মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের আরো ৪টি মামলার বিচার চলছে। এর আগে মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বিচারিক কার্যক্রম শেষে আরো ২২টি মামলার রায় ঘোষণা করেছে। যার মধ্যে ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আনা আপিল মামলার চূড়ান্ত নিস্পত্তি শেষে ৪ মামলার রায়ও কার্যকর করা হয়েছে। এ পর্যন্ত রায় আসা ২২টি মামলার ২৬ আসামির মধ্যে ১৮ যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হয়েছে।
চলমান মামলাগুলো হচ্ছে-একটি মামলায় তিন আসামি হবিগঞ্জ জেলার খাগাউড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মাহিবুর রহমান ওরফে বড় মিয়া, তার ছোট ভাই বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান ওরফে আঙ্গুর মিয়া ও তাদের চাচাতো ভাই আব্দুর রাজ্জাকের বিরুদ্ধে গত ২৯ সেপ্টেম্বর অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে।
একটি মামলায় আসামি জামালপুরের আট রাজাকারের বিরুদ্ধে গত ২৬ অক্টোবর অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরুর আদেশ দেয়া হয়েছে। ১৮ নভেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছে। একই মামলার আট আসামির মধ্যে দু’জন এডভোকেট শামসুল আলম এবং এস এম ইউসুফ আলী কারাগারে আছেন। পলাতক বাকি ছয়জন হলেন- আলবদর বাহিনীর উদ্যোক্তা মো. আশরাফ হোসেন, অধ্যাপক শরীফ আহমেদ ওরফে শরীফ হোসেন, মো. আব্দুল হান্নান, মো. আব্দুল বারী, মো. হারুন ও মো. আবুল কাসেম।
একটি মামলায় কিশোরগঞ্জের পাঁচ রাজাকারের বিরুদ্ধে গত ১২ অক্টোবর অভিযোগ গঠন করা হয়। আসামিদের বিরুদ্ধে গত ৪ নভেম্বর সাক্ষ্য-গ্রহণ শুরু হয়েছে। একই মামলায় পাঁচ আসামি হচ্ছেন জেলার করিমগঞ্জের দুই সহোদর সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন মো. নাসিরউদ্দিন আহমেদ ও কিশোরগঞ্জ জেলা বারের আইনজীবী মো. শামসুদ্দিন আহমেদ এবং কিশোরগঞ্জের রাজাকার কমান্ডার গাজী আব্দুল মান্নান, হাফিজ উদ্দিন ও আজহারুল ইসলাম।
একটি মামলায় আটক যশোর-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জাতীয় পার্টির নেতা সাখাওয়াত হোসেনসহ ৯ রাজাকারের বিরুদ্ধে গত ২৩ ডিসেম্বর অভিযোগ (চার্জ) গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরু হয়েছে। গত ৮ সেপ্টেম্বর সাখাওয়াত হোসেনসহ ৯ রাজাকারের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) আমলে নিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। আসামিদের বিরুদ্ধে গত ২৬ জুলাই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করে প্রসিকিউশন।
সাখাওয়াত হোসেন ছাড়া অন্য আট আসামি হলেন- মো. বিল্লাল হোসেন, মো. ইব্রাহিম হোসেন, মুজিবর রহমান, মো. আব্দুল আজিজ সরদার, আজিম সরদার, কাজী ওয়াহেদুল ইসলাম, মো. লুৎফর মোড়ল এবং মো. আব্দুল খালেক মোড়ল। সাখাওয়াত হোসেন, বিল্লাল হোসেন ও মো. লুৎফর মোড়ল কারাগারে বাকি ছয়জন পলাতক।
এদিকে গত ৬ জানুয়ারি জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদন্ড বহাল রেখে মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আনা আপিলের রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এ মামলা এখন পূর্ণাঙ্গ রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে। এটি আপিলের ষষ্ঠ রায়। আপিলে চূড়ান্ত পাঁচটি রায়ের পর চারটিতে জামায়াতের দুই সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লা ও মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। আপিলের আরেক রায়ে জামায়াতের নায়েবে আমীর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এ রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি গত ৩১ ডিসেম্বর প্রকাশিত হয়। রায় রিভিউ চেয়ে রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষ ইতোমধ্যে আবেদন দাখিল করেছে। যা শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
ট্রাইব্যুনালে দেয়া মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে আনা জামায়াত নেতা মীর কাশেম আলীর আপিলের ওপর শুনানি চলছে। এটি আপিলের সপ্তম মামলা যা চূড়ান্ত নিস্পত্তির দিকে যাচ্ছে।
অপরদিকে সুপ্রিমকোর্ট সূত্র জানায়, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে আনা আরো ৮টি আপিল মামলা সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
আপিলে শুনানির অপেক্ষায় থাকা মামলার আসামিরা হলেন- জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলাম ও আব্দুস সুবহান, আওয়ামী লীগ থেকে বহিস্কৃত মোবারক হোসেন, জাতীয় পার্টির নেতা সাবেক প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সার ও সাবেক এমপি পলাতক ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জব্বার, চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাহিদুর রহমান, বাগেরহাটের শেখ সিরাজুল হক ওরফে সিরাজ মাস্টার ও খান আকরাম হোসেন।
গত ২ ফেব্রুয়ারি নেত্রকোণার দুই রাজাকার মো. ওবায়দুল হক তাহের ও আতাউর রহমান ননীকে মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দেয়া মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে তারা আপিল করার কথা বলেছেন। আইনানুযায়ী আসামিরা আপিল দায়েরে ৩০ দিনের সময় পাবেন।
বাসস।