এবারের গ্রীষ্ম মৌসুমে চাহিদার ৩৩ শতাংশ গ্যাস পাবে না বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস না পাওয়ায় তেলভিত্তিক বিদ্যুত্ উত্পাদন বাড়াবে দেশের বিদ্যুত্ খাতে নেতৃত্বদানকারী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটি। এর ফলে বিদ্যুত্ উত্পাদন খরচও বাড়বে।
গত ১৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সভায় পিডিবির চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করতে অপারগতা প্রকাশ করে পেট্রোবাংলা। এবার সেচ ও গরমের মৌসুমে সর্বোচ্চ ৮ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে। এজন্য বিদ্যুেকন্দ্রগুলোর ধরন বিবেচনায় পিডিবি দৈনিক এক হাজার ২৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ চায়। তবে পেট্রোবাংলা বিদ্যুত্ উত্পাদনের জন্য দৈনিক সর্বোচ্চ ৯১৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দিতে পারবে বলে জানায়। তারা বলছে, গ্যাসের সার্বিক চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এবং চলতি সেচ মৌসুমে কৃষিকাজে গ্যাস সরবরাহের জন্য পিডিবি’র চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস দেয়া সম্ভব হবে না। পিডিবি বলছে, চাহিদার চেয়ে প্রায় সাড়ে ৩শ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ কম হলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্রগুলো সঙ্কটে পড়বে। অনেক কেন্দ্র বন্ধ করে দিতে হবে। বিদ্যুিভত্তিক সেচপাম্পগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ সরবরাহে সমস্যা হবে। পিডিবির এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, গরমকালে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট উত্পাদন ক্ষমতার গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্রগুলো বন্ধ রাখতে হবে। তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উত্পাদন বাড়িয়ে এ ঘাটতি সমন্বয় করা হবে। এতে বিদ্যুতের উত্পাদন খরচ বাড়বে।
দেশে জলবিদ্যুেকন্দ্রে উত্পাদিত প্রতি ইউনিট বিদ্যুত্ উত্পাদনে খরচ হয় ১২ থেকে ১৫ পয়সা। গ্যাসভিত্তিক প্রতি ইউনিট বিদ্যুত্ উত্পাদনে খরচ প্রায় ২ টাকা ৫০ পয়সা। আর তেলভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্রগুলোর মধ্যে কিছু কেন্দ্র প্রতি ইউনিট ৬ টাকার কমে এবং কিছু কেন্দ্র ১২ থেকে ১৫ টাকা খরচে বিদ্যুত্ উত্পাদন করছে। যে কেন্দ্রগুলো বিপিসিকে এড়িয়ে সরাসরি তেল আমদানি করে বিদ্যুত্ উত্পাদন করছে তাদের খরচ কম হচ্ছে। সব মিলিয়ে বিদ্যুত্ উত্পাদনের গড় খরচ পড়ছে ৫ টাকা ৮০ পয়সা। এই অবস্থায় তেলভিত্তিক বিদ্যুত্ উত্পাদন বাড়লে সার্বিকভাবে উত্পাদন খরচও বাড়বে। পিডিবির ঐ কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে পিডিবি প্রতি কিলোওয়াট/ঘণ্টা বিদ্যুত্ গড়ে ৪ টাকা ৯১ পয়সায় বিদ্যুত্ বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছে বিক্রি করছে। কিন্তু প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনে পিডিবির খরচ হয় ৫ টাকা ৯০ পয়সা। তেলভিত্তিক বিদ্যুত্ উত্পাদন বাড়ার কারণে এবং বিদ্যুতের সার্বিক উত্পাদন খরচ ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে ঘাটতি কমাতে ভোক্তা পর্যায়ে মূল্য বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে বিইআরসির কাছে এ সংক্রান্ত প্রস্তাবও দেয়া হয়েছে। পিডিবি বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছে বিক্রির জন্য বিদ্যুতের পাইকারি দাম ২৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। আর বিতরণ কোম্পানিগুলোর মধ্যে ডেসকো ৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ, ডিপিডিসি ৮ দশমিক ৮৬, পশ্চিমাঞ্চল বিদ্যুত্ বিতরণ কোম্পানি (ওজোপাডিকো) ১০ দশমিক ৭৬ এবং পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) ৭ দশমিক ০৮ শতাংশ দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে।
গত বছর সেপ্টেম্বরে ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে গড়ে ৬ টাকা ৩৩ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০১০ সালের মার্চ থেকে গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছয় দফায় বিদ্যুতের দাম প্রায় ৭০ শতাংশ (৩ টাকা ৭৬ পয়সা থেকে ৬ টাকা ৩৩ পয়সা) বেড়েছে। পিডিবি যেই খরচে বিদ্যুত্ উত্পাদন করছে গ্রাহকরা বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে তার চেয়ে বেশি দামে বিদ্যুত্ কিনছে।
পেট্রোবাংলা জানায়, সংস্থাটি বর্তমানে বিভিন্ন খাতের ৩ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করছে। এর মধ্যে ৪০ দশমিক ১৭ শতাংশ বিদ্যুত্ উত্পাদনে ব্যবহূত হয়। ক্যাপটিভ বিদ্যুতে ব্যবহার করা হয় আরো ১৭ শতাংশের বেশি গ্যাস। গত বছর গরমের মৌসুমে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্রগুলোর জন্য দৈনিক প্রায় ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করে পেট্রোবাংলার আওতাধীন কোম্পানিগুলো।
বাংলাদেশে ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত পাঁচ মাস মূলত কৃষিতে সেচ মৌসুম হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে কোনো বছর খরা দীর্ঘায়িত হলে মে মাস পর্যন্ত সেচ মৌসুম সম্প্রসারিত হয়। আর মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত গরমের মৌসুম হিসেবে বিবেচিত হয়। সেচ ও গরমের মৌসুমে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে। এই সময় প্রায় তিন লাখ বিদ্যুত্চালিত সেচপাম্প চলে। ফলে ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বিদ্যুতের চাহিদা আরো বৃদ্ধি পায়। বিদ্যুেকন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ কমায় সেচে বিদ্যুত্ সরবরাহে বিঘ্ন হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন পিডিবির কর্মকর্তারা।
তবে গত ১৪ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সভায় বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগের মতো সেচে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ সরবরাহ করা হবে। এজন্য প্রয়োজনে সার কারখানা বন্ধ এবং সিএনজি স্টেশনগুলোতে রেশনিং করা হবে। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে পেট্রোবাংলাকে তিনি নির্দেশ দেন।