অন্য যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচনে বেশি সংঘাত-সংঘর্ষের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। তারা বলেছেন, যেসব এলাকায় বিএনপির কোনো প্রার্থী নেই এবং আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী রয়েছে, সেসব এলাকায় ব্যাপক আকারে সহিংসতা ঘটতে পারে। নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসার ও প্রিজাইডিং অফিসারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আবার নির্বাচন নিয়ে সরকারের বিরোধী পক্ষ সাবোটাজ করতে পারে। জবাবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, ‘ভোট কেন্দ্র দখল, জালভোট ও কারচুপি কর্মকাণ্ড বরদাশত করা হবে না। এ ধরনের কিছু ঘটলে শেষ বুলেট থাকা পর্যন্ত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তা প্রতিরোধ করবে’।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে নির্বাচন কমিশন (ইসি) আয়োজিত বৈঠকে এসব বক্তব্য তুলে ধরেন সংশ্লিষ্টরা। বৃহস্পতিবার শেরেবাংলা নগরের এনইসি মিলনায়তনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ, বিজিবি, র্যাব, আনসার-ভিডিপি, কোস্টগার্ড, সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা, বিভাগ ও জেলা পর্যায়ের প্রশাসন এবং নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নিয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
সিইসি বৈঠকে উপস্থিত সংশ্লিষ্টদের ‘গুলি ব্যবহারের’ ক্ষমতার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, শেষ বুলেট থাকা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সবাইকে ব্যালট রক্ষায় চেষ্টা চালাতে হবে। কেন্দ্র দখল ও ভোট কারচুপি রোধে অপরাধীদের বিরুদ্ধে বুলেট ব্যবহার করতে হবে।
বৈঠক শেষে সিইসি সাংবাদিকদের বলেন, যারা কেন্দ্র দখল করে ভোটের আগের রাতে কারচুপি করে, দিনে জালভোট দেয়-তারা কোনো দলের পক্ষে নয়, অর্থের বিনিময় তারা সন্ত্রাসী কার্যকলাপে অংশ নেয়। তাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সবাইকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অস্ত্রধারী সদস্যরা সন্ত্রাসীদের প্রাথমিক প্রতিরোধ করবে। এরপরে মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স তাদের দায়িত্ব পালন করবে।
বৈঠকে সিইসি ভোটের আগের রাতে বা ভোটের দিনের নিরাপত্তা নিয়ে জোর দিলেও ভোটের পরিবেশ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের কোনো নির্দেশনা দেননি। নির্বাচনী সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপও তুলে ধরা হয়নি। সভায় একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে আশঙ্কা করা হয়, অন্য যেকোনো নির্বাচনের চেয়ে এই নির্বাচনে অপ্রীতিকর অবস্থা বেশি ঘটতে পারে। পরিস্থিতি সৃষ্টি করে সরকারের ওপর চাপাতে ২০ দল তত্পর থাকবে বলেও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অভিমত দিয়েছে। বৈঠকে রিটার্নিং অফিসার ও প্রিজাইডিং অফিসারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নেতারা গ্রেপ্তারে পুলিশকে প্রভাবিত করছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
শুরুতে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী রয়েছে। তাদের নিজেদের মধ্যে মারামারি বেধে যেতে পারে। এটা নির্বাচনে আরেকটি মাত্রা তৈরি হবে। একই আশঙ্কা প্রকাশ করে অন্য সরকারি শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থার উচ্চ পদস্থ এক কর্মকর্তা বলেন, বেশ কয়েকটি ইউনিয়নে বিএনপির প্রার্থী নেই। যেগুলোতে আওয়ামী লীগের একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী আছে ওইসব এলাকায় আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা নিজেরা সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
অপর গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধি বলেন, এই নির্বাচন দলীয় পর্যায়ে হওয়ার কারণে পাড়ায় পাড়ায় পারস্পরিক দ্বন্দ্ব দলীয় পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। অন্যান্য নির্বাচনের তুলনায় এই নির্বাচনে অপ্রীতিকর ঘটনা বেশি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। নির্বাচনী কর্মকর্তাদের ওপর হামলা হতে পারে। এজন্য তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা জোরদার করা দরকার। ২০ দলীয় জোট পরিস্থিতি সরকারের ওপর চাপাতে পারে। প্রভাবশালী নেতাদের এলাকায় একই দল থেকে একাধিক প্রার্থী থাকায় গ্রুপিং তৈরি হতে পারে বলেও মত দেন তিনি। এছাড়া পার্বত্য এলাকায় নিরাপত্তা সমস্যা আছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
বৈঠক সূত্র জানায়, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য আরও বাড়ানোর পক্ষে মত দেন নির্বাচনী কর্মকর্তারা। পুলিশ বলছে, পুরো নির্বাচনের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ সদস্য নেই। তাই নির্বাচনকে পুনর্বিন্যস্ত করার দাবি তোলেন তারা। বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি হুমায়ূন কবীর বলেন, আমার ৬ জেলায় ৩৫০টি ইউপিতে নির্বাচন। প্রথম ধাপে ২৮০টিতে নির্বাচন। ফোর্স আছে আড়াই হাজারের মতো। কিন্তু নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে ওই পরিমাণ পুলিশ সদস্য আমার রেঞ্জে নেই। তবু ইসির প্রতি সম্মান দেখিয়ে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করব। পুলিশ স্বল্পতার একই বক্তব্য দেন পুলিশ হেডকোয়ার্টারের ডিআইজিও। এ ছাড়া অনেক পুলিশ সুপারই এ ব্যপারে আপত্তি তোলেন।
বিজিবির পক্ষ থেকে বলা হয়, সব বিজিবি যদি নির্বাচনের কাজে ব্যবহার করা হয়, তাহলে সীমান্ত এলাকা অরক্ষিত হয়ে যেতে পারে। এদিকে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও প্রিজাইডিং অফিসারদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন পুলিশ কর্মকর্তারা।
বরিশাল বিভাগের এক পুলিশ সুপার বলেন, অনেক সময় দেখা যায় রিটার্নিং অফিসাররা স্বজনপ্রীতি দেখান। আর প্রিসাইডিং অফিসাররা খুব সহজে ম্যানেজ হয়ে যান। দেখা গেল, বাইরে পুলিশ নিরাপত্তা দিচ্ছে। ভেতরে প্রিসাইডিং অফিসার অনৈতিক কাজ করছে। এ ক্ষেত্রে এক জায়গার প্রিসাইডিং অফিসারকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া উচিত। ওই এসপি আরও বলেন, আওয়ামী লীগের উচ্চ পর্যায়ের নেতারা বিভিন্ন লোক গ্রেপ্তার করার জন্য আমাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে থাকেন।
এদিকে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক পুলিশের দিকে অভিযোগের তীর ছোড়েন। তিনি বলেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের ক্ষেত্রে পুলিশ সুপাররা নিজেদের মধ্যে ক্ষমতাটা রেখে দেন। এর মধ্যে জেলা প্রশাসককে সম্পৃক্ত করতে চায় না। এটা ভেবে দেখা উচিত।
নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. জাবেদ আলী বলেন, একদল বলে আমরা বিমাতাসুলভ আচরণ করছি। অন্য দল বলে আমরা সরকারের পকেটে ঢুকে গেছি। দুটোই যেন মিথ্যা হয়, আপনাদের সেই অনুযায়ী কাজ করা উচিত। নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবু হাফিজ বলেন, আমরা যে সর্বাঙ্গীণভাবে ভালো করতে পারছি, সেটা বলা যাবে না। দু-একজন এমন কাজ করেছে, যার জন্য নির্বাচন কমিশন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এটা যাতে আর না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
সভায় সমাপনী বক্তব্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দিন আহমেদ তার বক্তব্যে অপ্রীতিকর পরিস্থিতির জন্য পুলিশকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, দু-একটি জায়গায় গণ্ডগোল হওয়ার কারণে, পুরো নির্বাচনে সফল হতে পারি না আমরা। এ সবকিছুর দায়িত্ব ওসিদের নিতে হবে। দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। কেন্দ্র দখল করতে দেয়া যাবে না। গুলি থাকা অবস্থায় যাতে কোনো কেন্দ্র দখল করতে না পারে কেউ। সর্বশেষ বুলেটটি ব্যবহার করে হলেও কেন্দ্র বাঁচাতে হবে।
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থী হওয়ার ঘটনাকে স্বাভাবিক বলে মনে করেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে দেখতে হবে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ায় কোনো বাধা সৃষ্টি হয়েছে কি না। যদি মনোনয়নপত্র জমা দেয়ায় বাধা সৃষ্টি না হয়, তাহলে একজন কি দশজন প্রার্থী হলো, সেটা প্রশ্নবিদ্ধ হয় না।
সিইসি বলেন, এমনিতেই আমরা অনেক খবর পাই। কিন্তু নির্দিষ্টভাবে খবর না পেলে ব্যবস্থা নেয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব হয় না।
সিইসির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক, মো. শাহ নেওয়াজ, ইসি সচিবালয়ের সচিব মো. সিরাজুল ইসলামসহ ইসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।