তরুণরাই মাতিয়ে রাখে সারাবেলা

 
তরুণ পাঠকদের পদচারণায় মুখর হয়েছিল গতকালের বইমেলা। শুরুর কয়েকটি দিন ঢিলেঢালাভাবে কাটিয়ে এখন বইমেলা কানায় কানায় ভরে উঠেছে। পরিণত হয়েছে লেখক, পাঠক প্রকাশকের মিলনমেলায়। পুরোপুরি জমে উঠেছে মেলা।
 
গতকাল শনিবার ছুটির দিনে দলে দলে মেলায় এসে স্টলগুলোতে ভিড় জমিয়েছিলেন তরুণ-তরুণীরা। মেলায় ঘুরে ফিরে, আড্ডা দিয়ে মেলাকে সরগরম করে তুলেছিলেন তারা। সকাল পেরিয়ে বিকাল গড়াবার সাথে সাথে বেড়েছে তাদের ভিড়। গতকালও শিশুপ্রহর ছিল। শিশুদের আনাগোনাও ছিল চোখে পড়বার মত। আর শিশু কর্ণারে তাদের জন্য নির্ধারিত খেলার জায়গা মুখর হয়ে উঠেছিল খুদে সোনামণিদের লুটোপুটিতে।
 
শিশু প্রহরের আগেই একাডেমি প্রাঙ্গণে শুরু হয় শিশু-কিশোর সাধারণ জ্ঞান ও উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতার প্রাথমিক বাছাই পর্ব। শিশু চত্বরে বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে রয়েছে জনপ্রিয় কার্টুন সিরিয়াল সিসিমপুরের স্টল। বই কেনার পাশাপাশি সিসিমপুর শিশুদের বাড়তি আনন্দ দিতে যোগ ছিল ‘সিসিমপুর’র বিভিন্ন চরিত্রের সরব উপস্থিতি। শুক্রবার প্রথম শিশু প্রহরের মতো গতকালও ‘ইকরি’, ‘হালুম’ ও ‘শিকু’রা হাজির হয় শিশু চত্বরের পাশের বটতলাকে ঘিরে সাজানো খেলার মঞ্চে। প্রিয় চরিত্রগুলোর সঙ্গে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে শিশুরা। দুপুর ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত চলে ‘চলছে গাড়ি সিসিমপুরে’ শিরোনামের এ আয়োজন। সিসিমপুরের কর্মীরা জানান, মেলার প্রতি শুক্র ও শনিবার ‘সিসিমপুর’ দল হাজির হবে বইমেলায়।
 
ব্যবসার কাজে ঢাকায় এসেছিলেন বগুড়ার ফজলে এলাহী। কাজ সেরে এসেছিলেন মেলায়। মেলার টানে সঙ্গে এসেছিলেন স্ত্রী শ্রেয়সী রহমান। তিনি বলেন, ঢাকায়  আসছিল, সঙ্গে চলে এলাম। বইমেলার টানেই এসেছি। লেখাপড়া করেছি ইডেন কলেজে। পড়ার সময় কত্তো এসেছি মেলায়। এখন তো প্রতিবছর আসা হয় না। কিন্তু সুযোগ পেলে ছাড়ি না। ভাষার মাসে বইমেলায় যদি আসতে না পারি তো পুরো বছরটাই মাটি– আবেগজড়িত কণ্ঠে বললেন তিনি। বইমেলা নিয়ে সারাদেশের মানুষের মাঝে এমন আবেগই কাজ করে।
 
কাব্যগ্রন্থ ‘মন খারাপের গাড়ি’র মোড়ক উন্মোচন
 
অন্বেষা প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মাহবুবুল হক শাকিলের তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘মন খারাপের গাড়ি’। বিকেলে বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে এটির মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে ছিলেন ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান, সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, অধ্যাপক ফকরুল আলম, কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ও  কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক। নাট্য ও চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঞ্চালনায় আরও ছিলেন অন্বেষা প্রকাশনের স্বত্বাধিকারী শাহাদাত্ হোসেন।
 
নতুন বই
 
একাডেমির তথ্যানুযায়ী, গতকাল মেলায় নতুন ১৫৫টি বই এসেছে। এর মধ্যে গল্প ৩০, উপন্যাস ২৫, প্রবন্ধ ৯, কবিতা ৩৮, গবেষণা ১, ছড়া ৮, শিশুসাহিত্য ৭, মুক্তিযুদ্ধ ২, বিজ্ঞান ৮, ভ্রমণ ২, ইতিহাস ৩, কম্পিউটার ১, ধর্মীয় ২, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি ১ এবং অন্যান্য বিষয়ে ১৭টি। এদিকে, একাডেমির তথ্যমতে, মেলায় শনিবার পর্যন্ত বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা ২৮টি নতুন শিশুতোষ বই মেলায় এনেছে। তবে প্রকাশনা সংস্থাগুলো থেকে জানা যায়, এর সংখ্যা পঞ্চাশের অধিক।
 
নতুন আসা বইগুলোর মধ্যে রয়েছে আহমদ শরীফের ‘উজান স্রোতে কিছু আষাঢ়ে চিন্তা’, আগামী; আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘নজরুল ইসলাম কবি ও কবিতা’, রোদেলা; পবিত্র সরকারের ‘নাতী গণেশের বুড়ি’, আলম তালুকদারের ‘জোলার ছানা ভূতের ছানা’, দীপু মাহমুদের ‘তোতা’, রাতুল গ্রন্থ প্রকাশ; মুনতাসীর মামুনের ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কাপুরুষ সৃষ্টি করেনি কখনও’, জার্নিম্যান বুকস ও ‘জেনারেলের সঙ্গে’ কথাপ্রকাশ; আতিউর রহমানের ‘বঙ্গবন্ধু সহজপাঠ’, জার্নিম্যান বুকস; মহাদেব সাহার ‘হাতে অমৃতকুম্ভ পান করি বিষ’, অনন্যা; বেলাল চৌধুরীর ‘সেরা কিশোর গল্প’, মাহী প্রকাশন; ডা. প্রাণ গোপাল দত্তের ‘হূদয় আমার’, অন্বেষা প্রকাশন; নাসির আলী মামুনের ‘আলাপন’ কথাপ্রকাশ; মোশতাক আহমদের ‘ইলু পিশাচ’, অনিন্দ্য প্রকাশনী; প্রভাস আমীনের ‘স্পের্টিংলি নাও’, আদর্শ; শাহরিয়ারের ‘বেসিক আলী আট’, পাঞ্জেরি পাবলিকেশন্স।
 
মেলামঞ্চের আয়োজন
 
গতকাল বিকেলে মেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ’বাংলা একাডেমির হীরকজয়ন্তী : ফোকলোর কর্মসূচি, অতীত থেকে বর্তমান’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. ফিরোজ মাহমুদ। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ভারতের কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের অধ্যাপক অসীমানন্দ গঙ্গোপাধ্যায়, শাহিদা খাতুন, নন্দলাল শর্মা এবং সাইফুদ্দীন চৌধুরী। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান।
 
অসীম সাহার পরিচালনায় সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সঙ্গীত পরিবেশন করে সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘সহজিয়া’-এর শিল্পীবৃন্দ। সঙ্গীত পরিবেশন করেন কণ্ঠশিল্পী বারী সিদ্দিকী, আকরামুল ইসলাম, দিল আফরোজ রেবা, চন্দনা মজুমদার ও আবদুল হালিম খান।
 
আজকের আয়োজন
 
আজ বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ’বাংলা একাডেমির হীরকজয়ন্তী : অনুবাদ কার্যক্রম, অতীত থেকে বর্তমান’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন বিশিষ্ট অনুবাদক অধ্যাপক আবদুস সেলিম। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন ড. নিয়াজ জামান, অধ্যাপক কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়, ড. ফকরুল আলম এবং আবদুল্লাহ আল মামুন। সভাপতিত্ব করবেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।  সন্ধ্যায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।