মোহাম্মদপুর সিটি হাসপাতালের ৫০৪ নম্বর কেবিনে শুয়ে ছোট ভাই জায়ান বিন নেওয়াজের খোঁজ করছে জারিফ বিন নেওয়াজ। বলছে, ‘জায়ানকে নিয়ে আসো আপু। এখানকার বড় (হাসপাতালের) ফ্লোরটা পরিষ্কার। ও খেলতে পারবে এখানে।’ ১১ বছর বয়সী জারিফ জানে না যে ১৪ মাস বয়সী ওর আদরের ছোট্ট ফুটফুটে ভাইটি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে। বড় ভাই শালিন বিন নেওয়াজ ও বাবা শাহনেওয়াজের মৃত্যু কথাও সে জানে না। সে এটাও জানে না যে একই হাসপাতালের আইসিইউতে দগ্ধ শরীরে যন্ত্রণায় ছটফট করছেন মা সুমাইয়া খানম। এদিকে দগ্ধ মা সুমাইয়ার (৩৫) অবস্থা ভালো না বলে জানিয়েছে তার পরিবার।
বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে মারা যাওয়া শাহনেওয়াজের ভাই কামরুল আহসান বলেন, সুমাইয়ার অবস্থা ভালো নয়। যেকোনো সময় যেকোনো কিছু হয়ে যেতে পারে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের চিকিৎসকেরা যা বলেছেন, এই হাসপাতালের চিকিৎসকেরাও একই কথা বলেছেন। কেউ ৯০ শতাংশ দগ্ধ হলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কম থাকে। সুমাইয়ার সন্তান জারিফ বিন নেওয়াজ এই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
কামরুল আহসান বলেন, শিশুটি সুস্থ হওয়ার পথে। দুই পায়ে আঘাত আছে। চিকিৎসা চলছে। তাকে যত দূর সম্ভব আদর দিয়ে হাসিখুশি রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। পরিবারের সবাই তাকে সময় দিচ্ছে। বাবা, ভাইয়ের মৃত্যুর খবর শিশুটিকে জানানো হয়নি।
তবে সময় যত যাচ্ছে, উত্তরার ফ্ল্যাটে এক সপ্তাহ আগে আগুন লাগার ঘটনা ধীরে ধীরে জারিফের স্মৃতিপটে ভেসে উঠতে শুরু করেছে। এমনটাই জানিয়েছেন জারিফের চাচাতো বোন মিথিলা জামান। বড় চাচা মনিরুজ্জামানের মেয়ে মিথিলাই এখন সিটি হাসপাতালে জারিফের একমাত্র সঙ্গী।
মিথিলা বলেন, আগুন লাগার আগের দিনগুলোতে জারিফ আর জায়ানই ওদের বাড়ি মাতিয়ে রাখত। তাই ছোট ভাই জায়ানের খোঁজ করছে জারিফ। সে জন্য ওর পাশে সব সময় আমি থাকার চেষ্টা করি। মোবাইল সেট দিয়ে গেম খেলতে দেওয়া হচ্ছে, যেন মনটা একটু অন্যদিকে থাকে। কিন্তু এর পরও আগুনের ঘটনা বলতে থাকে জারিফ।
শরীরের ৬ ভাগ পুড়েছে জারিফের। শিশুটির ডান পায়ের হাঁটুর নিচ থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত ব্যান্ডেজ করা। বাঁ পায়ের নিচের অংশেও ব্যান্ডেজ করা। তবে ডান পায়ের নিচে পুড়ে যাওয়ায় অস্ত্রোপচার করা হবে। প্রাণ বাঁচলেও হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা জারিফ মাঝে মাঝে কেঁদে ওঠে। কখনো মায়ের কাছে যেতে চায়, আবার বড় ভাই শালিনের কথাও জিজ্ঞেস করে। তবে বেশি জানতে চায়, ছোট ভাই জায়ানের কথা।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের ৮ নম্বর বাড়ির সাততলার একটি ফ্ল্যাটে মার্কিন দূতাবাসের প্রকৌশলী শাহনেওয়াজ সপরিবারে দগ্ধ হন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে আনার পরপরই মারা যায় তার ছেলে শালিন বিন নেওয়াজ (১৫) ও ১৪ মাসের শিশু জায়ান বিন নেওয়াজ। এক দিন পর মারা যান শাহনেওয়াজ (৫০)। শরীরের ৯০ ভাগ পোড়া নিয়ে এখন সিটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শাহনেওয়াজের স্ত্রী সুমাইয়া।