ঢাকার হাজার হেক্টর জলাভূমি উধাও

বিভিন্ন আইনে জলাধার সংরক্ষণের কথা বলা হলেও আশঙ্কাজনক হারে কমছে রাজধানী এবং এর আশপাশের জলাভূমির পরিমাণ। প্রতিনিয়ত ভরাট হয়ে যাচ্ছে নিম্নাঞ্চল। এর ফলে বর্ষাকালে পানির প্রবাহ যেমন ব্যাহত হচ্ছে, পাশাপাশি নষ্ট হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। প্রাকৃতিক পানির আধারগুলো শেষ হয়ে যাওয়ায় সেচ এবং মাছ চাষ ব্যাহত হচ্ছে। জলাধার সংরক্ষণ আইনে জলাভূমি ভরাটে কড়াকড়ি থাকলেও একটি স্বার্থান্বেষী মহল এ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা ভবিষ্যত্ প্রজন্ম এবং টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে হারিয়ে যাওয়া জলাভূমি উদ্ধার এবং তা সংরক্ষণ জরুরি বলে মনে করছেন।
 
‘ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং’ (আইডাব্লিউএম) এর ২০১৩ সালের গবেষণার তথ্য মতে, ১৯৭৮ সালে ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় জলাভূমির পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৯৫২ হেক্টর। ২০১৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৩৫ হেক্টরে। এতে দেখা যাচ্ছে যে গত ৩৬ বছরে ১ হাজার ১৭ হেক্টর জলাভূমির পরিমাণ কমেছে।
 
উল্লে­খ্য, প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন-২০০০ এ নদী, খাল, বিল, দীঘি, ঝর্ণা বা জলাশয় হিসাবে মাষ্টার প্ল্যানে চিহ্নিত বা সরকার, স্থানীয় সরকার বা কোনো সংস্থা কর্তৃক, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, বন্যা প্রবাহ এলাকা হিসাবে ঘোষিত কোনো জায়গা, সলিল পানি এবং বৃষ্টির পানি ধারণ করে এমন কোনো ভূমিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এসব ভরাট আইনত নিষিদ্ধ। অথচ রাজধানীর খালগুলোকে সংকুচিত করে নির্মাণ করা হয়েছে বক্স কালভার্ট। এতে ক্রমশ হারিয়ে গেছে রাজধানী এবং আশপাশের খাল-বিল ও জলাভূমি। জলাভূমি বৃষ্টির পানি ধারণ, পানি-বাতাস ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন ঘটায়। কিন্তু জলাভূমি না থাকায় তা ক্রমশ ব্যাহত হচ্ছে।
 
পরিবেশ ও জলাভূমি বিশেষজ্ঞরা বলেন, জলাভূমি আমাদের জীবনে যেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, ঠিক তেমনি অর্থনেতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখছে। জলাভূমি আমাদের পানি পরিশোধন ও চাহিদা পূরণ, খাদ্য উত্পাদন, মত্স্য সম্পদ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, বন্যানিয়ন্ত্রণ, ভূগর্ভস্থ ও ভূপৃষ্ঠে পানি সংরক্ষণ, নদীভাঙ্গন রোধ, ভূমি ক্ষয়রোধ, দূষণরোধ, জলবায়ু পরিবর্তনরোধসহ বহুমাত্রিক সুবিধা প্রদান করে থাকে। কিন্তু সকল পরিকল্পনায় জলাভূমি রক্ষা করার কথা বলা হলেও কার্যত এর প্রতিফলন হচ্ছে না।
 
পানি বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ম ইনামুল হক বলেন, জলাভূমি কমে যাওয়ায় ভূগর্ভে পানি স্তর ক্রমেই নিচে চলে যাচ্ছে। যে কারণে সবার দৈনন্দিন পানির চাহিদা মেটানোর জন্য সঙ্কট বৃদ্ধি পাচ্ছে।
 
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক মিহির বিশ্বাস বলেন, রাজধানী এবং আশপাশে অপরিকল্পিত গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন, সড়ক আর শিল্প-কারখানা। ফলে ক্রমেই ভরাট হয়ে যাচ্ছে জলাভূমি ও নিম্নাঞ্চল। একের পর এক পরিকল্পনার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দখল ও ধ্বংস করা হয়েছে বিভিন্ন জলাধার।
 

নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ ফোরামের সভাপতি হাফিজুর রহমান ময়না বলেন, বিভিন্ন আইনে জলাধার সংরক্ষণের কথা বলা হলেও মাঠ পর্যায়ে এর কোনো প্রতিফলন নেই। ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্টের সিনিয়র প্রকল্প কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান বলেন, ভবিষ্যত্ প্রজন্ম এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য আমাদের জলাশয়গুলো রক্ষা করতে হবে।