আজ শিশুপ্রহর, সকাল থেকে মেলা খোলা

একে ছুটির দিন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিশুপ্রহর। মেলার দুয়ার খুলবে সকাল ১১টায়। তবে তার আগে থেকেই শিশুদের কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠবে বইমেলা। একটানা খোলা থাকবে রাত আটটা পর্যন্ত। শুধু কালই নয়, পরশু শনিবারও শিশুপ্রহর এবং মেলার দ্বার একই সময় সকাল ১১টায় উন্মোচিত হবে। প্রথম শিশুপ্রহর উপলক্ষে সকাল সাড়ে ৮টায় একাডেমি প্রাঙ্গণে শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা হবে। এর উদ্বোধন করবেন শিল্পী সমরজিত্ রায় চৌধুরী।

এবারই মেলার শিশু কর্নারটিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে মেলার বর্ধিত অংশ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। বরেণ্য শিশু সাহিত্যিক রোকনুজ্জামান খান দাদাভাইয়ের নামে এবারের শিশু কর্নারটি সাজানো হয়েছে। শিশু কর্নারে রয়েছে ৩৯টি শিশু প্রকাশনা সংস্থা।

বইমেলায় প্রথম সাপ্তাহিক ছুটির দিন, তাই বলাই যায়- অমর একুশে গ্রন্থমেলা আজ ফিরে পাবে তার পরিপূর্ণ রূপ। গতকাল শীতের মিষ্টি রোদে বইপ্রেমীদের উচ্ছ্বাসে বইমেলা ছিলো প্রাণবন্ত। বইয়ের দোকানগুলো হাতছানি দেয়। নতুন নতুন লেখার সঙ্গে পরিচিত হবার জন্য ঝকঝকে মলাট আমন্ত্রণী আহ্বান নিয়ে উন্মুখ বসে আছে যেন। বইমেলা যেন প্রতিটি বাঙালির মনে এক সম্মোহনী সুর বাজিয়ে যায়। এর টানে সারাদেশের বইপ্রেমী মানুষরা একবারের জন্য হলেও পা ফেলেন মেলা প্রাঙ্গণে।

গতকাল মেলায় এসেছিলেন ষাটোর্ধ্ব শহিদুল আলম। পেশায় ব্যবসায়ী। তিনি বললেন, ফেব্রুয়ারিতে বইমেলায় আসার জন্য এক তীব্র টান অনুভব করি। প্রতিদিন এসে তো আর বই কিনি না; কিন্তু প্রতিদিন না এসে থাকতে পারি না। বইমেলায় আসা যেন তীর্থ ভ্রমণে আসা। বৃহস্পতিবার বিকাল মেলার চতুর্থ দিনে প্রচুর লোকসমাগম ঘটেছে। এতে প্রকাশক ও বিক্রেতারা বেশ খুশি। তারা জানান, ‘এবার মেলার শুরু থেকেই বিক্রি আশানুরূপ। আগামীকাল বিক্রি আরো ভাল হবে বলে আজই সে প্রস্তুতি নিচ্ছি’।

রেহমান সোবহান ও কবি আনিসুল হক

মেলায় এসেছিলেন বরেণ্য অর্থনীতিবিদ ড. রেহমান সোবহান।  বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ঘুরে ফিরে দেখছিলেন বইমেলা। মেলায় এসেছিলেন কবি আনিসুল হক। বললেন, খানিক আগেই জাগৃতির স্টলের সামনে দিয়ে এলাম। স্টলে দেখলাম নির্বাক-নিষ্পলক দীপনের ছবি। দেখে বুকটা কেমন করে উঠল। তখন বিবেকের কাছে প্রশ্ন করি- আমরা কী আসলে তার শোক ভুলতে পেরেছি? ভোলা কি আদৌ উচিত? তিনি বলেন, লেখার কারণে প্রকাশনার কারণে কাউকে হত্যা করা- এর চেয়ে খারাপ কাজ আর নেই। প্রকাশকদের উচিত ভাল বই বের করে দেখিয়ে দেয়া যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তাকে গ্রহণ করি নি, বরং এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি।

মোড়ক উন্মোচন

গতকাল নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচিত হয়েছে ১৭টি। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক গতকাল মেলায় এসেছিলেন। তিনি নজরুল মঞ্চে তিনটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সচিব শ্যামসুন্দর সিকদারের লেখা এ বইগুলো হলো- ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপকল্পের অন্তরূপ’; ‘নির্বাচিত ১০০ কবিতা’ ও ‘মেঘে মেঘে বিজলির চমক’। বই তিনটি প্রকাশ করেছে অনন্যা প্রকাশনী। মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে আরো বক্তৃতা করেন সাবেক শিক্ষা সচিব নজরুল ইসলাম খান, বাংলা একাডেমির সচিব আনোয়ার হোসেন প্রমুখ।

নতুন বই

আজ মেলায় নতুন বই এসেছে ৯৩টি। প্রথম ৪ দিনে মোট বই এসেছে ১৬৩টি। এর মধ্যে গল্প ১৭টি, উপন্যাস ২০টি, প্রবন্ধ ১৩টি, গবেষণা ৩টি, ছড়া ৩টি, শিশু সাহিত্য ২টি, মুক্তিযুদ্ধ ১টি, বিজ্ঞান ২টি, ভ্রমণ ২টি, স্বাস্থ্য ৩টি, ধর্মীয় ২টি, সায়েন্স ফিকশন ১টি এবং অন্যান্য বিষয়ের উপর বই এসেছে ১১টি।

গতকালের উল্লেখযোগ্য নতুন বইয়ের মধ্যে ঐতিহ্য এনেছে মো. নূরুল আনোয়ারের বঙ্গবন্ধু, জিয়া, মঞ্জুর হত্যাকাণ্ড: জতুগৃহ একটিই, রুহুল মাহফুজ জয়ের আত্মহত্যাপ্রবণ ক্ষুধাগুলো ও দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের মাশরাফি। অনিন্দ্য এনেছে হায়াত্ মামুদের লিয়েফ তলোস্তয়ের গল্প ও অধ্যাপক ইনামুল হকের কথাসাহিত্যের ফাঁপা দুনিয়া। এ্যাডর্ন এনেছে সৈয়দ লুত্ফুল হকের বাংলার সভ্যতা ও সংস্কৃতি।

মেলায় আসা নতুন বইগুলোর মধ্যে রয়েছে আল মাহমুদের ‘ছায়ায় ঢাকা মায়ার পাহাড়’, ঝিঙেফুল ও ‘সাহসের সমাচার’ অনন্যা; অধ্যাপক ড. হায়াত্ মামুদের অনূদিত ইসাক বাশেভিস সিঙ্গারের ‘গবেট গিম্পেল’, পূরবী বসুর ‘প্রিয় পঁচিশ গল্প’, চন্দ্রদ্বীপ; বিপ্রদাশ বড়ুয়ার ‘গৃহসজ্জার ৬০ টব সুন্দর’, বাংলাপ্রকাশ; মুহম্মদ নূরুল হুদার ‘জোড়া উপন্যাস’, কথাপ্রকাশ; রণজিত্ কুমার বিশ্বাসের ‘ভয়াবহ সুন্দর একটি লাল জামার গল্প’, নন্দিতা প্রকাশ;

দিনু বিল্লাহর ‘সুরের বরপুত্র শহীদ আলতাফ মাহমুদ’, অনন্যা; শিহাব সরকারের ‘কবিতা সমগ্র’, নবযুগ প্রকাশনী; ইকবাল খন্দকারের ‘ভয়ঙ্কর ডাকু বাড়ি’, মোস্তফা মামুনের ‘রাজা জহিরের টি স্টল’, জয়তী; মো. নূরুল আনোয়ারের ‘বঙ্গবন্ধু, জিয়া, মঞ্জুর হত্যাকাণ্ড জতুগৃহ একটিই’, ঐতিহ্য।

মেলামঞ্চের আয়োজন

গতকাল মেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘বাংলা একাডেমির হীরকজয়ন্তী : গবেষণা কার্যক্রম, অতীত থেকে বর্তমান’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এ বিষয়ে ড. আবুল আহসান চৌধুরী লিখিত প্রবন্ধ তাঁর অনুপস্থিতিতে পাঠ করা হয়। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন অধ্যাপক মনসুর মুসা, ড. ভুঁইয়া ইকবাল, ড. আমিনুর রহমান সুলতান। সভাপতিত্ব করেন ড. মনিরুজ্জামান।

সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করেন শিল্পী সাদী মহম্মদ, খায়রুল আনাম শাকিল, ফেরদৌস আরা, রাহাত আরা গীতি, মহিউজ্জামান চৌধুরী এবং নার্গিস চৌধুরী।

আজকের অনুষ্ঠান

আজ বিকাল ৪টায় মেলার মূলমঞ্চে ‘বাংলা একাডেমির হীরকজয়ন্তী : অভিধান ও ব্যাকরণ কর্মসূচি, অতীত থেকে বর্তমান’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন অধ্যাপক স্বরোচিষ সরকার। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন অধ্যাপক জীনাত ইমতিয়াজ আলী, অধ্যাপক হাকিম আরিফ এবং অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। সভাপতিত্ব করবেন অধ্যাপক আহমদ কবির। সন্ধ্যায় রয়েছে সাংস্কৃতি অনুষ্ঠান।