এলপি গ্যাস নিয়ে নৈরাজ্য

 
দেশে আবাসিক খাতে পাইপলাইনে গ্যাস সংযোগ বা সরবরাহ নিরুত্সাহিত করছে সরকার। প্রকৃতপক্ষে শিল্পখাতের বাইরে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করতে চাচ্ছে না। আবাসিক ও যোগাযোগ খাতে এলপিজি (তরলীকৃত খনিজ গ্যাস) ব্যবহারের নীতি বাস্তবায়ন করতে চাইছে সরকার। অথচ দেশে এলপি গ্যাস নিয়ে চলছে ভয়াবহ নৈরাজ্য। বাজারে এই গ্যাসের সরবরাহ চাহিদার অর্ধেকেরও কম। বিদ্যমান গ্যাস সংকটের মধ্যে এলপি গ্যাসের সিলিন্ডারের জন্য কার্যত হাহাকার চলছে দেশজুড়ে। ভোক্তাদের কোনো কোনো ক্ষেত্রে দ্বিগুণেরও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে এই গ্যাস।
 
জানা গেছে, সরকারির চেয়ে বেসরকারি এলপিজি সিলিন্ডারের নির্ধারিত মূল্য প্রায় দ্বিগুণ। অথচ সাধারণ ভোক্তাকে খুচরা বাজার থেকে একই বাড়তি মূল্যে এই গ্যাস কিনতে হচ্ছে। ফলে এলপিজিতে দেয়া সরকারের ভর্তুকির সুফল পাচ্ছে না জনগণ, টাকা যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে। আবার প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়েও বাংলাদেশে তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে এলপি গ্যাস। এছাড়া পাইপলাইনের গ্যাস ও সিলিন্ডার গ্যাসের মূল্যের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান রয়েছে। পাইপলাইনের গ্যাস দিয়ে যারা দুই চুলা ব্যবহার করেন, তাদের প্রতি মাসে বিল দিতে হয় ৬৫০ টাকা। আর যারা এলপিজি ব্যবহার করেন, তাদের মাসে খরচ ৩ থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা।
 
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরবরাহের ঘাটতিকে পুঁজি করেই এলপি গ্যাস নিয়ে নৈরাজ্য ও অব্যবস্থাপনা তৈরি হয়েছে। এজন্য সরকারকে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি গ্রাহক অধিকার নিশ্চিত করার ব্যাপারে কঠোর হতে হবে। পাইপলাইনের ও সিলিন্ডারের গ্যাসের এবং সরকারি ও বেসরকারিভাবে বাজারজাতকৃত এলপিজির মূল্যের ব্যবধানও ধাপে ধাপে কমিয়ে আনা জরুরি। এ প্রসঙ্গে গত রবিবার বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু বলেন, পাইপলাইন ও এলপি গ্যাসের দামের পার্থক্যের ব্যাপারে সরকার সচেতন। এটি কমানো হবে। এ ব্যাপারে কাজ করছে সরকার।
 
প্রসঙ্গত, এলপিজি (লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস) হলো একটি বিশুদ্ধ গ্যাসিয়াস হাইড্রোকার্বনের মিশ্রণ। এটি প্রাকৃতিক গ্যাস এবং খনিজ তেল প্রক্রিয়াজাত করার সময় উপজাত হিসেবে পাওয়া যায়। এলপিজি আবাসিক খাতের বাইরেও যোগাযোগ-পরিবহন, রেস্টুরেন্ট, পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প প্রতিষ্ঠানে ব্যবহূত হয়। এটি বোতলজাত করে বিক্রির উপযোগী করা হয়। দেশে সাড়ে ৫, ১২, সাড়ে ১২, ১৮, ২৪, ৩২ ও ৩৫ কেজি গ্যাসভর্তি বোতল বা সিলিন্ডার পাওয়া যায়। তবে সাড়ে ১২ কেজির সিলিন্ডারই বেশি বিক্রি হয়।
 
সরবরাহ চাহিদার অর্ধেকেরও কম:সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন-বিপিসি, আরপিজিসিএল এবং কয়েকটি বেসরকারি এলপিজি উত্পাদনকারী-সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা যায়, দেশে বর্তমানে এলপি গ্যাসের চাহিদা কতটুকু তা এখনও সুনির্দিষ্টভাবে নিরূপিত হয়নি। তবে ২০১১-১২ সালে এ গ্যাসের বার্ষিক চাহিদা ৩ লাখ মেট্রিক টন ছিল। বর্তমানে এ চাহিদা প্রায় ৪ লাখ মেট্রিক টন। এ চাহিদার বিপরীতে দেশে সরকারিভাবে কমবেশি ২০ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি উত্পাদন ও সরবরাহ করা হয়। আর বেসরকারিভাবে সরবরাহ করা হয় ১ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন। বেসরকারি কোম্পানিগুলো আমদানির মাধ্যমে এলপিজি সরবরাহ করে। অর্থাত্ এলপিজির প্রায় ৪ লাখ মেট্রিক টন চাহিদার বিপরীতে মাত্র ১ লাখ ৮০ হাজার মে. টন সরবরাহ করা হয়। যা বিদ্যমান চাহিদার অর্ধেকেরও কম।  এ অবস্থায় আবাসিকে পাইপলাইনের গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দেয়ায় এবং বিদ্যমান লাইনেও সরবরাহ কমে যাওয়ায় সংকট আরো বেড়েছে।
 
সংশ্লিষ্টরা জানান, ইস্টার্ন রিফাইনারী লিমিটেড গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রায় ১৫ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি উত্পাদন করে। একই বছর পেট্রোবাংলার আরপিজিসিএল সিলেটের কৈলাশটিলা গ্যাসক্ষেত্র থেকে ৬ হাজার ৬৯৯ মেট্রিক টন এলপিজি উত্পাদন করে। তেল ও গ্যাস প্রক্রিয়াজাত করে প্রাপ্ত এলপিজি বিপিসির অধীনস্থ এলপি গ্যাস লিমিটেডের মাধ্যমে বিপণন করা হয়।
 
ভর্তুকির প্রভাব নেই: সরকারিভাবে সরবরাহকৃত এলপি গ্যাস সারাদেশে বিপিসির অধীনস্ত কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা, যমুনা এবং স্টান্ডার্ড অয়েলের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়। প্রায় দুই হাজার ৫০০ ডিলারের মাধ্যমে ভোক্তা পর্যায়ে এলপি গ্যাস সরবরাহ করা হয়। বিপিসি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সাড়ে ১২ কেজির প্রতি সিলিন্ডারে সরকার ৪০০ টাকা ভর্তুকি  দেয়। বর্তমানে সরকারি  সিলিন্ডারগুলোর ভোক্তা পর্যায়ে খুচরা মূল্য ৭০০ টাকা। কিন্তু এগুলো এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অর্থাত্ জনগণ ভর্তুকির সুবিধা তো পাচ্ছেই না, উল্টো আরো বাড়তি টাকা দিয়ে এলপি গ্যাস কিনছে। এ ব্যাপারে বিপিসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, খুচরা বাজারে নিয়ন্ত্রণ না থাকায় গ্রাহকরা বঞ্চিত হচ্ছেন। পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা ভর্তুকির টাকার সাথে আরো অতিরিক্ত টাকা পকেটে ভরছেন।
 
কয়েকজন গ্রাহক ও খুচরা বিক্রেতার সাথে কথা বলে জানা যায়, সিলিন্ডারগুলোতে সরকারি ও বেসরকারি কোম্পানিগুলোর সিল লাগানো হলেও তা কাজে লাগছে না। সরকারিভাবে বাজারজাতকৃত বোতলগুলোর গায়ের সিলমোহর ও স্টিকার দ্রুত মুছে ফেলা হয়। ফলে বোঝা যায় না কোনোটা সরকারি কোনোটা বেসরকারি। কারণ একই দোকানে দুই ধরনের বোতলই বিক্রি হয়। এর সুযোগে দোকানিরা সরকারি ও বেসরকারি উভয় বোতল একই দামে বিক্রি করে। এদিকে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, সরকারিভাবে বোতলজাত সিলিন্ডার বাজারে খুব কমই সরবরাহ করা হয়। বেশিরভাগ এলপিজি সরকারি বিভিন্ন সংস্থার কাছে সরাসরি বিক্রি করা হয়। ফলে এলপিজির দাম নির্ধারণে সরকারি ভর্তুকি কোনো প্রভাব ফেলতে পারছে না।
 
ঘাটতির সুযোগ নিচ্ছে ব্যবসায়ীরা: দেশে ৪৪টি বেসরকারি কোম্পানির বর্তমানে এলপিজি সরবরাহের অনুমোদন রয়েছে। এর মধ্যে বাজারের সিংহভাগ দখলে রয়েছে ওমেরা, বসুন্ধরা, পেট্রোগ্যাস,৬ ইনডেক্স, যমুনা, টোটাল গ্যাস, সামিট, বাংলাদেশ অক্সিজেনসহ কয়েকটি কোম্পানির। তবে কয়েকটি বড় কোম্পানির বিরুদ্ধে অনৈতিকভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে। বেসরকারিভাবে প্রতি বছর আমদানি বাড়লেও ঘাটতি দূর হচ্ছে না। আর এ ঘাটতির সুযোগ নিচ্ছেন পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা। ৭০০ টাকার সরকারি এলপিজি বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৬০০ টাকায়। আর ১২০০ টাকার বেসরকারি এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৩০০ থেকে ১৬০০ টাকায়। আবার একই মাপের সিলিন্ডার ভিন্ন ভিন্ন স্থানে পৃথক মূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে। মূলত চাহিদামত ও নির্ধারিত সময়ে এলপিজির বোতল না পাওয়ায় বিক্রেতার কাছ থেকে বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ ক্রেতারা।
 
এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেসরকারি একটি কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে কোম্পানিগুলোর কিছু করার নেই। তারা ব্যবসা করবেই। আর নির্দিষ্ট দামে বিক্রেতারা কোম্পানি থেকে সিলিন্ডার কিনে নিয়ে যায়। তারপর কত দামে কীভাবে বিক্রি করে তা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব কোম্পানিগুলো বহন করে না। এক্ষেত্রে যা করার সরকারকেই করতে হবে।
 
এ প্রসঙ্গে জ্বালানি সচিব নাজিমউদ্দিন চৌধুরী বলেন, বেসকারি কোম্পানিগুলোকে লাইসেন্স দেয় জ্বালানি বিভাগ, তবে বটলিং প্ল্যান্ট নির্মাণের উপযোগিতা যাচাই করে বিপিসি। এখন পর্যন্ত এলপিজির দাম কত হবে তা কোম্পানিগুলোকে নির্ধারণ করে দেয়নি সরকার। এজন্য কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। এ কারণে দাম নিয়ন্ত্রণ বা তদারকি করা সম্ভব নয়। তবে বেসরকারিভাবে এলপিজি বিক্রি বাড়ছে। প্রতিযোগিতা বাড়লে বাজার কাঠামোর মধ্যেই দাম নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।
 
এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি সরকারি দুই প্ল্যান্ট:২০১১ সালে সরকার ১০০ মেট্রিক টন ক্ষমতার দুটি এলপি গ্যাস সিলিন্ডারজাত করার কারখানা প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করে। এর একটি মংলায় এবং অন্যটি চট্টগ্রামের কুমিরায় স্থাপনের কথা ছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত এগুলো পরিকল্পনাতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে, বাস্তবায়ন হয়নি।