তখনও দোর খোলেনি বইমেলার। কিন্তু অপেক্ষার প্রহর যেন শেষ হয় না। এমনিতে ছুটির দিনে ভিড় হবে সেতো জানা কথা। কিন্তু কালতো ছুটির দিন ছিল না। তারপরও বিকেল ৩টা না বাজতেই বইপ্রেমীদের বেশ ভিড় জমে যায় বইমেলার প্রবেশ পথে। উত্তরাটা পাওয়া গেল মেলার ভেতরে প্রকাশক মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের কাছ থেকে। শোভা প্রকাশনীর এই প্রকাশক বলেন, এবার মেলা শুরু থেকেই বেশ গোছানো। বইপ্রেমীরাও আসছেন। তবে মেলা জমা বলতে যা বোঝায় তা এখনো হয়নি।
একই কথা বললেন, জয়তী প্রকাশনীর তরুণ প্রকাশক মাজেদুল হাসান। তিনি বলেন, এবার দেশে রাজনৈতিক অবস্থা স্থিতিশীল। যে কারণে মেলা নিয়ে শুরুতেই বইপ্রেমীদের উত্সাহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তরুণ এই প্রকাশক বলেন, তার প্রকাশনী থেকে ১০টি বই এসেছে। আরো ৪০টি বই বের হবে।
লেখক, প্রকাশকরা জানান, আগামী শনিবার পহেলা ফাল্গুন বসন্তের প্রথম দিন। আগের দিন শুক্রবার, সরকারি ছুটির দিন। রবিবার বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। সবমিলিয়ে আশা করছি, শুক্রবার থেকেই মেলা লেখক, প্রকাশক ও বইপ্রেমীদের মিলনমেলায় পরিণত হবে।
এদিকে এখনো মেলায় উল্লেখযোগ্য বিক্রি না হলেও বইপ্রেমীদের আনাগোনায় কমতি নেই। দলবেঁধে তারা আসছেন, আড্ডা দিচ্ছেন। গতকাল রাজধানীর উত্তরা থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তিন শিক্ষার্থী এসেছেন বইমেলায়। এদেরই একজন জেসমিন। একদম বইয়ের পোকা না হলেও প্রতিবছরই বইমেলা থেকে প্রিয় লেখকের বই কেনেন তিনি। জেসমিন জানালেন, তার প্রিয় লেখক হুমায়ুন আহমেদ। এ তালিকায় আরো আছেন, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, আনিসুল হক। ম্যাক্সিম গোর্কিও তার প্রিয় লেখক বলে জানালেন। মেলা থেকে বই কিনেছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে জানালেন, এখনো কেনা হয়নি। ঘুরে ঘুরে মেলায় কী কী বই এসেছে তা দেখছি। বাবার সাথে গতকাল বইমেলায় এসেছে ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র বিপুল। বিপুল জানালো, বইমেলা থেকে এখনো পর্যন্ত কোনো বই তার কেনা হয়নি। তবে প্রিয় লেখক মুহাম্মদ জাফর ইকবালের গল্পের বই সে কিনবে।
এবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মেলার বড় অংশের আয়োজন করায় আগের মতো সেই গাদাগাদি ব্যাপারটি নেই। এছাড়া বইমেলাকে কেন্দ্র করে শিশু একাডেমি থেকে শুরু করে শাহবাগ ছবির হাট পর্যন্ত রাস্তা ও ফুটপাতের উপর চুরি-ফিতা, বাচ্চাদের খেলনা, চটপটি-ফুসকাসহ যে দোকান বসত তাও এবার নেই। ফলে বইপ্রেমীরাও স্বাচ্ছন্দ্যে মেলা ঘুরে দেখতে পারছেন।
নতুন বই
গতকাল বইমেলায় মোট ১০৫টি নতুন বই এসেছে। উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে রাত্রি প্রকাশনী থেকে সৈয়দ শামসুল হকের ‘বাবার সাথে যাওয়া ও অন্যান্য কিশোর গল্প’, সময় প্রকাশন থেকে হাসান হাফিজের ‘নির্বাচিত ১০০ ছড়া’, কথাপ্রকাশ থেকে আরজু মন্দ আরা বানুর ‘সাহিত্য কথনিকা’, অন্বেষা প্রকাশ থেকে আনিসুল হকের কিশোর সাত গোয়েন্দা, পার্ল পাবলিকেশন্স থেকে বিপ্রদাশ বড়ুয়ার ‘প্রাচীন ও নবীন প্রেমের গল্প’, চন্দ্রাবতী একাডেমী থেকে লুত্ফর রহমান রিটনের ‘এই বইটা তোমার’, জ্যোতি প্রকাশনী থেকে ড. মো. আব্দুল ওয়াদুদের ‘না’ ইত্যাদি। গতকাল সাংবাদিক কুদরত ই খুদার বই ‘একটি কুকুরের মৃত্যু ও জীবন সংগ্রাম কাহিনী’র মোড়ক উন্মোচন হয় মেলার ডিআরইউ স্টলে। এ সময় লেখক ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি জামাল উদ্দীন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাবান মাহমুদ, আবু জাফর সূর্য প্রমুখ।
মূল মঞ্চের আয়োজন
গতকাল গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘বাংলাদেশে শিশুসাহিত্য চর্চা : অতীত থেকে বর্তমান’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক শাহীন আখতার। আলোচনায় অংশ নেন আসলাম সানী, রাশেদ রউফ এবং সুজন বড়ুয়া। সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট লেখক রশীদ হায়দার।
আলোচকবৃন্দ বলেন, বাংলাদেশের শিশুসাহিত্য বিচিত্র ও বহুমাত্রিক। আমাদের পূর্ব প্রজন্মের শিশুসাহিত্যিক এবং উত্তরপ্রজন্মের শিশুসাহিত্যিকরা বিষয়বস্তুর নতুনত্ব, ভাষার সজীবতা, অঙ্গীকারের স্বচ্ছতার মধ্য দিয়ে শিশুকিশোরদের স্বপ্নভুবনের সন্ধান দিয়েছেন। নিজস্ব মৃত্তিকার ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে আন্তর্জাতিক চেতনার মেলবন্ধনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যের নবযাত্রা সূচিত হয়েছে।
সভাপতির বক্তব্যে রশীদ হায়দার বলেন, বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখব এ ক্ষেত্রে বাংলার আবহমান ঐতিহ্যের সঙ্গে দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সংযোগ ঘটেছে শিল্পিতরূপে। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আবুল ফারাহ্ মোঃ তোয়াহার পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর’ এবং হাসান আব্দুল্লাহ্র পরিচালনায় সাংস্কৃতিক শিশু-কিশোর সংগঠন ‘ঘাসফুল শিশু-কিশোর সংগঠন’-এর শিল্পীবৃন্দ।