দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক গ্রেফতার, উত্তপ্ত শিক্ষাঙ্গন

বেশ কয়েকদিন ধরেই উত্তপ্ত জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়। উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে। তাদের ডাকা ছাত্র ধর্মঘটে যোগ দিচ্ছে দেশের ৪০ টি বিশ্ববিদ্যালয়। এরই মাঝে রাষ্ট্রদ্রোহ ও অন্যান্য অভিযোগে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রভাষক এস এ আর গিলানীকে গ্রেফতার করেছে ভারতের পুলিশ।
 
ঘটনার সূত্রপাত গত ৯ ফেব্রুয়ারি। দিল্লিতে ভারতের পার্লামেন্ট ভবনে ২০০১ সালের হামলায়  অভিযুক্ত আফজাল গুরুর ফাঁসির দ্বিতীয় বার্ষিকীতে ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ-বিক্ষোভে সামিল হল একদল ছাত্র। স্লোগান ওঠে কাশ্মীরি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থনেও।
 
 ক্যাম্পাসে এ ধরনের কর্মসূচি নিয়ে আগেই অভিযোগ জানিয়েছিল অখিল ভারতী বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি)  এরপরই ওই কর্মসূচি বাতিল করে দেয় জেএনইউ কর্তৃপক্ষ।  তা সত্ত্বেও বিক্ষোভ দেখায় একদল ছাত্র। ঘটনায় তদন্তের নির্দেশ দেয় জেএনইউ কর্তৃপক্ষ।
 
রাজনৈতিক পারদ চড়তে থাকে। দেশবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে সরব হয় । অভিযোগ জানান বিজেপি সাংসদ মহেশ গিরি। দেশদ্রোহিতার মামলা করে দিল্লি পুলিশ। শুক্রবার ক্যাম্পাস থেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ছাত্র সংসদ সভাপতি কানহাইয়া কুমারকে নিয়ে যায় পুলিশ। পরে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।
 
রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে ক্যাম্পাসে ঢুকে তল্লাশি চালিয়ে গ্রেফতার করা হয় কানহাইয়াকে। ঘটনার প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহর সঙ্গে দেখা করবেন সিপিএম সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি, সিপিআই নেতা ডি রাজা ও জেডিইউ সাংসদ কে সি ত্যাগী।
 
ক্যাম্পাসে দেশ বিরোধী কার্যকলাপ সহ্য করা হবে না বলে হুশিয়ারি দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। ক্যাম্পাসে দেশ-বিরোধী বিক্ষোভের সমালোচনায় সরব বিরোধীরাও। 
অভিযোগ ওঠে কোনোরকম অনুমতি ছাড়াই বামপন্থী ও দলিত ছাত্র সংগঠনের উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের মধ্যে একটি সমাবেশে আফজল গুরুর ফাঁসির বিরোধিতা করা হয়। দেশবিরোধী স্লোগানও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। এর প্রেক্ষিতে বিজেপি সাংসদ মহেশ গিরির অভিযোগের ভিত্তিতে রাষ্ট্রদ্রোহ ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মামলা রুজু করে পুলিশ। এই ঘটনায় কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেয় কেন্দ্র।
 
কানহাইয়া-প্রশ্নে রবিবার ছুটির দিনেও জেএনইউ চত্বর ছিল সরগরম। পুলিশের বাড়াবাড়ি এবং কেন্দ্রের অসহিষ্ণুতার প্রতিবাদে সন্ধ্যায় একটি মিছিল বার করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া ও শিক্ষকরা। প্রায় হাজার দুয়েক বিক্ষোভকারী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ইতোমধ্যেই জেএনইউ-এর প্রতিবাদী শিক্ষকদের পাশে দাঁড়িয়ে বিবৃতি দিয়েছে ৪০টি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংগঠন। সব মিলিয়ে ক্রমশ জোর বাড়ছে প্রতিবাদীদের। তার মধ্যেই এ দিন দিল্লিতে সিপিএমের সদর দফতর এ কে গোপালন ভবনে এক দল দুষ্কৃতী হামলা চালিয়ে দলীয় সাইনবোর্ডে কালি লাগায় এবং ঢিল ও পাথর ছোড়ে।
 
সব মিলিয়ে জেএনইউ-এর ঘটনায় সঙ্ঘ পরিবার এবং কেন্দ্রীয় সরকারের অস্বস্তি বাড়ছে। এদিকে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী  রাজনাথ সিং অভিযোগ করেন ঘটনায় উস্কানি দিচ্ছে লস্কর-ই-তৈয়বার প্রতিষ্ঠাতা হাফিজ সাইদ। তিনিই যে এই ঘটনার পেছনে রয়েছে সেটি জাতিকে বুঝতে হবে এবং এই সত্যিটার জন্য সবাইকে সোচ্চার হতে হবে।
 
লস্কর-ই-তৈয়বার ইন্ধনেই জওহরলাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতবিরোধী স্লোগান দেয়া হয়েছে বলে রাজনাথ সিং দাবি করলেও দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের মতে, সত্যি-সত্যি কারা এই স্লোগান দিয়েছে, বামপন্থি নাকি বিজেপি-র ছাত্র সংগঠন এবিভিপি-র ছাত্ররা, তা নিয়ে তদন্ত করে দেখা দরকার। তদন্ত করার জন্য তিনি জেলা প্রশাসককে দায়িত্বও দিয়েছেন।
 
রাজনাথ সিং বলছেন, কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব এবং অখণ্ডতার জন্য কোনো কিছু হুমকি হিসাবে দেখা দিলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো মতভেদ থাকা উচিত নয়। এর মধ্যে রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতি খোঁজার চেষ্টা করা উচিত নয়। এক জোট হয়ে তার মোকাবিলা করা দরকার।
 
তবে নানা মহলের সমালোচনাতেও পিছু হটতে নারাজ বিজেপি। দলের মুখপাত্র শ্রীকান্ত শর্মা জানিয়েছেন, দেশ বিরোধিতার প্রশ্নে কাউকে রেয়াত করা হবে না। মুখে এ কথা বললেও বিরোধীরা যে ভাবে জোট বাঁধছেন, তাতে চিন্তায় সঙ্ঘ নেতৃত্ব।
 
সঙ্ঘ পরিবার তথা বিজেপির একাংশ মনে করেছে, বিষয়টি থেকে ফায়দা নিতে গিয়ে হিতে বিপরীত না হয়ে যায়। এমনিতেই গোটা ঘটনায় জেএনইউ-এর অন্দরে একঘরে হয়ে পড়েছে এবিভিপি। বিষয়টি আরও উচ্চগ্রামে নিয়ে গেলে জেএনইউ-তে  তাদের যেটুকু প্রভাব রয়েছে, তা-ও মুছে যেতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে বিজেপির অন্দরে।