শুক্র, শনি সাপ্তাহিক ছুটি এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একুশে ফেব্রুয়ারির সরকারি ছুটির দিন। ফলে মেলা যেন উপচে পড়েছে পাঠকের আনাগোনোয়। মেলা পরিসর বড় হওয়ায় আগের সেই দুর্বিষহ ভিড়ের যন্ত্রণা নেই। বরং লাখো মানুষের পদচারণায় ভরে উঠেছে বইমেলা প্রাঙ্গণ। দুয়ারে অমর একুশে। তাই অনেকের পোশাকে ছিল তারই ছাপ। শিশুদের গালে, কপালে, হাতে আল্পনা। তাতে আঁকা শহীদ মিনার। টিএসসি থেকে বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রবেশপথ পর্যন্ত ছিল মানুষের দীর্ঘলাইন। মেলা প্রাঙ্গণে ঢুকতেই বেগ পেতে হয়েছে অনেককে। স্টলগুলোতেও ছিল উপচে পড়া ভিড়। মেলার ১৯তম দিনে সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থীর সমাগম হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকাশক-বিক্রয় কর্মীরা।
সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় এদিন আগের দিনগুলোর মতোই বেলা ১১টায় খুলে দেয়া হয় মেলার প্রবেশদ্বার। তবে এর আগে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ভেসেছিল সুরের মায়াজালে। সকাল ১০টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে শিশু-কিশোর সংগীত প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এতে অতিথি বিশিষ্ট বরেণ্য সংগীতশিল্পী সুবীর নন্দী। বিচারক হিসাবে ছিলেন শিল্পী কল্যাণী ঘোষ, সুজিত মোস্তফা ও আবু বকর সিদ্দিক। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান।
প্রতিযোগিতায় ক-শাখায় প্রথম হয়েছেন তাহসিন রহমান, দ্বিতীয় হয়েছেন সুদীপ দত্ত অহন এবং তৃতীয় হয়েছেন ফাবিহা লামিছা তাহা। খ-শাখায় প্রথম হয়েছেন নিপা আক্তার মীম, দ্বিতীয় হয়েছেন অগ্নিতা শিকদার মুগ্ধ এবং তৃতীয় হয়েছেন নামিরা মুশকান (শান্তনা)।
যে দীপ জ্বেলেছিল দীপন
বইমেলায় মানুষের ঢল আর উত্সবমুখর পদচারণার ভিড়েও ছিল শোকের আবহ। টিএসসি থেকে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত কালো ব্যানার টাঙ্গানো হয়েছে। সেখানে জাগৃতি প্রকাশনের স্বত্বাধিকারী দীপনের উজ্জ্বল ছবির ওপর লেখা ছিল ‘যে দীপ জ্বেলেছিল দীপন’। কিছুদিন আগে উগ্রবাদীদের চাপাতির কোপে প্রাণ যায় দীপনের। সে শোকেই দীপনের ইন্টারমিডিয়েট পড়াকালীন ঢাকা কলেজের বন্ধুরা গঠন করেছে ‘দীপন স্মৃতি সংসদ’। তারাই অনেকগুলো ব্যানার টাঙিয়ে দেয় বইমেলা প্রাঙ্গণে। দীপনের স্ত্রী রাজিয়া রহমান জলি জানান, ১৯৯১ ব্যাচে ঢাকা কলেজে দীপনের সহপাঠীরা সম্প্রতি তার নামে ‘দীপন স্মৃতি সংসদ’ করেছেন। তারাই মেলায় এগুলো টাঙিয়েছেন। মেলাকেন্দ্রিক কোনো কর্মসূচি থাকছে কি-না সে বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এখনো নির্দিষ্ট হয়নি।’
বইমেলায় তথ্যমন্ত্রী
চলচ্চিত্র প্রকাশনা অধিদপ্তরের প্রকাশিত আনম আমিনুর রহমানের ‘বাংলাদেশের বন্য প্রাণী’ বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন তথ্য মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন চলচ্চিত্র প্রকাশনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক লিয়াকত আলী খান, বন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক খোরশেদ আলম, বঙ্গবন্ধু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মাহবুবার রহমান।
হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে আমাদের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করেই করতে হবে। বইটিতে জীববৈচিত্র্য রক্ষা করার নানা উপকরণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। পরিবেশ উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করতে এ বইটি সহায়ক ভূমিকা রাখবে।’
পিতা-পুত্রের বই
শুক্রবার মেলায় এসেছে কবি আমিনুর রহমান সুলতান ও তার পুত্র সিজন নাহিয়ানের দুটি বই। আশির দশকের অন্যতম কবি আমিনুর রহমান সুলতান। কবিতা তার নিত্যসঙ্গী হলেও প্রবন্ধ, কথাসাহিত্য, নাটক ও শিশুসাহিত্যেও আছে তার পদচারণা। এদিন ‘পুথিনিলয়’ থেকে প্রকাাশিত হয়েছে শিশু-কিশোর উপযোগী বই ‘বাড়ির নাম ৩২ নম্বর’। বইটিতে জানা যাবে, কীভাবে ৬৭৭ নম্বর বাড়িটি ৩২ বাড়িতে পরিণত হল। জানা যাবে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে এই বাড়ির অজানা অনেক স্মৃতিকথা। লিপি প্রকাশন এনেছে সিজন নাহিয়ানের তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘একাকিত্বের রঙ’।
বইপোকাদের মিলনমেলা
বিকেলে বইমেলার অদূরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শিখা চিরন্তন প্রাঙ্গণে ছিল বইপ্রেমী পাঁচ শতাধিক মানুষের মিলনমেলা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জনপ্রিয় গ্রুপ ‘বইপোকাদের আড্ডাখানা’ ও অনলাইন বুকশপ সর্বনাম ডট কমের যৌথ আয়োজনে মনোজ্ঞ এই আয়োজন। এতে বইপোকা গ্রুপের সারাদেশের সক্রিয় কর্মীরা বই ও সাহিত্য নির্ভর নানা আলোচনায় মেতে ওঠেন। আলোচনা ও আনন্দ আড্ডা শেষে বইপোকাদের আড্ডাখানা ও সর্বনাম ডট কমের মাসব্যাপী বুক রিভিউ প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার হিসেবে অটোগ্রাফসহ বই তুলে দেন কথাসাহিত্যিক পলাশ মাহবুব।
নতুন বই
বাংলা একাডেমির তথ্যমতে শুক্রবার মেলায় এসেছে ২৩৬টি বই। এর মধ্যে গল্প ৩৪, উপন্যাস ৪০, প্রবন্ধ ১০, কবিতা ৫৪, গবেষণা ৩, ছড়া ৫, শিশুতোষ ৯, জীবনী ৬, রচনাবলী ১, মুক্তিযুদ্ধ ৯, বিজ্ঞান ৭, ভ্রমণ ৪, ইতিহাস ৬, রাজনীতি ১, চিকিত্সা/স্বাস্থ্য ১, রম্য/ ধাঁধা ৫, ধর্মীয় ৪, অনুবাদ ৩, সায়েন্স ফিকশন ৩ ও অন্যান্য ৩১।
উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে প্রথমা থেকে আনিসুল হকের ‘জেনারেল ও নারীরা’, অনন্যা থেকে আল মাহমুদের ‘সাহসের সমাচার’, অবসর থেকে হাসান ইকবালের ‘ভাষা নারী ও পুরুষপুরাণ’, আগামী থেকে ড. চিত্তরঞ্জন দাসের ‘ভিক্টোরিয়া থেকে নায়াগ্রা : জানা-অজানার পথে পথে’, সুবর্ণ এনেছে আলী ইমামের ‘চিরকালের গল্প’, কাকলী এনেছে রকিব হাসানের ‘উইন্ডি উডের রহস্য’, ঐতিহ্য এনেছে ড. সুলতানা জেসমিনের ‘বাংলাদেশের শিক্ষানীতি ও নারী শিক্ষা’, কথাপ্রকাশ এনেছে সৈয়দ শামসুল হকের ‘চীনে আমরা পাঁচজন’, চন্দ্রদ্বীপ এনেছে আহসান হাবীবের ‘কমিক্স পটলা কেবলা’, শামীম পাবলিশার্স এনেছে সেলিনা হোসেনের ‘যখন বৃষ্টি নামে’, ‘মিহিরুনের বন্ধুরা’, ইতিপ্রকাশন এনেছে আনিসুল হকের ‘গল্পের জালি’, অনুপম প্রকাশনী এনেছে আব্দুল্লাহ আল মুতীর ‘রচনাসমগ্র : বিচিত্র বিজ্ঞান’, বিদ্যাপ্রকাশ এনেছে মফিদুল হকের ‘ভ্রমণ কথা সমাজ কথা’, অন্যপ্রকাশ এনেছে নাসরিন জাহানের ‘নিঃসঙ্গতার পাহারাদার’, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স এনেছে আসাদ চৌধুরীর ‘স্মৃতির শেকড় ও ডানা’, ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ এনেছে ‘ত্রিপুরার বাংলা কবিতা’, জোনাকী প্রকাশনী এনেছে রবীন্দ্র গোপের ‘মুজিব আমার অন্তরে বাহিরে’, চন্দ্রছাপ এনেছে আনোয়ারা সৈয়দ হকের ‘তোমাদের জন্য ছড়া’, নবরাগ প্রকাশনী এনেছে আসফউদ্দৌলা ‘দুদিনের দিনলিপি’, দোয়েল প্রকাশনী এনেছে আলমগীর খোরশেদের কবিতার বই ‘চন্দ্রমুখী’।
মূল মঞ্চের আয়োজন
বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘রাধারমণ দত্ত : মৃত্যু শতবার্ষিকী’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন শুভেন্দু ইমাম। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন মাহফুজুর রহমান, বিশ্বজিত্ রায় এবং নৃপেন্দ্রলাল দাশ। সভাপতিত্ব করেন কবি মোহাম্মদ সাদিক।
সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সিদ্দিকুর রহমান পারভেজের পরিচালনায় আবৃত্তি সংগঠন ‘মুক্তধারা সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র’ এবং হাসান আরিফের পরিচালনায় আবৃত্তি সংগঠন ‘শ্রুতিঘর-এর শিল্পীরা অংশ নেন। সংগীত পরিবেশন করেন কণ্ঠশিল্পী আকবর আলী সাঁই, দেলোয়ার হোসেন বয়াতি, অমিয় বাউল, পাগলা বাবলু খান, রুশিয়া খানম, রাফসান বাউল, বাউল মিলন, আমজাদ দেওয়ান, জামাল দেওয়ান, বিমল বাউল ও রকিবুল ইসলাম রাকিব।
শনিবার মূল মঞ্চের আয়োজন
শনিবার মেলা শুরু হবে সকাল ১১টায় এবং চলবে রাত ৮টা পর্যন্ত। বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘বাংলাদেশে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণ : সমস্যা ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন মফিদুল হক।