মনের কথা বলব কারে কে আছে সংসারে

কুষ্টিয়া যেন লালনের শহর। পথে নামলেই বাউলের দেখা মেলে। একেক বাউল একেকভাবে কথা শুরু করেন। তাঁদের ভাবভঙ্গিও অন্যরকম। গভীর কথাগুলো তাঁরা সহজভাবেই বলে যান। টুকরো টুকরো কথাগুলো সবসময় সাজিয়ে গুছিয়ে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় না। যখন যা পারা যায় লিখে নিতে হয় হাবিজাবি কাগজে। সেসব এলোমেলো কাগজের কথাগুলোই বাউলের ডায়েরি।

ফাগুনের খোলা পূর্ণিমায় ফকির লালন শিষ্যদের নিয়ে রাতভর মচ্ছব করতেন। সে ধারা মেনেই ফাগুনের দোলে আখড়ায় সাধুদের বাজার বসে। লালনকালে দুই দিনের আয়োজন তিন দিন থেকে এখন পাঁচ দিনে ঠেকেছে। দিনাজপুর থেকে লালনবাড়ি। সাড়ে তিন শ কিলোর ফাঁক। তাতে কী! সে আর আমি এক খানে রই, তবুও লক্ষ যোজন ফাঁকরে, আমি একদিনও না দেখিলাম তারে। স্বভাবে ভাব হলে উপায় কী? চলে গেলাম কুষ্টিয়ার বারামখানায়। ছেউড়িয়া ছুঁতে ছুঁতে দুপুর টলে পড়ল। ক্রমেই মানুষের আনাগোনা বাড়ছে। হরেক বাউলের হাট বসেছে এখানে। সবখানে খণ্ড খণ্ড মজমা চলছে। নানারূপী বাউল সাধু এবং তাঁদের কীর্তিকলাপ দেখে দেখে বিকেল গড়িয়ে গেলে লালনসমাধির পাশে এসে দাঁড়ালাম। দূরাগত সাধুরা আস্তানা পেতেছে এখানে। মুখপানে চেয়ে অনুমতি চাইবার আগেই বৃদ্ধ বাউল হাসিমুখে বললেন, বসেন না ক্যানো, বসেন। জুতো খুলে বস্তার পাটিতে ল্যাটা দিয়ে বসে পড়লাম। নাম ঠিকানা জানতে যা দেরি, কথা জমে গেল। বৃদ্ধ রুহ’লের ফকিরি নাম রুহ’ল শাহ্ ফকির। পেশায় হোমিও ডাক্তার। বয়স ষাটের ওপরে। জিজ্ঞাসা করলাম, এখানে আসেন কেন? হালকা প্রশ্নে তিনি তাচ্ছিল্য বোধ করলেন—এইবার শোনেন; যেখানে বসে আছেন, ইনির নাম হলেন বিশ্ব বাউল সম্রাট। সম্রাট বোঝেন? সম্রাট একটা কত বড় র্যাঙ্ক! বোঝেন? বিশ্ব বাউল বাতাসের সন্ধানকারী। দ্বিতীয় নাম্বার হলো, আপনারা বহু জ্ঞানীগুণী এখানে আছেন। ইনি কিন্তু নিরক্ষর ছিলেন, তাই বলে মুরুক্ষু নয়। আমার সাঁইজির কোনো অক্ষরজ্ঞান ছিল না। আল্লাহ আপনার দেহের ভিতের কোথায় আছে; তা ইনিরা স্তন্যে (স্তরে) স্তন্যে (স্তরে) ভাগ করে দেখায় দিয়ে গেছেন। এই জন্য এখানে এই লক্ক (লক্ষ) লক্ক মানুষের সমাবেশ হয়।

লালন প্রসঙ্গ থেকে দেহতত্ত্বের দিকে ফেরাতে পুনরায় জিজ্ঞাসা করলাম—দেহ সাধনা তো বাতাসের সাধনা, বুঝলাম; কিন্তু এরকম সাধনায় নারীদেহের যোগ কেন?  প্রশ্ন শোনামাত্র রুহুল ক্ষেপে গেলেন—আরে দুঃর্ রো, নারীর লগে তো কোনো কতাই নাই আপনার। আপনে তো আদম, আপনের লগে খেলা। আমার প্রয়োজনের জন্য নারী দিছে। নারী হলো নাথিং। উনি আমার প্রয়োজনে। আমাকে আল্লাহ নিজ সুরাতে বানাইছে। বলতে গেলে তিনি প্রায় ক্ষ্যাপাভাবেই লালনপদ বলতে লাগলেন—আপন সুরাতে আদম গঠলেন দয়াময়। পদ বলেই রুহুল প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন—আপনার নাম কী?

—আজাদুর রহমান

—আজাদুর রহমান সারাজাহান খুঁজলে আর পাবেন না। নাম পাবেন, কিন্তু আপনার চেহারা পাবেন না। এটা হলো চেহেরে খোদা। আল্লাহ নিজ সুরাতে আপনাকে বানাইছে। বোঝার সুবিধার জন্য রুহুল উদাহরণ টানলেন—যেমন আমার নাম রুহুল। রুহুল আর পৃথিবীতে নাই। নাম আছে, রুহুল নাই। এইডা, বডিটা হলো আদম। আল্লাহ নিজ তরফ থেকে রুহু ফুঁকারে দিয়েছেন। কোরানের মধ্যে দেখেন, আল্লামাল আদামা আসমাহা...। আয়াত শেষ করে তিনি ফের ব্যাখ্যায় নেমে আসলেন—আদম তৈরি করে আল্লাহ সকলকে সেজদা করতে বললেন। নিজ রুহু ফুঁকারে দেওয়ার পর ফেরেস্তাদের বললেন, সকলে সিজদা দাও।

শুনতে শুনতে জানতে চাইলাম—আল্লাহ নিজেই ঢুকেছেন?

—হ নিজেই ঢুকছেন। আল্লাহ বলেছেন, আমি মানুষের মাঝেই আছি। আল্লা হু কুল্লি...আমি গর্দানের শাহিরগের সন্নিকটেই আছি। কথা শুনে আমি নিজের গলার রগ দেখিয়ে বললাম, এখানে? রুহুল মুখে আনন্দ মেখে হৈ হৈ করে উঠলেন—হ্যাঁ, এর চেয়েও সন্নিকটে আছেন। আল্লাহ আরও বলছেন—আমি সাত জমিন সাত আসমানে আছি। সেই জন্য এই মানুষ নিয়েই লালনের যত কারবার, মানুষই সব। আল্লাহ আদমে নিজেই।

—তার মানে আল্লাহ তো ভিতরেই আছেন।

—হ্যাঁ, সেই আল্লাহকে চিনছেন? আল্লাহ ছাড়া কাউকে সেজদা করলে হারাম হয়ে যাবে। আল্লাহকে সেজদা করতে হবে।

আলোচনাটা একনাগাড়ে এগিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু পাশে বসা কাদের ফকির কথা কেড়ে নিলেন—ওই মানুষের ভিতর আল্লাহ বসবাস করে—যিনি কাম-ক্রোধ-রস আর পার্থিব ঝামেলা থেকে নিজকে সরাতে পেরেছেন।

কথায় কথা বেড়ে গেল। আমিও যোগ দিলাম তাঁর কথায়।

—কাম ক্রোধ সরাতে গেলে তো দম সাধনা করতে হয়, এ তো বড় কঠিন করণ?

—কঠিন করণ না হলে লক্ষ লক্ষ মানুষ কি এখানে আসত? কী সাধনা করতে হবে সেটা গুরুই কয়া দেবে।

প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলি, রুহুল ফকিরের দিকে মনোযোগ দিই।

—আপনি মারা গেলে কী হবে?

—মারা গেলে যদি আমার কোনো ভালো গুণাবলি থাকে তবে সাঁইজির মতো এরকম একটা মাজার হবে।

—মাজার হবে বুঝলাম, কিন্তু রুহুটা কই যাবে?

—আমার রুহুটা যাওয়ার জন্য তো থান-ই আছে—ওই যে ইল্লিন আর সিজ্জিল। পাপের কাজ করলে সিজ্জিল আর নেকিতে যাবে ইল্লিনে। সিজ্জিল মানে পাথর, জাহান্নামের পাথর আর ইল্লিন মানে হলো সুখস্বর্গ।

—মহাযোগ কী?

প্রশ্ন শুনে টিপ্পনি তুলে আব্দুল কাদের ফকির হেসে ওঠেন—হাঃ হাঃ একন বুজাও ডাক্তার।

রুহুল ফকির অগত্যা বোঝাতে শুরু করেন—মহাযোগ নিজের সাথে। হিসাব হবে আদমের সাথে। নারীকে তো আগেই নাথিং করে রেখেছে। ব্যাটাছেলের আবার মাসিক আছে নি?  মহাযোগ বলতে তুমি কী বুজাও। নিজের যোগ। বউয়ের লগে কোনো যোগ নাই। হাওয়ার লগে কিসের গল্প। হাওয়াকে তো সৃষ্টির কৌশলে তৈয়ারি করেছে আল্লাহ। এখন বলেন হাওয়ার কোনো কাঠামো তৈরি করেছে? এর কোনো নকশা আছে? নিজেই ব্যাখ্যায় নামেন—আদমের বডিতেই হাওয়ার উত্পত্তি। কথা হলো—আমি নারী, আমিই পুরুষ।

ব্যাখ্যা শুনে অবাক হলাম, পুরুষই নারী এ কেমন কথা!

রুহুল এবার পাল্টা জিজ্ঞাসা করেন—আমি নারী না হলে আমার বীজে মেয়ে হলো ক্যামনে! রুহুল ইশারায় ঘুমন্ত স্ত্রীকে দেখান—এই বুড়িরে আমার প্রয়োজনে আনছি। জমি আনছি আবাদ করার জন্য। মূলত আদমের মধ্যেই সব। এইডেই লালন সাঁইজি বলে গেছেন। দ্যাকেন লালনশাহের গানে মেয়েদের একটা কথাও লেখা নাই। সব পুরুষের কথা। এই পুরুষ মানে আদম, তারে নিয়েই তার খেলা। এরপর শব্দের দিকে ইশারা করেন—ওই যে দেখেন, ওখানে কথা হচ্ছে। একটা করে লোক উঠবে একটা করে গান হবে। হেইডা কথা। একটা ওয়ার্ড ভুল নাই। যদি ভুল থাকত তবে আমার মতো মানুষ এখানে আসত না। সন্ধ্যার দিকে ওই দিকে যাইতে পারবেন না। বহু লোক যন্ত্রপাতি, গাড়ি নিয়ে বসে থাকবে।

লম্বা অলোচনা থেকে মুখ ঘুরিয়ে এলোমেলো প্রশ্ন করি—আপনি কীভাবে হেদায়েত পেলেন? রুহুল গলা তুললেন—আল্লাহ বলেছেন, ও নবী, আপনি বলে দিন, হেদায়াতের মালিক আমি। আমি কীভাবে হেদায়েত পেলাম সেটা আমার আল্লাহকে বলে দেখেন গিয়ে। আমার বলার ক্ষমতা নাই। তিনি মালিক রব্বানা, তিনি জানেন। এ পর্যন্ত বলে চুপ হয়ে গেলেন। তারপর পুঁটলি থেকে কাপড় বের করলেন। সাদা ধপধপে কাপড়। কাপড়টা আমার মুখের সামনে তুলে বললেন, এইডা হলো খিলকা। ফকির হবার পর সাদা কাপড় নিয়েছি। এখন জানডা চলে গেলে এ দিয়েই কাফন পরা যাবে। কাফনের কাপড় যখন নিয়েছি সুতরাং রঙ্গ-রস আর নাই। আপনি তো এখনো রঙ্গ-রসের মধ্যেই আছেন। রঙ্গ-রস ছেড়ে সাদা কাপড় পরেন। তখন এত কথা আর বলতে হবে না। অটোমেটিক উত্তর পেয়ে যাবেন।

আচমকাই প্রশ্ন করলাম, সিদ্ধি খান?

—রুহুল চমকালেন না। সহজ গলায় উত্তর দিলেন—একবার যে সিদ্ধি খেয়েছি অর নেশাই তো কাটাই উঠতি পারছি না। বিয়ে করে যে কাজ করেছি; সেই রসের নেশাতেই তো শেষ। গুরু দয়া করে পথ না দেখালে আরো কত বছর যে সিদ্ধির নেশায় থাকতে হতো তার তো খবর কইতে পারি না। রুহুল ফকির একনাগাড়ে কথা বলতে বলতে এখন বেশ হাঁপিয়ে উঠেছেন। আমিও নাছোড়।

অনবরত হাবিজাবি প্রশ্ন শুনে অগত্যা কাদের ফকির গান ধরলেন—

বেদ বিধির পর শাস্ত্র কানা

আর এক কানা মন আমার

এসব দেখি কানার হাটবাজার

পণ্ডিত কানা অহঙ্কারে

গান শেষ করে কাদের ফকির উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন—ও ডাক্তার, স্পষ্ট বাংলায় বুঝিয়ে দাও নিজের মধ্যে আমিত্ব থাকলে সাধনা হবে না। নিজের ভিতরের কাম ক্রোধ রস দুনিয়াদারি বাদ দিতে না পারলে সাধু সেজো না, সাধু হও। যারা সিদ্ধির দেশের লোক তাদের জন্য সিদ্ধি।

রুহুল এবার কথা কেড়ে নিলেন—সিদ্ধি তো আমরা ব্যাক খাইয়েই আইছি। সেটা ওই নারীর লগে। যে খাইছি তাই তো ঝাড়ি উঠতি পারছি না। সেই সিদ্ধির অ্যাকশন তো এখন পর্যন্ত কাটি উঠতি পারিনি। যেই সিদ্ধি আমি খাইছি, আবার সিদ্ধি! ওই সিদ্ধি তো এখন আমার দ্বারা সম্ভব নয়। যে সিদ্ধি খায়নি সে বুজুকগে।

সিদ্ধি! ওই সিদ্ধি যারা খায়নি তারা কী করবে তাদের ব্যাপার। সেটা তারা জানে, আমি জানি না।

নারী, সেই সিদ্ধির ঝামেলা এখন পর্যন্ত শেষ করতে পারিনি।

দিগিবদিক কথার মধ্যে পড়ে খেই হারিয়ে ফেললাম—নারীপথে না গেলে কিংবা সিদ্ধি না খেলে কী হতো?

—ওই জায়গাতেই তো আল্লাহ প্যাঁচ লাগাইয়া রাখছে। নারী-পুরুষ তো আল্লাহ দিত না এবং এই কামও দিত না। এই কাম তো করে হুজুকে পড়ে। এসকেতে করে। এসকেতে পড়ে যেই মদ খাইছি, গাঁজা খাইছি। বাচ্চাকাচ্চা ফুটাইছি, ওদের মানুষ করাই তো এখন আসল বন্দেগি হয়া গেছে।

—এখন তাহলে কীভাবে এবাদত বন্দেগি করেন?

—ওর ভেতর থেকেই। বাইম মাছের মতো প্যাঁকে থেকে, প্যাঁক যেন গায়ে না লাগে।

কাদের কথা ধরে ফেলে কপট মজা করেন—ডাক্তার, সাধনকর্ম কও। না হলে বুজবে ক্যামনে। কাদের ফকির উত্তরের অপেক্ষা করেন না। উদাস গলায় গান ধরেন—

নাকের দুই ধারে দুই ফোঁড়া

ফকিরির গোঁড়া

ভব সাধন সাড়া

জানে রসিক যারা

মচ্ছবে ফকির ইছাহাক আলী একবার আধ্যাত্মিক গানের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আমাকে সরাসরি একটা প্রশ্ন করে বসলেন, আপনার নাম কী?

বললাম, আজাদুর রহমান।

নাম শুনে তিনি আমার শরীর হাতড়ে বেড়ালেন, এই আপনার মাথা, নাক, চোখ, গলা গুর্দা, নাড়িভুঁড়ি, হাত, পা...। তাহলে আজাদুর রহমান কোথায়? কে আপনি?

ব্যাখ্যা দেখে আমিও কোনো কিনারা পেলাম না। সত্যিই তো ‘আজাদুর রহমান’ বলে আলাদা কেউ নাই। তিনি আরও যোগ করলেন, দ্যাখেন, এক পার্টসের নামের উপর তো আরেক নাম বসবে না, একটা পার্টসের একটাই নাম। তাহলে আপনি কার?

আমি কোনো উত্তর খুঁজে পাই না দেখে তিনি ফের জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার স্ত্রী-পুত্র আছে?

বললাম, আছে।

এরা কার?

আমি বললাম, আমার। উত্তর শুনে ইসাহাক আলীর যেন হাসি পেল—এরা আপনের না, আপনি এদের। যতক্ষণ আপনের পকেটে পয়সা আছে ততক্ষণ এরা আপনের, ততক্ষণ আপনি ভালো। আপনের পয়সা নাই তো এরা আর আপনের না। শুধু কথায় কি চিঁড়ে ভেজে! দুধ কিংবা জল না দিলে। যখনি আপনি অর্থ নিয়োগ না করতে পারবেন তখনই আপনের এক পয়সার দামও থাকবে না। আপনের পাঁচ শ কোটি টাকা থাকতে পারে। ওটা আপনের। আমার জন্যে না। আমার জন্যে আপনে। আপনে আমার কি-না? এটাই আমার কাছে বড় পাওনা।

এক মনে কথা শুনতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেললাম—তাহলে এ আমার লোকগুলো কোথায় পাওয়া যাবে?

ইছাহাকের জবাব যেন প্রস্তুতই ছিল—আমি যদি আপনার হতে পারি, তাহলে অবশ্যই আপনিও আমার। হওয়াটাই বিষয়। ইছাহাক থামলেন না, নিজের লেখা পদ বলতে লাগলেন—

বামে বেহেস্ত, ডানে দোজখ

পোলসেরাত পায়ের কাছে

ভয়ের কোনো কারণ নাই।

শেষের দিনে হবে পানা

আহম্মদ নাম হয় তার

গান শেষ করে নিজ থেকে মুখপানে চেয়ে আর্জি করলেন, এখন কি আহম্মদ বা আহাদকে আপনে পাবেন! হঠাত্ প্রশ্নের আমি কী উত্তর দিতে পারি! তাছাড়া আমি মোটামুটি তাঁর মুখ থেকেই সকল কথা শুনতে চাই। মাঝে মধ্যে কেবল প্রশ্ন করে লাইনে দেবার চেষ্টা করি মাত্র। তিনিই শুরু করলেন—এই জন্য একজন মুর্শিদকে ধরতে হবে। ওলিয়াম মোর্শেদা। লালন পদ দিয়েছেন শোনেন—

যেহি মুর্শিদ সেই তো রাসুল

ইহাতে নেই কোনো ভুল খোদাও সে হয়।

লালন কয় না এমন কথা

কোরানে কয়।

আবারও ব্যাখ্যায় নামলেন—তার মানে কী? একজন মোমিন ব্যক্তি আরেকজন মমিন ব্যক্তিকে পাবে। আপনে নিজে মোমিন হলেই মোমিনের দেখা পাবেন। তুমি কোথাও ছিলে, কোথায় এসেছ; কোথায় যাবে, কী হবে তোমার? আপনে আপনেকে চিনেছেন? জীবনে মিথ্যে কথা বলতে পারিনি। এতে কী হয়েছে? আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি। আমার কেছোই না। আমিই আমার না। আমি কে?

ইছাহাক ফকির একটানা বলে গিয়ে  উদাস হয়ে গেলেন। আলুথালু মুখে উদ্ভ্রান্তের মতো কেবল সামনের দিকে চেয়ে থাকলেন। বললাম, শুনেছি কোকিলশাহ আপনার গুরু ছিলেন, তেনারে কেমন ভক্তি করতেন? ইছাহাক ফকির উত্তর করলেন না, কেবল সামান্য কেঁপে উঠলেন। ছলছল অসহায় দৃষ্টিতে তিনি কী যেন খুঁজলেন। চোখ দিয়ে আপনিতেই জল গড়িয়ে নামল। দৃশ্যটার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। আর কোনো প্রশ্ন করা ঠিক হবে না। নীরবতা মাথায় করে আমরা বসে থাকলাম।