হারিয়ে যাচ্ছে দিনাজপুরের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষা। দুটি ভাষা হারিয়ে যাবার পর অন্তত আরো ১০টি ভাষা হারিয়ে যেতে বসেছে। মাতৃভাষায় শিক্ষার অভাব, নিজস্ব বর্ণমালা ও শক্তিশালী সংগঠন না থাকা মূল কারণ বলে মনে করেন বোদ্ধা মহল। সেই সাথে জনসংখ্যা হ্রাস, সংস্কৃতি চর্চার অভাব এবং সম্প্র্রদায়গুলোর আর্থিক দুরাবস্থাও এর অন্যান্য কারণ।
এ বিষয়ে আদিবাসী সরেন মুরমু বলেন, ‘বর্মণ জনগোষ্ঠীর বর্মণ ভাষা, মাহাত সমপ্রদায়ের মাহাত ভাষা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বর্তমানে মরতে বসেছে উরাও, রাজবংশী, পাহাড়িয়া, মুসাহার, কোচ, হাজং, তুরী, বাগদি প্রভৃতি ভাষা। জাতিগতভাবে পাংখো, খেয়াং ও কুমি আছে প্রান্তিক পর্যায়ে। কোচ সমপ্রদায়ের ভাষা এখন দুই-একজন বয়স্ক ছাড়া কেউ জানে না। নতুন প্রজন্ম কথা বলে বাংলা বা চাকমা ভাষায়।’
জানা গেছে, উরাও জাতির প্রায় ২ লাখ লোকের মধ্যে বড়জোর ১৫ হাজার লোক নিজেদের ‘কুরগ’ ভাষায় কথা বলতে পারে। বাকিরা কথা বলে ‘সাদ্রী’ ভাষায়। মাতৃভাষার স্বীকৃতি না থাকায় বাধ্য হয়ে ক্ষুদ্র হয়ে এসব জনগোষ্ঠী ঝুঁকে পড়ছে বাংলা, চাকমা, মারমা কিংবা অন্য ভাষার দিকে।
আদিবাসীদের মতে—আর্থিক দুরাবস্থার কারণে আদিবাসী ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলো তাদের ভাষা ধরে রাখতে পারছে না। পিছিয়ে থাকা পরিবারগুলোকে উন্নত সুযোগ-সুবিধার প্রলোভন দেখিয়ে পূর্ব-পুরুষের বসতভিটা থেকে নিয়ে আসা হয় অন্য জায়গায়। এতে ভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের সংস্পর্শে এসে পশ্চাত্পদ জাতির লোকজন ভুলে যাচ্ছে তাদের মায়ের ভাষা।
সিডিসি নির্বাহী পরিচালক যাদব চন্দ্র বলেন, ‘আদিবাসীদের মাতৃভাষায় কোনো স্কুল না থাকায় তারা লেখাপড়ায় অগ্রসর হতে পারছে না। কারণ, প্রাইমারি পর্যায়ে নিজস্ব ভাষার কোনো স্কুল না থাকায় বাংলা লেখাপড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না। এ কারণে তাদের মাতৃভাষার একটি স্কুল দিনাজপুর সদর উপজেলার ৩নং ফাজিলপুর ইউনিয়নের সিলিম খাঁ আদিবাসী পল্লীতে একটি আদিবাসী প্রাইমারি স্কুল খোলা হয়েছে। এ স্কুলে ৩০ জন ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে। সংকট দেখা দিয়েছে শিক্ষকদের। ভালো শিক্ষক না থাকার ফলে তাদের মাতৃভাষা শিক্ষা দেয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে অভাবের তাড়নায় আদিবাসী শিশুরা স্কুলে আসতে চায় না। ফলে স্কুলটিও প্রায় অচল হয়ে পড়ছে দিন দিন।’