ইউপি নির্বাচন :আস্থার সংকটে ভোটাররা

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগড়ায় এখন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। ছয় দফায় এবার এ নির্বাচন হবে। প্রথম দফার ভোট গ্রহণ ২২ মার্চ। ভোট হবে ৭৫২টি ইউপিতে। কিন্তু এ নির্বাচনকে ঘিরে জনমনে এমন ধারণা বদ্ধমূল হচ্ছে বা এমন ধারণা প্রচার পাচ্ছে যে, নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারবে কি না। অবশ্য নির্বাচন কমিশন থেকে এ বিষয়ে সকল ধরনের আশ্বাস দেয়া হচ্ছে। ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকেও নির্বিঘ্ন ভোট করতে ইসিকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে মর্মে বলা হচ্ছে।
 
নির্বাচন নিয়ে মাঠে-ঘাটে-বাজারে চায়ের স্টলে কথার ঝড় বইছে। নানা আলোচনা-সমালোচনার কথা উঠছে নির্বাচন নির্বিঘ্ন হবে কি না । আর এ প্রশ্নে সরকার বিরোধীরাতো বটেই জনমনে আস্থার বড় সংকট তৈরি হচ্ছে বা করা হচ্ছে। অনেককে বলতে শোনা যাচ্ছে, দলীয় মার্কার এই ভোটে ক্ষমতাসীন দলের বাইরে ভোট দেয়া যাবে কি না। বিশেষ করে সদ্য শেষ হওয়া পৌর নির্বাচনে অনেকক্ষেত্রে দলীয় প্রতীকধারীর প্রতি প্রশাসনের আচরণ প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা যাদের হয়েছে তারা বলছেন, শেষপর্যন্ত সরকারি দলের প্রার্থীর বাইরে কিছু করার থাকবে কি?
 
পক্ষান্তরে সকল ধরনের সুবিধাজনক অবস্থায় থাকার পরেও আওয়ামী লীগের সামনেও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকানো আর প্রতীক পেলেই যেখানে বিজয় অনেকটাই সহজ, সেক্ষেত্রে ‘মনোনয়ন বাণিজ্য’ ঠেকানো।
 
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ এ প্রসঙ্গে ইত্তেফাককে বলেছেন, এমপিদের মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখার কোনো সুযোগ নেই। যদি কারো বিরুদ্ধে ‘মনোনয়ন বাণিজ্যের’ কোনও অভিযোগ প্রমাণিত হয় তবে কঠোর গঠনতান্ত্রিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। নির্বাচন নিয়ে মানুষের মধ্যে আস্থার কোনো অভাবের কথা নাকচ করে দিয়ে জনাব হানিফ বলেন, ‘মানুষের মধ্যে ইতিমধ্যে ভোট উত্সব শুরু হয়েছে। আশা করা যায়, উত্সবমুখর পরিবেশেই মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে। কেউ নিজেদের অপকর্মের জন্য পালিয়ে থাকলে তার দায়িত্ব সরকার নিতে পারে না।’
 
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে না -এটা অতীতের নির্বাচনগুলো প্রমাণ করেছে। আমরা সন্দেহ এবং সংশয় নিয়ে আন্দোলনের অংশ হিসাবে নির্বাচন করতে যাচ্ছি। ইসি সরকারের আজ্ঞাবহ কমিশনে পরিণত হয়েছে এবং তারা সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে চলেছে। সবাই আজকে ইউপি নির্বাচন সম্পর্কে সন্দিহান’।
 
 সুশাসনের জন্য নাগরিকের ( সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার ইত্তেফাককে বলেন, ‘নির্বাচনী সার্বিক ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাহীনতা ব্যাপক। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিও পুরোপুরি আস্থা রয়েছে তা বলা যায় না। এবার দলীয় প্রতীক হওয়ায় নতুন উপসর্গ যোগ হয়েছে। মনোনয়ন বাণিজ্য হচ্ছে। বিক্রির তালিকায় নৌকা ও ধানের শীষ রয়েছে। আস্থাহীনতা ভয়ংকর আকার ধারণ করেছে। মানুষ নিজের ভোট দিতে পারবে কি না সেটি নিয়ে তারা শংকিত’।
 
দেশের বেশ কয়েকটি জায়গা থেকে ইত্তেফাকের প্রতিনিধিরা জানান, ক্ষেত্রবিশেষ তৃণমূলের ক্ষমতাসীন দলের এমপি, নেতাদের প্রভাব এতটাই যে ভাল; নির্বাচনে খোদ প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছাও অনেক সময় কাজে লাগতে নাও পারে। কারণ ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে প্রশাসনের অতি উত্সাহীরাও যোগ হয়ে থাকেন। দেশের বেশকিছু স্থানে এমন দৃশ্যপট সদ্য সমাপ্ত পৌর নির্বাচনেও দেখা গেছে। 
 
গত ৫ জানুয়ারি সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসার পর নির্বাচনে ভোটাধিকার নিশ্চিত হওয়া; না হওয়ার প্রসঙ্গটি দীর্ঘদিন পর সামনে চলে এসেছে। অনেকের মতে, আওয়ামী লীগ সরকার সারাদেশে মানুষের কল্যাণে যে উন্নয়ন করছে, ভোটের মাঠে তার প্রতিফলন ঘটতে দেখা যায় না। মানুষের জন্য কিছু করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও আন্তরিকতা থাকার পরও মানুষের মধ্যে থেকে নেতিবাচক মনোভাব পুরোপুরি যাচ্ছে না। বিশেষ করে বিগত সময়ে দেশের পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন তারই উদাহরণ হিসাবে দেখাচ্ছেন অনেকে। পাশাপাশি সরকার বিরোধী গোষ্ঠীর নেতিবাচক প্রচারণা রয়েছে। আবার কিছু জায়গায় সরকার সমর্থকদের উন্নয়ন প্রচারের তুলনায় মাঠের কিছু নেতা-কর্মীর দুর্বৃত্তায়ন, দুর্নীতি, সবকিছুতেই ভাগাভাগি সাধারণ মানুষ ভালভাবে নিচ্ছে না। ফলে গত ৫ জানুয়ারির আগে-পরের আন্দোলনের নামে নৃশংসতাও ভুলে মানুষকে সরকারের বিপক্ষেই অবস্থান নিতে দেখা যাচ্ছে।
 
এ রকম বাস্তবতায় তৃণমূলের এই গুরুত্বপূর্ণ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। কিন্তু এ নির্বাচনকে ঘিরে ইতিমধ্যেই জনমনে আস্থার সংকটের কথা প্রচার পাচ্ছে।  যদিও এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ প্রায় সকল রাজনৈতিক দল অংশ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
 
এখন পর্যন্ত মাঠ পর্যায় থেকে ইত্তেফাকের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে যেসব খবর পাওয়া যাচ্ছে, তাতে সরকারি দলের বিরুদ্ধে অন্যান্য বিরোধী দলের প্রার্থী পাওয়া বেশ কষ্টসাধ্য। কারণ নিশ্চিত পরাজয় জেনে এমন নির্বাচন করতে অনেকে আগ্রহী হচ্ছেন না। এটি যে শুধুমাত্র জোর করে ভোট নেয়া হতে পারে এই আশঙ্কা থেকে তা নয়, অনেক ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের ভাল প্রার্থীও আছে, সঙ্গে সরকারের উন্নয়নমুখী প্রচার ও প্রভাব কাজ করছে।
 
বিএনপি পক্ষের ক্ষেত্রে দুটি বড় সমস্যাও আছে। প্রথমত, ৫ জানুয়ারির আগে-পরে নাশকতায় অংশ নিয়ে তৃণমূলের অধিকাংশই মামলার আসামি। দ্বিতীয়ত অনেকের মনে এমন আশঙ্কাও আছে, ক্ষমতাসীন দলের বিপক্ষে শক্তিশালী প্রার্থী হলে তার বিরুদ্ধেও নতুন মামলা হবে না সে নিশ্চয়তা কোথায়? 
 
ইত্তেফাকের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর থেকে জানা যায়, আওয়ামী লীগের যারা এমপি (যদিও তাদের মনোনয়ন প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়েছে) দলীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছে লোকজন বলে পরিচিতদের কদর বেড়ে গেছে। মনোনয়ন পাইয়ে দেয়ার আশ্বাসে বাণিজ্যে নেমেছেন অনেকে। আবার এমপির কোটারী লোকজন বলে বেড়াচ্ছেন শেষ বিচারে এমপির কথামতোই মনোনয়ন হবে— তাই তারাও বাণিজ্যে নেমে পড়েছেন।
 
এ বিষয়ে অবশ্য নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেয়াজ ইত্তেফাককে বলছেন, মানুষের মধ্যে ধারণা যাই থাক; তা নিয়ে নির্বাচন কমিশন বসে থাকবে না। সকলের ভোটাধিকার প্রয়োগের সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে কমিশনের পক্ষ থেকে সব ব্যবস্থাই থাকবে। এখন কেউ যদি মনে মনে ভাবে ভোট দিতে গিয়ে লাভ নেই, তাকে তো আর কমিশন ধরে আনতে পারবে না। তিনি মনে করেন, সুষ্ঠু অবাধ নির্বিঘ্ন ভোটের জন্য ভোটারদেরও দায়িত্ব রয়েছে। প্রশাসন যাতে পক্ষপাতহীন থাকে সে বিষয়ে কমিশন আগেও কঠোর ছিল, আছে এবং থাকবে।