উর্দু ভাষাকে আমরা সেদিন থেকেই ঘৃণা করতে শুরু করেছিলাম, যখন আমাদের উপর সেটা চাপিয়ে দেয়া হয়েছিলো। নইলে ২৫ বছরের পাকিস্তানী শাসনে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে উর্দু বহাল তবিয়তেই ছিল। সেই পঁচিশ বছরে আমাদের জাতীয় সঙ্গীত ছিল উর্দু, এ ছাড়া উর্দু সিনেমা উর্দু সঙ্গিত সাহিত্য সব কিছুই স্বতঃস্ফুরত ভাবেই বাংলার পাশাপাশি হাত ধরাধরি করেই চলেছিল।
১৯৪৭ সালের ২১ মার্চ সন্ধায় কার্জন হলের অডিটরিয়ামে বাংলা ভাষাভাষীদের সামনে ইংরেজিতে ভাষণ দিয়ে কায়েদে আজম জিন্না উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা বানাতে চেয়েছিলেন। গায়ে জোর বেশি মাথায় বুদ্ধি কম পাকিস্তানিরা যেটা চাপিয়ে দিয়ে হাসিল করতে চেয়েছিল সেটাই ভেজিটেরিয়ান ইন্ডিয়ানরা গত ৪০ বছরের চেষ্টায় আজ ব্যাপক সাফল্য লাভ করেছে হিন্দি ভাষা দিয়ে। ভাষা আসলে নিষ্পাপ জিনিস। কিন্তু সেই নিষ্পাপ ভাষাকে যখন সৈন্যসামন্ত আর বোমারু বিমানের মত ব্যবহার করা হয় অন্য সংস্কৃতিকে দখল করার জন্য তখন আর সেই ভাষা নিষ্পাপ থাকে না।
৪০ বছর আগে উর্দু যেমন আগ্রাসী ছিল এখন হিন্দি সেই একই আগ্রাসী ভুমিকায় নিয়োজিত। পার্থক্য শুধু আজ একজন ইন্ডিয়ান কায়েদে আজম জিন্না নেই যিনি ঘোষণা করবেন হিন্দিই হবে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ভাষা। সেটা করা ছাড়াই আজ আগ্রাসী হিন্দি দখল করে নিচ্ছে আমাদের মন মগজ আর ভবিষ্যৎ তারুণ্য। নেপাল ভুটান সিকিমের মত আমাদের ভাষা- সংস্কৃতি দখল হয়ে গেলে সৈন্য পাঠিয়ে দেশ দখল করার আর প্রয়োজন থাকে না। ঘরে বাহিরে হিন্দির আগ্রাসনে আমি আতংকিত। বিশ্বায়ন আর বাজার অর্থনীতি মানে এই নয় যে আমি তোমারটা মুঠো ভরে নেব আর আমারটা কাছা খুলে দেব।
আমাদের জানালা খোলা থাকবে ঠিকই কিন্তু আমাদের দরজায় থাকবে সশস্ত্র প্রহরী। এটাই আপসোস যে ভাষার জন্য যে জাতি জীবন দিয়েছে সেই জাতির একজন সদস্য হিসেবে আমি আবারও আমার ভাষা আমার কৃষ্টি নিয়ে সঙ্কা প্রকাশ করছি। হিন্দি সিনেমার নায়ক সঞ্জয় দত্তের অস্ত্র মামলার বিচারককে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল আপনি কি হিন্দি সিনেমা দেখেন? তিনি উত্তরে বলেছিলেন- 'না দেখি না, হিন্দি হচ্ছে ইতর শ্রেণীর লোকজনের ভাষা'।
আমি হিন্দি ভাষার বিরুদ্ধে নই, 'আমি আগ্রাসী হিন্দি ভাষার' বিরুদ্ধে, যেমন আমাদের পূর্ব পুরুষেরা 'আগ্রাসী উর্দুর' বিরুদ্ধে ছিলেন। আমাদের আরও একটা ভাষা আন্দোলনের প্রস্তুতি নেয়ার সময় এসে গেছে, হয়তো সেই ভাষা আন্দোলন থেকে আবারও এক স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা হবে। ইতিহাস চাকার মত, এটা কখন যে কোন দিকে ঘোরে!!