নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালত পর্যন্ত দৌঁড়ঝাপ করেও মামলা থেকে অব্যাহতি প্রাপ্ত ৫ জনকে অভিযোগ পত্রে অর্ন্তভুক্তি করাতে পারেলন না নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন মামলার একটির বাদী নিহত প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি। গত ৮ ফেব্রুয়ারি জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেনের আদালতে মামলার অভিযোগপত্র গঠনের পর বিচার কার্য শুরু হয়ে যাওয়ার ফলে আইনগত ভাবেই সাত খুন মামলা থেকে রেহাই পেয়ে গেল সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজী ইয়াসিনসহ আরো ৪ জন রাজনৈতিক নেতা। যাদের মধ্যে হাজী ইয়াসিনকে নিয়েই সবচেয়ে বেশী মাথাব্যাথা ছিল নিহত নজরুলের পরিবারের। এদিকে সেলিনা ইসলাম বিউটি সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করে আসছিলেন মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর নূর হোসেনের সহযোগী হাজী ইয়াসিন, রাজু, ইকবাল নানা ভাবে তাকে হুমকী দিচ্ছে।
এ ব্যাপারে চার্জশীট থেকে অব্যাহতি প্রাপ্ত সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক হাজী ইয়াসিন মিয়া জানান, রাজনৈতিক প্রভাব বা অর্থের বিনিময়ে নয়, তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রকৃত সত্য উদঘাটন করায় আমরা নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছি। নজরুল ইসলামের পরিবারকে আমরা কোনো হুমকি দিচ্ছি কিনা তা এই এলাকাতে এসে তদন্ত করলেই বেরিয়ে আসবে। তবে আমাদের নামে মিথ্যা মামলা দেয়ার কারণে যে একটি বছর ঘরের বাইরে কাটাতে হয়েছে, মানসম্মান ক্ষুণ্ন হয়েছে তার জন্য সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন হাজী ইয়াসিন মিয়া।
জানা গেছে, সাতখুন মামলায় আসামি হওয়ার পর হাজী ইয়াসিন দীর্ঘদিন পলাতক ছিলেন। আওয়ামী লীগ নেতা হওয়ার সুবাদে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে হাজী ইয়াসিন তদন্তকারী কর্মকর্তাকে কয়েক কোটি টাকা দিয়ে চাঞ্চল্যকর এই মামলার চার্জশীট থেকে নিজের নাম বাদ দেয়ায় অভিযোগ করে বাদী বিউটি চার্জশীটের বিরুদ্ধে নারাজী আবেদন করে। কিন্তু আদালত তা খারিজ করে দেয়ায় মামলা থেকে বেঁচে যায় হাজী ইয়াসিন।
পরবর্তীতে আবারো প্রকাশ্যে এসে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠে মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনের অন্যতম সহযোগী হাজী ইয়াসিন। গত বছরের ৮ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের মামলায় ৩৫ জনকে আসামি করে আদালতে চার্জশীট দাখিল করে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মামুনুর রশীদ মন্ডল। এতে সিটি করপোরেশনের চার নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর নূর হোসেন, র্যাবের প্রাক্তন তিন কর্মকর্তা লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর আরিফ হোসেন ও লে. কমান্ডার এম এম রানাসহ মোট ৩৫ জনকে আসামি করে অভিযোগ পত্র থেকে নিহত প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের স্ত্রীর দায়ের করা মামলার এজাহারভুক্ত পাঁচ আসামিকে অব্যাহতি দেয়ার সুপারিশ করা হয়।
এরা হলেন- সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইয়াসিন মিয়া, সড়ক ও জনপথের ঠিকাদার হাসমত আলী হাসু, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম রাজু, শ্রমিকদল নেতা আনোয়ার, সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে দুই নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করা ইকবাল হোসেন। দেড়কোটি টাকার বিনিময়ে এই ৫ আসামিকে তদন্তকারী কর্মকর্তা অভিযোগ পত্র থেকে অব্যাহতি দেয় বলে অভিযোগ করে পরবর্তীতে অভিযোগ পত্রের বিরুদ্ধে বিউটি নারাজি আবেদন করেন। এতে নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাইদুজ্জামান শরিফ ওই নারাজি আবেদন নাকচ করে পুলিশের দেয়া অভিযোগপত্রই গ্রহণ করে নেন। এরপর বিউটি জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেনের আদালতে নারাজি রিভিউ আবেদন করলে তাও আদালত খারিজ করে দেন। তারপর বিউটি দ্বারস্থ হন উচ্চ আদালতের।
মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনকে ভারত থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং মামলার অধিকতর তদন্তের জন্য হাইকোর্টে রীট করেন বিউটি। গত বছরের ১ ডিসেম্বর বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি আমির হোসেনের দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চ নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের মামলার অভিযোগপত্র ‘মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করেন। পরে পুলিশ চাইলে সাত খুন মামলার অধিকতর তদন্ত করতে পারে মন্তব্য করে বিউটির রিটের নিস্পত্তি করে দেন হাইকোর্ট।