এখন শুনি হাই কোর্টে কেউ কেউ প্রকাশ্য আদালতে রায় দেন না, সংক্ষিপ্ত আদেশ দেন, আগে এটা ছিল না, এখন মাসের পর মাস পূর্ণাঙ্গ রায় দেওয়া হয় না, বিচারপ্রার্থীদর ভোগান্তি হয়, জজ সাহেব সম্বন্ধে নানা আলাপ-আলোচনা হয়। তিনি রায় লিখতে পারেন না বলেই প্রকাশ্যে রায় বা আদেশ দেন না।
সাবেক প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরী বলেছেন, এই বিচার বিভাগ এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে। বিচার বিভাগ ধ্বংস হয়ে যাক তা আমরা চাই না, একে বাঁচাতে হবে। বিচার বিভাগ সম্পর্কে ভাল কিছু শুনলে মনটা ভরে যায়। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় থাকলে জনগণের জন্য আইন করে। অটোক্রেটিক সরকার থাকলে তার কথা মত চলতে হয়, তার সুবিধা মত আইন হয়। কিন্তু গণতান্ত্রিক সরকারে জনগণের সুবিধার্থে সবকিছু হয়।
গতকাল মঙ্গলবার বিকালে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও বিরাজমান পরিস্থিতি’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতি এই আলোচনা সভার আয়োজন করে। সভায় প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার গৃহীত পদক্ষেপকে সমর্থন দিতে আইনজীবীদের প্রতি আহবান জানিয়ে সাবেক এই প্রধান বিচারপতি বলেন, প্রধান বিচারপতি সঠিক রাস্তায় নিয়ে যেতে চেষ্টা করছেন। আপনাদের উচিত তাকে সহযোগিতা করা। বিচার বিভাগ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। আপনারা বিচার বিভাগকে বাঁচান। দেশ রক্ষা করুন। দেশের স্বাধীনতা রক্ষা করুন।
বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরী বলেন, নাগরিকত্ব আইনের খসড়া নিয়ে সংবাদপত্রে যে সংবাদ দেখেছি, তা খুবই বিপজ্জনক। যে কোনো নাগরিকের নাগরিকত্ব কেড়ে নিতে পারবে সরকার। ফৌজদারি আইনে একজনের শাস্তি আরেকজন ভোগ করতে পারে না।
অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের রায় লেখা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের সময় নিয়ম ছিল হাই কোর্ট বিভাগে বিচারকরা এজলাসে বসে রায় ঘোষণা করবেন, আইনজীবীরা বসে শুনবেন, কোনো কিছু বাদ গেলে তা বলবেন। আর আপিল বিভাগ শুধু আদেশ অংশ ঘোষণা করতেন। পূর্ণাঙ্গ রায় আসবে পরে। আমি মনে করি না যে অবসরের পর রায় লেখা বেআইনি হবে। তবে অবসরের পর রায় লিখতে হলে কোনো ভাবেই আদেশ অংশ পরিবর্তন করা যাবে না। আদেশ অংশ পরিবর্তন করতে হলে রিভিউ করতে হবে। এটা না করে ছয় মাস বা এক বছর বা দেড় বছর পর যদি কেউ রাতের অন্ধকারে রায়ের আদেশের অংশ পরিবর্তন করে তবে সেটি হবে ফৌজদারি অপরাধ। আমরা তো সেটা করলাম, সেটি ঠিক হয়নি। এ কারণেই প্রধান বিচারপতি বলছেন এটা বেআইনি।
অবসরের পর রায় লেখা নিয়ে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, এখন তো শুনি হাই কোর্টে কেউ কেউ প্রকাশ্য আদালতে রায় দেন না, সংক্ষিপ্ত আদেশ দেন, আগে এটা ছিল না, এখন মাসের পর মাস পূর্ণাঙ্গ রায় দেয়া হয় না, বিচার প্রার্থীদের ভোগান্তি হয়, জজ সাহেব সম্বন্ধে নানা আলাপ-আলোচনা হয়। তিনি রায় লিখতে পারেন না বলেই প্রকাশ্যে রায় বা আদেশ দেন না। এখন নাকি রুল দেয়া নিয়ে সিনিয়র জুনিয়র বিতর্ক হয়, সিনিয়র এজলাস থেকে নেমে যান, এটি দুঃখজনক-লজ্জাজনক।
এ জন্য দায়ী আইনজীবীরা। কারণ আইনজীবীদের দায়িত্ব কাউকে খালাস করে দেয়া বা কাউকে শাস্তি দেয়া নয়। তাদের দায়িত্ব ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য আদালতকে সহায়তা করা।
মাহমুদুল আমিন চৌধুরী বলেন, এখন তো শুনি একজনের কাছে একশ-দেড়শ রায় লেখার অপেক্ষায় রয়েছে। এটা দুঃখজনক। এতো বিপুল পরিমাণ রায় লিখার অপেক্ষায় থাকায় বিচার বিভাগের সর্বনাশ হচ্ছে। এই রায় লিখা পড়ে থাকার জন্য আইনজীবীরাও দায়ী। কেননা তাদেরকে এ বিষয়ে সোচ্চার হতে দেখিনি। বিচার বিভাগকে বাঁচাতে হবে।
সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন বলেন, সুপ্রিম কোর্ট কোনো বিশেষ ব্যক্তির নয়, জনগণের। সংবিধানকে সমুন্নত রাখা এবং দেশের ১৬ কোটি জনগণের অধিকার রক্ষার জন্যই এই সুপ্রিম কোর্টের সৃষ্টি। এই সুপ্রিম কোর্ট ও সংবিধানকে যারা ধ্বংসের চেষ্টা করছেন জনগণ তাদের ক্ষমা করবে না। তিনি বলেন, দলীয় পরিচয় দিয়ে যেসব আইনজীবী কোর্টে ঘুরে বেড়ায় সে রোগে আক্রান্ত না হওয়াই ভাল। বিচারক ও সরকারি কৌঁসুলি হওয়ার জন্য কি দলের দালালি করতে হবে? বিবেক ও চিন্তা শক্তির ওপর নির্ভর করে আইন পেশা পরিচালনা করুন। যদি তা না পারেন তাহলে এ পেশা ছেড়ে দিন। এ পেশায় থেকে জাতির পিতা থেকে শুরু করে অসংখ্য লোককে আইনী সাহায্য দিয়েছি, কখনও প্রতিদান চায়নি। তিনি বলেন, কিছু কিছু জজ যদি কুকর্ম করে থাকে তাদের হাত থেকে বিচার বিভাগ ও সংবিধানকে রক্ষা করতে হবে। ড. কামাল বলেন, অনেক আইনজীবী আছেন যারা কোটি টাকা নিয়ে জামিন এনে দেন তারা আইনজীবী নয়, তারা ভাগাড়।
হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের প্রশ্ন যখন আসবে তখন আইনজীবীদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। ঐক্যবদ্ধ থাকলে সবকিছুই অর্জন করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, আমি যখন বারের সম্পাদক ছিলাম তখন বারের সদস্য ছিল আড়াই হাজার। এরপর ১৫ বছর জজিয়তি করেছি। এখন বারের সদস্য সাড়ে ৬ হাজার। এটা উত্সাহজনক। তিনি বলেন, এই সুপ্রিম কোর্টে আপনারা (আইনজীবী) আছেন, থাকবেন। আপনারাই ন্যায় বিচার ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মশাল তুলে ধরবেন। আর এর জন্য শর্ত একটাই আইনজীবীদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। হাইকোর্টের বিচারক নিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নিমগাছ থেকে ফজলি আম আশা করা বাতুলতা মাত্র। ফজলি আমের গাছ রোপণ করেন তাহলে ফজলি আমই পাবেন। আইনজীবীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে অবশ্যই নীতিমালা করার জন্য আপনাদের সোচ্চার হতে হবে, আন্দোলন করতে হবে। আইনজীবীরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে এটা অর্জন করা অবশ্যই সম্ভব।
এ কে এম জগলুল হায়দার আফ্রিকের সভাপতিত্বে সভায় অন্যান্যের মধ্যে আরো বক্তব্য রাখেন ড. শাহদীন মালিক, এডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, মো. জাহিদুল বারী প্রমুখ।