হচ্ছেন না, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। আর সেই কোপ পড়ল টেলিকম সচিব রাকেশ গার্গের উপরে। তাকে সরিয়ে পাঠিয়ে দেয়া হলো সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে। টেলিকম মন্ত্রণালয় সূত্রের খবর, ‘কল ড্রপ’ রোখার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নিতে না পারায় শাস্তির মুখে পড়তে হলো গার্গকে। তার বদলে টেলিকম সচিব করা হয়েছে তার চেয়ে দু’বছরের জুনিয়র জে এস দীপককে। মাস খানেক আগে মন্ত্রিসভার বৈঠকে সকলের সামনেই টেলিকম মন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদকে কার্যত ধমক দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন,  মোবাইলের কল ড্রপ নিয়ে সাধারণ মানুষের অনেক অভিযোগ আসছে। কেন এই সমস্যা সমাধান করা যাচ্ছে না?’ প্রধানমন্ত্রীর ধমক খেয়ে সচিবকে কড়া ভাষায় এই সমস্যা দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন রবিশঙ্কর। নিজেও নজরদারি করতে থাকেন। কিন্তু তাতেও সমস্যার সমাধান হয়নি। শেষ পর্যন্ত রাকেশকে হতে হলো ‘বলির পাঠা’। মোদী ইঙ্গিত দিয়েছেন সচিব হোন, এমপি হোন, কিংবা মন্ত্রী হোন কাজ না করলে পদচ্যুত করতে একটুও হাত কাঁপবে না তার।