সংকট কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বিজিবি

আজ ২৫ ফেব্রুয়ারি ভয়াবহ বিডিআর (তত্কালীন) বিদ্রোহের সাত বছর পূর্ণ হলো। ২০০৯ সালের এই দিনে তখনকার বাংলাদেশ রাইফেলস- বিডিআরের (বর্তমানে বিজিবি- বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) বিপথগামী সদস্যরা বিদ্রোহ করে। এ সময় তারা ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করে। বিজিবি’র সদর দফতর পিলখানায় সেদিন বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যরা যে তাণ্ডব চালিয়েছিল, তা পৃথিবীর কোনো বাহিনীর বিদ্রোহের ইতিহাসে পাওয়া যায় না। বিদ্রোহীদের হাতে বিডিআর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদও নিহত হন। বিদ্রোহীদের হাত থেকে রেহাই পায়নি মহাপরিচালকের স্ত্রী, বাসার কাজের মেয়ে ও বেড়াতে আসা আত্মীয়রাও।
 
সিপাহী সেলিম রেজা, কাজল আলী, আবদুল বাছেত, শামীম আল মামুন জুয়েল ও ল্যান্স নায়েক ইকরামসহ ঘাতকদের হিংস  তাণ্ডবে সেনা সদস্যরা ছাড়াও চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ বিডিআর সদস্যের হাজার হাজার পরিবার। নির্মম এ হত্যাকাণ্ডে ১৫২ জনকে মৃত্য্যুদণ্ড, ১৬০ জনকে যাবজ্জীবন ও বিভিন্ন মেয়াদে ২৫৬ জনকে সাজা দেয়া হয়।
 
বিদ্রোহীদের বিচার, সংশ্লিষ্টদের সাহায্য-সহযোগিতার পরও স্বজনহারাদের কান্না থামেনি আজও। ১৫২ জনকে ফাঁসির রায় দেয়া হলেও সেটি এখনো কার্যকর হয়নি। ডেথ রেফারেন্সের শুনানি এখনো চলছে হাইকোর্টে। এছাড়া অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনে মামলাগুলো এখনো চলছে বিশেষ আদালতে। এ অবস্থায় নিহতদের স্বজনরা দ্রুত রায় কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন। তবে কলংকিত সেই ইতিহাস ও ক্ষত ভুলে ঘুরে দাঁড়ানোর নিরন্তর প্রচেষ্টা সবার মাঝেই আজ বিদ্যমান।
 
বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ বলেন, ‘বিভীষিকাময় ওই ঘটনার পরে বর্তমানে বাহিনীতে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এসেছে। বিজিবি এখন জনগণের আস্থার পর্যায়ে রয়েছে। কারণ দেশের যে কোনো প্রয়োজনে বা বিভিন্ন গোলযোগে আস্থাশীল বাহিনী হিসেবে বিজিবিকে ডাকা হয়। আমি মনে করি বিজিবি এখন অনেক দূর এগিয়ে গেছে।’
 
তিনি বলেন, বাহিনীতে রিফর্ম হয়েছে, সে অনুসারে কাজ করা হচ্ছে। আমরা যারা পরিচালনার দায়িত্বে আছি তারা সুশৃঙ্খলভাবে বাহিনীকে পরিচালনা করে যাচ্ছি। ২০০৯ সালে যে জঘন্য হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল, তার যেন আর পূনরাবৃত্তি না ঘটে সেদিকটি মাথায় রেখেই বিজিবি পরিচালিত হচ্ছে। বিজিবি এখন সুশৃঙ্খল একটি বাহিনী। বিজিবির প্রতিটি স্তরেই কঠোর শৃঙ্খলা ও মনিটরিং বজায় রাখা হচ্ছে।
 
বিজিবি প্রধান আজিজ আহমেদ আরো বলেন, ‘পিলখানা হত্যাকাণ্ডের মামলা অনেক বড়। তাই একটু সময় লাগছে পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে। তারপরও খুব দ্রুততার সঙ্গে মামলা শেষ করার কাজ চলছে।’ তিনি বলেন, ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ১৫২ জনের ডেথ রেফারেন্সের শুনানির জন্য হাইকোর্টে বিশেষ বেঞ্চ গঠন করা হয়েছে। সপ্তাহের পাঁচ দিনই বেঞ্চ বসছেন। প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়েছে। আনুষঙ্গিক অন্য কাজ চলছে। সব মিলে নিয়মের মধ্যে থেকে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া শেষ করার চেষ্টা চলছে। আমি মামলার বাদী হিসেবে সন্তুষ্ট এবং আশাবাদী।
 
বিজিবি জানিয়েছে, বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় অভিযুক্তসহ ১৭ হাজার ৩১১ (বিডিআর সদস্য ও বেসামরিক ব্যক্তি) জনকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। তাদের মধ্যে ৬ হাজার ৪১ জনকে বিশেষ আদালত ও ১১ হাজার ২৬৫ জনকে অধিনায়ক সামারি কোর্টের মাধ্যমে বিচার করা হয়। আসামিদের মধ্যে ৯ হাজার ১৯ জনকে বিভিন্ন সাজাসহ চাকরিচ্যুত করা হয়। বাকি ৮২৮৭ জন সরাসরি বিদ্রোহে সম্পৃক্ত না থাকায় তাদের লঘু দণ্ড (তীব্র ভর্ত্সনা, বেতন কর্তন, ডিমোশন ইত্যাদি) দিয়ে চাকরিতে বহাল রাখা হয়েছে। আর হত্যা মামলায় অভিযুক্ত ৮৫০ জনের মধ্যে ১৫২ জনকে ফাঁসি, ২৬০ জনকে যাবজীবন ও ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়। এছাড়া ২০ জন আসামি পলাতক রয়েছে। পলাতক আসামিদের ব্যাপারে গোয়েন্দা সংস্থা ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এর মধ্যে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ডিএডি রহিম কারাগারে মারা গেছেন।
 
সূত্র জানায়, বর্তমানে বিশেষ বেসামরিক আদালতে বিস্ফোরক মামলা চলমান রয়েছে। এ মামলায় আসামি সংখ্যা ৮৩৪ জন। ২০০৯ সাল পর্যন্ত বিজিবির জনবল ছিল ৪৪ হাজার। ২০১০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজার। গঠন করা হয়েছে ৪টি রিজিওনাল হেডকোয়ার্টার্স ও ৪টি সেক্টর হেডকোয়ার্টার্স। বিজিবি পরিচালিত স্কুল, কলেজে সেকশন বৃদ্ধির মাধ্যমে অনেক শিক্ষার্থী ভর্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখন বিজিবির যে কোন সদস্য সুপারিশ করলেই তাদের সন্তানকে এসব স্কুলে ভর্তি করা হচ্ছে।
 
আদালতের পর্যবেক্ষণে ২৫ ভাগ ঝুঁকি ভাতা দেয়ার কথা বলা হয়েছিল। সেখানে ৩০ ভাগ ঝুঁকি ভাতা (সীমান্ত ভাতা) দেয়া হচ্ছে। শতভাগ রেশন সুবিধাও দেয়া হচ্ছে। আগে বিজিবি সদস্যদের সন্তানদের ২২ বছর পর্যন্ত রেশন সুবিধা দেয়া হতো। এখন যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ বছরে। এছাড়া প্রতিবন্ধী সন্তানদের চাকরির মেয়াদের পুরো সময় রেশন সুবিধা দেয়া হচ্ছে।
 
বিজিবির কর্মসূচি
 
বিজিবি সদর দফতরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মোহসিন রেজা জানান, পিলখানায় সংঘটিত বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডে শহীদদের স্মরণে শাহাদাত বার্ষিকী পালিত হবে। দিনের কর্মসূচি অনুযায়ী শহীদদের রুহের মাগফিরাতের উদ্দেশ্যে পিলখানাসহ বিজিবির সকল রিজিয়ন, সেক্টর, প্রতিষ্ঠান ও ইউনিটের ব্যবস্থাপনায় বাদ ফজর খতমে কোরআন এবং বিজিবির সকল মসজিদ এবং বিওপি পর্যায়ে শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। সেনাবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় আজ সকাল ৯টায় বনানী সামরিক কবরস্থানে শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধি, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তিন বাহিনীর প্রধানগণ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এবং বিজিবি মহাপরিচালক।
 

এছাড়া শুক্রবার বাদ আসর বিকেল পৌনে ৫টায় পিলখানাস্থ বীর উত্তম ফজলুর রহমান খন্দকার মিলনায়তনে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। উক্ত দোয়া ও মিলাদ মাহফিলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, বিজিবি মহাপরিচালক, শহীদ ব্যক্তিবর্গের নিকটাত্মীয়গণ, পিলখানায় কর্মরত সকল অফিসার, জেসিও, অন্যান্য পদবির সৈনিক এবং বেসামরিক কর্মচারীরা অংশগ্রহণ করবেন।