দেশে অপরাধের নতুন মাত্রা হিসেবে দেখা দিয়েছে শিশু হত্যা ও নির্যাতন । অপরাধীরা প্রতিশোধ নেয়ার সহজ উপায় হিসেবে শিশুদের টার্গেট করছে। গত চার বছরে দেশে এক হাজারেরও বেশি শিশুকে হত্যা করা হয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতেই হত্যা করা হয়েছে ২৯ শিশুকে। সর্বশেষ গত সোমবার রাজধানীর বনশ্রীতে দুই ভাই-বোন নুসরাত আমান (১২) ও আলভী আমানকে (৬) হত্যা করা হয়।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশু হত্যা ও অপহরণ অন্য অপরাধের চেয়ে সহজ। দুর্বৃত্তরা ব্যক্তির উপর ক্ষোভ চরিতার্থ করছে তাদের সন্তান বা নিকটাত্মীয় দুর্বল শিশুদের হত্যা ও নির্যাতনের মাধ্যমে। পারিবারিক কলহ, সামাজিক দ্বন্দ্ব কিংবা ব্যবসায়িক টানাপোড়েন- সবক্ষেত্রেই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে শিশুদের প্রতি সহিংস আচরণ বেড়েছে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতেই গত শনিবার কুমিল্লা শহরের রসুলপুরে সত্ ভাইয়ের হাতে খুন হয় শিশু মেহেদী হাসান জয় (৮) ও মেজবাউল হক মনি (৬)। এর পরদিনই লাকসামে আরেক শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয় ডোবা থেকে। হবিগঞ্জে চার শিশুকে মেরে বালুচাপা দেয়ার ঘটনার ক্ষত এখনও দেশবাসী ভুলেনি। গত ফেব্রুয়ারিতে কেরানীগঞ্জে শিশু আব্দুল্লাহকে অপহরণের পর হত্যার ঘটনা ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি করে। শিশু অধিকার ফোরামের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে দেশে অন্তত ১ হাজার ৯২ জন শিশু হত্যার শিকার হয়েছে।
অপরাধ ও সমাজ বিজ্ঞানীরা বলছেন, সমাজে সবচেয়ে দুর্বল গোষ্ঠী হলো শিশুরা। মানুষের সবচেয়ে ভালোবাসার ও কোমল অনুভূতির জায়গায়ও থাকে শিশুরা। তাদেরকে সহজেই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে কামনা চরিতার্থ করতে পারে অপরাধীরা। তাই পারিবারিক ঝগড়া, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, ব্যক্তিগত স্বার্থ আদায় ও লোভ-লালসা চরিতার্থ করার জন্য প্রতিপক্ষের উপর প্রতিশোধ নিতে শিশুদের অপহরণ, নির্যাতন ও হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
শিশু হত্যার ঘটনায় গত সোমবার সংসদে ক্ষোভ ও ধিক্কার জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। তিনি বলেন, দেশে শিশুহত্যার প্রবণতা বেড়ে গেছে। মানুষের মধ্যে এত জিঘাংসা কেন? যারা শিশু হত্যা করে, তারা সমাজের সবচেয়ে ঘৃণ্য জীব। এর চেয়ে জঘন্য, নোংরামি কাজ আর কী হতে পারে? তিনি বলেন, যারা শিশুহত্যায় জড়িত, আদালত তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেবেন বলে আশা করি। প্রত্যেককেই নিজ নিজ এলাকায় দৃষ্টি দিতে হবে। সচেতনতা বাড়াতে হবে। হত্যাকারীদের ধরিয়ে দেয়ার আহ্বানও জানান তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নেহাল করিম বলেন, মানুষ ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য হত্যা করে। বয়স্কদের হত্যা করতে অনেক সময়, প্রস্তুতি ও অর্থের দরকার হয়। তাই প্রতিশোধ নিতে শিশুদেরকে সহজ টার্গেট হিসেবে পায় দুর্বৃত্তরা। অর্থ ও সময় বাঁচিয়ে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে শিশুদেরকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তিনি বলেন, দেশে আইন আছে কিন্তু প্রয়োগ নেই। শিশু হত্যা ও নির্যাতন বন্ধে সরকারকে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে। একইসাথে সমাজকল্যাণ অধিদপ্তর ও বেসরকারি সংগঠনগুলোকে সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে কাজ করতে হবে।
গত ৫ জানুয়ারি এক দিনেই দেশে ছয় শিশুকে হত্যা করা হয়। ওই দিন গাজীপুরের টঙ্গীতে চোর সন্দেহে মোজাম্মেল হককে (১৩) পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ঢাকায় রানা নামের এক শিশুকে বিষ খাইয়ে হত্যা করেন তার সত্বাবা। চট্টগ্রামে ছুরিকাঘাতে নিহত হয় আজিম হোসেন। সিলেট ও যশোরে অপহরণের পর সালমান ও লিমা হত্যার শিকার হয়। ২০১৪ সালে অপহরণের পর ৫২টি শিশুকে হত্যা করা হয়। এর আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ১৯।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিশু নির্যাতন বন্ধে ২০১৩ সালে শিশু অধিকার আইন করা হলেও এখনো বিধি করা হয়নি। আইনের প্রয়োগ নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সমাজ কল্যাণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা কার্যকর ভূমিকা পালন করে না। তাই শিশু হত্যা মহামারিতে পরিণত হচ্ছে। শিশু হত্যার বিরুদ্ধে জন সচেতনতা ও বিচারের জন্য জোরালো জনদাবি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে। যেমন গত বছর সিলেটে শিশু শেখ সামিউল আলম রাজন ও খুলনায় মোহাম্মদ রাকিব হত্যার বিরুদ্ধে মানুষ প্রতিবাদী হয়ে রাস্তায় নামার পর দোষীরা দ্রুত সাজা পায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বলেন, সমাজের প্রচলিত রীতিনীতি, আচার-আচরণ, আইন-কানুন এবং মূল্যবোধের অবক্ষয় মহামারি আকারে ধারণ করেছে। শিশু হত্যা তারই প্রতিফলন। পারিবারিক ও ব্যবসায়িক সমস্যাগুলোর সামাজিক সমাধান করতে মানুষ ব্যর্থ হচ্ছে। তাই প্রতিশোধ পরায়ণ দুর্বৃত্তরা শিশু নির্যাতনকে বেছে নিয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আজিজুর রহমান বলেন, আমাদের পারিবারিক ও আত্মীয়তার বন্ধন শিথিল হয়ে গেছে। শহর কিংবা গ্রাম, সব জায়গাতেই ব্যক্তিক সম্পর্কে সহমর্মিতা ও সত্যিকারের শুভ কামনা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। তাই শিশু হত্যাও বাড়ছে। অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া যাচ্ছে না বলে পরিস্থিতি আরো ভয়ংকর হয়ে উঠছে। তিনি বলেন, যে সমাজে মা তার সন্তানকে হত্যা করতে দ্বিধাবোধ করে না, বাবা তার সন্তানকে হত্যা করে, ভাই ভাইকে হত্যা করে, সে সমাজ কোন সুস্থ, সভ্য ও ভদ্র সমাজ হতে পারে না। বড়দের লোভ ও ক্ষোভের শিকার হচ্ছে শিশুরা।