আঁধার নামতেই আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো স্বাধীনতা স্তম্ভ। ভাষা শহীদদের স্মরণে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘স্বাধীনতা স্তম্ভে’র উজ্জ্বল আলো যেন ভিন্ন দ্যোতনা ছড়িয়ে দিল বইমেলা প্রাঙ্গণে, মানুষের মনে। বাঙালির জীবনে আবারো ফিরে এলো নতুন বইয়ের গন্ধ জড়ানো মাদকতাময় মাস। শুরু হলো বাঙালির প্রাণের মেলা ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’।
গত কয়েক বছর ধরেই হরতাল, আন্দোলনের প্রভাবে ঠিকমত জমতেই পারেনি বইমেলা। স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে ফেলছিল বইমেলা। এবার যেন পুরানো ছন্দে জেগে উঠবার আভাস দিচ্ছে বইমেলা। গত বছর তো হরতাল ছিলই, তার আগের বছরও দেশ অশান্ত ছিল রাজনৈতিক উত্তেজনায়। গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন যখন শুরু হয় তখন তো প্রকাশকরাও শামিল হয়েছিলেন সে আন্দোলনে। তাই প্রায় বছর তিনেক পরে শান্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির মাঝে শুরু হলো বইমেলা।
ছন্দ ফিরে পাবার প্রত্যাশা যেন সবার মাঝেই ছিল তা বোঝা যাচ্ছিল আয়োজকদের আন্তরিকতা দেখে। বইমেলা প্রাঙ্গণকে যেভাবে সাজানো হয়েছে তা দেখলে মন ভরে যাবে সবার। মেলার বিন্যাসে নতুনত্ব আনা হয়েছে। সারা মেলায় ছড়িয়ে রাখা হয়েছে প্যাভিলিয়ন। আর প্যাভিলিয়নকে কেন্দ্র করে স্টলগুলোকে গুচ্ছ গুচ্ছভাবে বিন্যাস করায় প্রতিটি গুচ্ছই প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে সন্দেহ নেই। প্রতি বছর ঘিঞ্জি-ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকা স্টল দেখে বিরক্ত হন যারা এবার তাদের অবাক হবার পালা। শুধু বই কেনার জন্যই নয়, কিছু সময় কাটানোর জন্য, আড্ডা দেয়ার জন্যও অনেক জায়গা রেখেছে মেলা কর্তৃপক্ষ। বছর দুই আগে খানিক তাড়াহুড়ো করেই মেলার পরিসর বড় করে মূল অংশটিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। সেসময় যা কিছু অসঙ্গতি ছিল সেসব কাটিয়ে এবার বেশ ঘুছিয়ে উঠেছে বইমেলা। সরকারি ও বেসরকারি প্রকাশনী প্রতিষ্ঠান আর লিটল ম্যাগাজিন কর্নার স্থান পেয়েছে একাডেমি প্রাঙ্গণে। বাকি সৃজনশীল সব প্রকাশক ও শিশু কর্নারের স্থান হয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান চত্বরে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে বইমেলাকে এতটাই সুন্দর করে সাজিয়ে তোলা হয়েছে যে, ভিড়ে ঠেলাঠেলি করবার প্রয়োজন পড়বে না। মেলায় ঘুরে বেড়ানোর, স্টলে স্টলে ঘুরে ক্লান্ত লাগলে আছে বসে জিরিয়ে নেবার বেঞ্চ। বাংলা একাডেমি এই বিন্যাসের জন্য ধন্যবাদ পেতেই পারে। মেলা পুরোপুরি গুছিয়ে উঠতে সময় লাগবে। চলছে দোকানগুলোকে সাজিয়ে তোলার কাজ। মেলার প্রথম দিন তাই এখনো চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে প্রস্তুতির চিহ্ন। কাঠ, বাঁশ প্রভৃতি। ছিল ধুলার ওড়াউড়ি; কিন্তু এ সবকিছু ছাপিয়ে পাঠকের বইয়ের প্রতি আগ্রহই বেশি দেখা গেল। স্টলে স্টলে গিয়ে পাঠকরা নেড়ে-চেড়ে দেখছে বই। অনেকে খোঁজ করছেন তার প্রিয় লেখকটির বই এসেছে কি না। প্রথমদিনেই প্রিয় লেখকের বইটি হাতে পাবার আগ্রহ। হোক অল্প; কিন্তু বই বিক্রি শুরু হয়ে গেছে বইয়ের স্টলগুলোতে। প্রিয় লেখকের নতুন বইয়ের মন মাতানো ঘ্রাণ বুকে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন সবাই।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মেলা উদ্বোধন করার পর পরই পাঠকের আনাগোনা মেলায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা করলো যেন। উত্সুক নয়ন মেলে হাজার খানেক মানুষ অপেক্ষায় ছিলেন আগে থেকেই। বইমেলার দ্বার উন্মোচন হতেই তোড়ের মতো ছড়িয়ে পড়লো অসংখ্য বইপ্রেমিক। প্রাণের মেলা– বইয়ের মেলা পরিণত হলো মানুষের মেলায়। এই যে এত আয়োজন, নতুন প্রকাশনা, এত অনুষ্ঠান আয়োজন, উদ্বোধনের এত ঘটা– এসব কিছুই তো পাঠককে উদ্দেশ করেই। সেই পাঠকের আগ্রহ নিয়ে মেলায় ছুটে আসা ভরিয়ে দেয় প্রাণ। সাধারণ দর্শনার্থীর জন্য মেলা উন্মুক্ত করার অনেক আগে থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও দোয়েল চত্বর এলাকায় জড়ো হয় অনেক দর্শনার্থী, যাদের অধিকাংশই তরুণ।
তবে প্রথম দিন বলে ‘নজরুল মঞ্চে’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন শুরু হয়নি। আজ থেকে মোড়ক উন্মোচন, মেলামঞ্চে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান যথারীতি বিকাল চারটায় শুরু হবে।
নতুন বই
প্রথমদিনেই মেলায় এসেছে স্বনামধন্য লেখকদের বেশকিছু বই। তবে বেশিরভাগ প্রকাশনীতেই এখনো নতুন বই আসেনি। ‘কটা দিন দেরি হবে নতুন বই আসতে’। বেশকিছু উল্লেখযোগ্য বই চলে এসেছে মেলায়। অবসর প্রকাশনী মেলায় এনেছে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ‘রবীন্দ্রনাথ কেন জরুরি’, প্রথমা প্রকাশন এনেছে মঈদুল হাসানের ‘উপধারা একাত্তর মার্চ-এপ্রিল’, তাম্রলিপি এনেছে মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘ক্রেনিয়াল’, আগামীতে এসেছে হাসনাত আবদুল হাইয়ের ‘শুচিতা’, মাওলা ব্রাদার্স প্রকাশ করেছে পাভেল রহমানের ‘সাংবাদিকতা আমার ক্যামেরায়’, কথাপ্রকাশে পাওয়া যাবে যতীন সরকারের ‘সাঁকো বাঁধার প্রত্যয়’। অ্যাডর্ন এনেছে সৈয়দ লুত্ফুল হকের ‘বাংলার সভ্যতা ও সংস্কৃতি’, বিশ্বজিত্ ঘোষের ‘নৈঃসঙ্গেরচেতনা’, ফরিদ কবিরের ‘আমার গদ্য’, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ এনেছে হাসান আজিজুল হকের ‘দুয়ার হতে দূরে’ ও আব্দুল গফুরের ‘এক ব্রিটিশ-বাঙালির আত্মকথা’ প্রভৃতি।