জ্বালানি তেল কেনাবেচায় সরকারের কাছ থেকে নেয়া ৪৩ হাজার কোটি টাকা ঋণের দায় থেকে মুক্তি চেয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এর আগে ঋণের অর্থ মালিকানা স্বত্ব (ইক্যুইটি) হিসাবে পরিবর্তনের দাবি করলেও এখন ওই অর্থ ভর্তুকিতে রূপান্তরের প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি। গত ১ ফেব্রুয়ারি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং অর্থ বিভাগে এ ব্যাপারে চিঠি দিয়েছে বিপিসি। চিঠিতে দেশের তেল খাতে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা, সংস্থাকে গতিশীল ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা এবং বিদেশি সংস্থাগুলোর সঙ্গে লেনদেনে কোম্পানির ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে এই ঋণ অবলোপন ও দায়মুক্তি চাওয়া হয়েছে।
অর্থ বিভাগ ও বিপিসি সূত্রে জানা যায়, বিপিসির কাছে ঋণ বাবদ ২৬ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা এবং বন্ড ইস্যু বাবদ ১৭ হাজার ২২৮ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের। এর বাইরে জ্বালানি তেল আমদানি ও সরবরাহকালে আদায়কৃত ভ্যাট বাবদ ২ হাজার ১৮ কোটি টাকা পাবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলেও দেশের বাজারে না কমায় গত আড়াই বছরে অর্জিত লাভের টাকায় দেশি-বিদেশি ব্যাংক ও সংস্থার কাছ থেকে নেয়া ঋণ ইতিমধ্যে পরিশোধ করেছে সংস্থাটি। এখন শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছেই দায় রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় বিপিসিকে কয়েক বার ঋণের অর্থ পরিশোধ কিংবা বিপিসির লাভ থেকে মন্ত্রণালয়ে অর্থ দেয়ার জন্য তাগাদা দেয়। কিন্তু বিপিসি বলছে, বিপিসি সরকারেরই প্রতিষ্ঠান। অর্থ মন্ত্রণালয় এখন ভর্তুকির টাকা ঋণ হিসাবে গণ্য করে ফেরত চাইছে।
অর্থ বিভাগ এবং জ্বালানি বিভাগের পৃথক সূত্র জানায়, সম্প্রতি সরকার তেলের মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে কিছুটা হলেও সমন্বয় করার উদ্যোগ নিয়েছে। সুপারিশসহ এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন বিপিসি জ্বালানি বিভাগে জমা দিয়েছে। সেটি অর্থ মন্ত্রণালয়েও পাঠানো হয়েছে। এই চিঠি বিনিময়ের মধ্যেই বিপিসি ও জ্বালানি বিভাগের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বিপিসিকে আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা প্রয়োজন। তাই তেলের দাম সমন্বয়ের আগে সরকারি যে ঋণ ও দায় বিপিসির ঘাড়ে রয়েছে তা লাঘব করতে হবে। নতুবা তেলের দাম সমন্বয় না করে পরে লাভের মাধ্যমে অর্জিত টাকা দিয়ে দায় শোধ করা যেতে পারে। এ কারণে তেলের দাম কমানোর বিষয়টিও এ ইস্যুতে আটকে রয়েছে।
এর আগে গত বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি সরকারের দেয়া ২৬ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা ঋণ এবং ১৭ হাজার ২২৮ কোটি টাকা বন্ডসহ মোট ৪৩ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা বিপিসির ইক্যুইটি হিসাবে রূপান্তরের অনুমোদনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় এবং জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয় সংস্থাটি। কিন্তু হঠাত্ সে অবস্থান থেকে সরে এসে তারা গত ১ ফেব্রুয়ারি ওই ঋণকে ইক্যুইটিতে পরিবর্তন না করে ভর্তুকিতে রূপান্তরের জন্য অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেয়।
চিঠিতে বলা হয়েছে, সরকার নির্দেশিত মূল্যে বিপিসি আমদানিকৃত ও উত্পাদিত বিভিন্ন গ্রেডের জ্বালানি তেল বিক্রি করে। সরকার নির্ধারিত মূল্যে পণ্য বিক্রি করায় ১৯৯৯-২০০০ থেকে ২০১৩-১৪ পর্যন্ত মোট ১৫টি অর্থবছরে ৫২ হাজার ৩৩১ দশমিক ৫৯ কোটি টাকা লোকসান দেয় বিপিসি। তা সত্ত্বেও এ সময়কালে প্রায় ৪৭ হাজার ৫১৪ দশমিক ৩৮ কোটি টাকা শুল্ক-কর ও ভ্যাট বাবদ সরকারি কোষাগারে জমা করা হয়। ২০০৭-০৮ থেকে ২০১৩-১৪ পর্যন্ত এই ৭ অর্থবছরে সরকার অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ৩ ও ৫ শতাংশ সুদে বিপিসিকে ঋণ দেয়। ওই ঋণ ইক্যুইটিতে রূপান্তরের পরিবর্তে ভর্তুকি হিসাবে রূপান্তর করাই ‘অধিকতর যুক্তিযুক্ত’ হবে।
এ প্রসঙ্গে বিপিসি’র চেয়ারম্যান এ এম বদরুদ্দোজা বলেন, ‘বিপিসিকে গতিশীল করতেই দায় থেকে মুক্তি চাওয়া হয়েছে। আগে ঋণের টাকা ইক্যুইটিতে পরিণত করার অনুরোধ জানানো হলেও এখন আর্থিক উপদেষ্টাদের পরামর্শে তা ভর্তুকিতে রূপান্তরের অনুরোধ জানিয়েছি। কেননা ঋণের টাকা এখন কোম্পানিতে নেই, তাই তা আর মালিকানা স্বত্ব হিসাবে গণ্য করা যাবে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘এনবিআর এর আগে আমাদেরকে ভ্যাটের টাকা দিতে বলেনি। তাই আমরাও সরকারকে এ বাবদ সহায়তা-ভর্তুকি দিতে বলিনি। এখন ২ হাজার ১৮ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে বলে চিঠি দিয়েছে। তাই দাবিকৃত ওই বকেয়ার দায় থেকেও মুক্তি চেয়ে অনুরোধ জানানো হয়েছে।’
তবে বিপিসির এই ঋণকে ভর্তুকিতে রূপান্তরের অনুরোধের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বিপিসির মত প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া দরকার। উদ্ভাবনী কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের সে সুযোগ রয়েছেও। বিপিসির প্রয়োজন মত সরকার ঋণ দিয়েছে। এ ঋণের টাকা জনগণেরই টাকা। তাই এখন তা ভর্তুকিতে রূপান্তর বা ঋণ মওকুফ না চেয়ে পরিশোধ করাই উচিত।’
এদিকে আগের চিঠিতে বিপিসি জানিয়েছিল, বর্তমানে সরকার জ্বালানি তেলের মূল্যে ঢালাওভাবে ভর্তুকি বা লোকসান দিতে আগ্রহী নয়। এক্ষেত্রে কৃষকদের আর্থিক সহায়তা আগের ন্যায় পরোক্ষভাবে না দিয়ে প্রত্যক্ষভাবে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেয়ার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এ অবস্থা চলমান থাকলে বিপিসি একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। সেক্ষেত্রে মুনাফার যে কোনো অংশ রাষ্ট্রের প্রয়োজনে সরকার যে কোনো সময় সংগ্রহ করতে পারবে। কিন্তু যেখানে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী তেল বিক্রি করায় হাজার হাজার কোটি টাকা লোকসান দিতে হয়েছে, সেখানে ঋণ হিসাবে বরাদ্দকৃত অর্থ সরকার মওকুফ করলে ঐ অর্থের সমপরিমাণ অর্থের দায়কে অবলোপন করে ইক্যুইটিতে স্থানান্তর করা বিপিসির পক্ষে সম্ভব হত। কেননা বর্তমানে বিপিসির নিকট সরকারের ঋণের পরিমাণ ব্যালেন্স শিটে দৃশ্যমান। এ ধরনের দায়যুক্ত প্রতিষ্ঠানের সাথে যে কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়িক সম্পর্ক সৃষ্টি করতে আগ্রহী হবে না। তাছাড়া বিদেশি সরবরাহকারী বা ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের কাছেও এ কারণে সরকার ও বিপিসির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
প্রসঙ্গত, বর্তমানে দেশে বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেল আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় ৩ থেকে ৪ গুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। প্রতি লিটার অকটেন ৬৩ টাকায় উত্পাদন করে ৯৯ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। ৬২ টাকা ৫০ পয়সায় উত্পাদিত পেট্রোল ৯৬ টাকায়, ৪০ টাকা ১৬ পয়সায় কেনা ডিজেল ও ৪০ টাকা ৬১ পয়সায় কেনা কেরোসিন ৬৮ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এছাড়া ২৫-২৬ টাকায় উত্পাদিত ফার্নেস তেল বিক্রি হচ্ছে ৬২ টাকায়।