চোখটা এখন থাকে সবার মুস্তাফিজের দিকে। গতির ঝড় তুলে নজর কেড়ে নিচ্ছেন তাসকিন আহমেদও। মাশরাফি বিন মুর্তজা প্রথম ওভারেই ব্রেক থ্রু দিয়ে আলো কাড়ছেন। কিন্তু এর মধ্যেই বাংলাদেশি পেস বোলার চতুষ্টয়ের অন্যতম সদস্য একের পর এক উইকেট তুলে নিচ্ছেন। আল আমিন হোসেন ফাইনালের আগ পর্যন্ত মূল টুর্নামেন্টে ১০ উইকেট নিয়ে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী হয়েছেন। আল আমিন নিজে বলছেন, এটা তার এবং দলের আত্মবিশ্বাসের ফল। সব অর্জনকেই দলের অর্জন হিসেবে দেখতে চাওয়া ডেথ ওভার বিশেষজ্ঞ বোলারের সাক্ষাত্কার নিয়েছেন দেবব্রত মুখোপাধ্যায়—
এখন পর্যন্ত মূল এশিয়া কাপের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি। ভাবতে কেমন লাগে?
আমার ভালো লাগছে যে, আমরা বাংলাদেশ পুরো দল হিসেবেই খুব ভালো খেলছি। একটা টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলছি আমরা। পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার মতো দুটো দলকে হারিয়েছি, এটাই বেশি ভালো লাগছে। আমার সেখানে সামান্য অবদান আছে, এটা নিশ্চয়ই ভালো লাগছে।
তারপরও, এতগুলো উইকেট পাওয়াটা তো নিশ্চয়ই আলাদা একটা কৃতিত্বের ব্যাপার।
আসলে দেখেন, পেস বোলিংয়ে সবাই কিন্তু ভালো করছে। মাশরাফি ভাই বলেন, তাসকিন, মুস্তাফিজ; সবাই ভালো করছে। হ্যাঁ, এর মধ্যে আল্লাহর রহমতে আমি কিছু বেশি উইকেট পেয়েছি। দলের যখন প্রয়োজন হয়েছে, তখন উইকেট পেয়েছি; সেটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমার সত্যিই ভালো লাগছে যে, দল খুব ভালো ফলের মধ্যে আছে।
বছর দেড়েক আগেও কী দেশের মাটিতে এইরকম তিন-চার পেসার একসাথে খেলার কথা কল্পনা করতে পারতেন?
তখন তো আসলে আমরা স্পিনে একটু বেশি ভরসা করতাম। উইকেটও তুলনামূলক একটু স্পিন সহায়ক হতো। তাই পেসারদের জন্য তেমন কিছু থাকতো না। এখন সবাই পেস বোলারদের কথা ভাবে, তাদের কথা ভেবে উইকেট বানানো হয়। তাই আমরা অনেকে খেলতে পারছি।
উইকেট ভালো হচ্ছে বলে পেসাররা ভালো করছেন? নাকি পেসাররা ভালো করছেন বলে উইকেট পেস সহায়ক করা হচ্ছে?
আসলে দিনশেষে পেসারদের ভালো বল করাটা বেশি ভূমিকা রেখেছে নিশ্চয়ই। কারণ, উইকেট যেমনই বানান না কেনো, ফাস্ট বোলাররা যদি সেখানে ভালো বল করতে না পারে, তাহলে কিন্তু এই আস্থাটা থাকতো না। এখন দেখেন, আমাদের ফাস্ট বোলার যে যখন দলে খেলছে, সেই ভালো করছে।
আমাদের পেস ইউনিটটা ঠিক কোথায় বাকিদের চেয়ে আলাদা?
আমাদের পেস বোলিং ইউনিটটা খুব বৈচিত্র্যময়। কেউ ধরেন খুব জোরে বল করছে, কেউ অনেক বেশি সুইং করাচ্ছেন, কেউ আবার জায়গায় বল ফেলা এবং টাইট বোলিং করছে। আবার মুস্তাফিজ তো আছেই। ওর নিজেরই অনেক ভেরিয়েশন; কাটার, স্লোয়ার। সবমিলিয়ে এত ভেরিয়েশন খুব বেশি দলের পেস অ্যাটাকে থাকে না।
কী করে এমন উত্থান হলো পেসারদের? ব্যাপারটা তো অনেকটা হঠাত্ ঘটলো।
অন্যতম অবদান হলো মাশরাফি ভাইয়ের। উনি পেস বোলার বলে শুধু পেসারদের সাপোর্ট দেয়, এরকম না। পুরো দলকে আসলে মাশরাফি ভাই একটা ছায়ার তলে রাখে। একটা কথা বলি, এই যে আমরা এখন ফাইনাল খেলছি...। প্রথম ম্যাচ হেরে যাওয়ার পর মাশরাফি ভাই ড্রেসিংরুমে এসে বললো, ‘আমরা কিন্তু ফাইনাল খেলবো। কীভাবে খেলবো জানি না। তোরা ভেঙে পড়বি না, বিশ্বাস রাখিস। আমরা ফাইনাল খেলবো।’ একজন ক্যাপ্টেন যখন সামনে এসে এরকম বলে, আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে যায়। উনি জানে, কীভাবে পারফরম্যান্স বের করে আনতে হয়।
বিশ্বকাপের আগে থেকে শুরু করে একটার পর একটা খারাপ সময়ের মুখোমুখি হয়েছেন। সব ভুলতে পেরেছেন?
আমি বিশ্বাস করি, মানুষের জীবনে উত্থান-পতন দুটোই আছে। আপনি উত্থানের সময়টা নিয়ে, সফলতার সময়টা নিয়ে ভেবেও জীবন কাটাতে পারবেন না। আবার পতনের খারাপ সময়টায় পড়ে থাকলেও চলবে না। আমার মনে হয়, জীবনের পথ হলো, আঁকা বাঁকা। একটা নতুন বাঁকে এসে পুরোনো বাঁক নিয়ে বেশি ভাবলে পথ চলা কঠিন হয়ে যায়। আমি সামনে তাকাতে হবে। আমি সবসময় নিজেকে বলি, সামনে নিশ্চয়ই ভালো কিছু অপেক্ষা করছে আমার জন্য।
বাংলাদেশ যখন সিরিজ জিতছে, আপনি দলের বাইরে। খারাপ লাগেনি?
হ্যাঁ, খারাপ লেগেছে। বাংলাদেশ দল ভালো খেলছে, আমি দলে নেই। কিন্তু ওই যে, নিজেকে বলেছি যে, পরিশ্রম করলে, সততার সাথে থাকলে তার ফল মানুষ পাবেই। তাই শান্ত থেকেছি।
বিপিএল কী আত্মবিশ্বাস ফেরাতে একটা বড় ভূমিকা রেখেছে?
শুধু আমার না। সবার জন্যই কাজে লেগেছে। আমরা তো টি-টোয়েন্টি কম খেলি। অনুশীলন করে সব শেখা যায় না। টাফ সিচুয়েশনে কীভাবে খেলতে হয়, সবাই মাঠে বসে শিখেছে।
শর্টার ফরম্যাটে আপনাকে সবসময় ডেথ ওভারের বিশেষজ্ঞ মনে করা হয়। শেষ ওভারগুলোর সময় এই প্রত্যাশার কারণে কী একটু চাপ টের পান?
আমার এটা ভালো লাগে। আমার ওপর একটা কাজ দেয়া হয় এবং সবার বিশ্বাস যে, আমি ওই কাজটা পারবো। এটা আমার অনেক ভালো লাগে। মানুষের এই বিশ্বাস তো বড় একটা পাওয়া। আমার নিজেরও এই বিশ্বাসের কারণে মনে হয়, আমি পারবো।
নতুন বল, নাকি পুরোনো বল; কোনটা বেশি পছন্দ করেন?
আমি বাংলাদেশ দলে খেলতেই সবচেয়ে বেশি উপভোগ করি। নতুন বল, পুরোনো বল; বিচার করি না। যে একবার দলে খেলেছে এবং তারপর কখনো ছিল না, সেই বুঝতে পারবে, দলে থাকার মজাটা। আমি সৌভাগ্যবান মনে করি নিজেকে, বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে খেলতে পারছি। তারপর দায়িত্বটা যাই আসুক, আমি করতে তৈরি।
শেষের দিকে ভালো বোলিংয়ের গোপন সূত্রটা কী?
টেকনিক্যালি তো আপনি অনেক কিছুই ভাবতে পারেন। ইয়র্ক করাতে হবে, গুড লেন্থে বল ফেলতে হবে। পরিকল্পনা থাকে। পুরাতন বলে আলাদা পরিকল্পনা থাকে। তবে আসল ব্যাপার হলো বিশ্বাস আর এক্সিকিউশন। আমি একটা ব্যাপার বুঝি, আমার ওপর যে বিশ্বাস রাখা হয়, সেটাই মূল ব্যাপার। ইয়র্কার মারতে চাইলে আপনার শতভাগই মারতে হবে; ভুল করলে চলবে না। এগুলো সঠিকভাবে করা সম্ভব কেবল আত্মবিশ্বাস থেকে। যেহেতু দল মনে করি, আমি ডেথ ওভারে ভালো; তাই আমিও ভালো করতে পারি বলে মনে হয়।