হুইল চেয়ারে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন

খুব ছোটকাল থেকে পা জোড়া অবশ। হুইল চেয়ার ছাড়া জগতটাই চলৎশক্তিহীন তার। তাতে কি, তপস্যা তার ক্রিকেটার হয়ে বিশ্বের দরবারে দেশকে চেনানোর। আপাতত চাইছেন, প্রতিবন্ধী ক্রিকেট অনুরাগীদের নিয়ে জাতীয়ভাবে দল গঠন করতে। তবে চূড়ান্ত লক্ষ্য, ক্রিকেট মঞ্চে চার-ছক্কা হাঁকিয়ে এ দেশের পতাকা উড়াবেন। তারপর জয়ের আনন্দে কাঁদতে কাঁদতে গলায় পরবেন পদক আর হাতে উঁচিয়ে ধরবেন ট্রফি।
 
এই স্বপ্নদ্রষ্টার নাম মো. মহসীন। নিজেকে তিনি এ দেশের প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দলের অধিনায়ক দাবি করেন। সম্প্রতি এসেছিলেন ইত্তেফাক কার্যালয়ে। তার সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত জানাচ্ছেন আহমেদ মনসুর-
 
বল-ব্যাট আর চার-ছক্কার হাতছানিতে প্রায় প্রতিদিনই ঘুম ভাঙে মহসীনের। সেই হাতছানি উপেক্ষা করার সামর্থ্য নেই ডানহাতি ব্যাটসম্যানের। তাই সকালের আধো ঘুমের অলস আরাম এক পাশে সরিয়ে ছুট লাগান মাঠে। এ জন্য ভালো-খারাপ কত কথাই শোনতে হয় তাকে। কখনো বাবা-মার, কখনো আত্মীয়-স্বজন-প্রতিবেশীদের, কখনো আবার সম-অসম বয়সী সহ-ক্রিকেটারদের। কিন্তু ২৮ বছর বয়সী মহসীন কিছুতেই নিরস্ত হন না। স্বপ্ন দেখেন, বিশ্বমঞ্চে প্রতিবন্ধী ক্রিকেটের শক্তিধরদের হারিয়ে কাঁদছেন, আনন্দের কান্না।
 
তার ভাষায়, ‘আমি নিজেকে কখনো অক্ষম ভাবি না। শারীরিক প্রতিবন্ধীতা কখনো আমাকে থামাতে পারবে না। ক্রিকেট আমার ধ্যান-জ্ঞান। যখন আমার হুইল চেয়ার ছিলো না তখন মাটিতে বসে ক্রিকেট খেলতাম। আমার স্বপ্ন, এ দেশে ‘প্রকৃত’ প্রতিবন্ধীদের নিয়ে ক্রিকেট দল গঠন করা এবং একে জনপ্রিয় করে তোলা। আমি প্রমাণ করতে চাই, প্রতিবন্ধীরাও বল-ব্যাট নিয়ে লড়াই করে দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনতে পারে।’
 
অভাব-অনটন যার নিত্য সঙ্গী, তার এমন স্বপ্ন দেখাই হয়ত বাতুলতা। কিন্তু মহসীন তার লক্ষ্যে অবিচল। বিশ্বাস করেন, প্রতিবন্ধীদের জাতীয় প্লাটফর্মে ‘প্রকৃত’ প্রতিবন্ধীরা জায়গা করে নেবেন, বিশ্বের দরবারে দেশের নাম উজ্জ্বল করবেন।
 
IMG0
 
মহসীনের ভাষায়, ‘যার কোনো একটা হাতের একটা আঙুল নাই, সে কিছুতেই প্রতিবন্ধী হতে পারে না। যার একটা চোখ অপর চোখের তুলনায় খানিকটা ছোট, সেও কোনোভাবে প্রতিবন্ধী নয়। অথচ প্রতিযোগিতামূলক টুর্নামেন্টে এমন সব সক্ষম মানুষদেরই সুযোগ দেয়া হয়। আমরা এমন এক প্লাটফর্ম চাই, যেখানে তারাই খেলবেন যারা সত্যিকার অর্থেই প্রতিবন্ধী। তাদের কেউ একজনের হয়ত একটা হাত থাকবে না, কারো থাকবে না কোনো একটা পা, মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর সামর্থ্যও হয়ত থাকবে না অন্য একজনের। কিন্তু সবারই থাকবে বুকভরা বিশ্বাস, আর সবাইকে হারিয়ে বিশ্বজয়ের।’
 
নিতান্ত এক গরিব ঘরে বেড়ে উঠা মহসীনের। অসচেতনতা, আর্থিক দুরবস্থা ও বিরূপ সামাজিক বাস্তবতার কারণে লেখাপড়া বেশিদূর এগোয়নি তার। দু’বেলা দু’মুঠো খেয়ে বাঁচার জন্য এক সময় ছোট একটা দোকান খুলেন। কিন্তু ক্রিকেটের পেছনে ছুটতে গিয়ে সেই দোকানও লাটে উঠেছে।
 
স্বপ্ন যার বিশ্বমঞ্চ কাঁপানোর, দিন-রাত তার দোকানে পড়ে থাকলেও হয়ত চলে না।
 
IMG1
 
কত কাজ মহসীনের। একটা জাতীয় প্লাটফর্ম, উদ্যমী একদল ক্রিকেটার, কোচ, পরামর্শক, মাঠ, আরও কত কি। আর এতোসব কাজ তার জন্য কত না কঠিন। কিন্তু যিনি দমে দমে ক্রিকেট রাখেন, তার তো ‘কঠিনেরে ভালোবাসা’ ছাড়া উপায়ও নেই।
 
ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, ইংল্যান্ডের মতো ‘ফিজিক্যালি ডিজেবলড ক্রিকেট টিম’ গঠনের জন্য কত চেষ্টা করেছেন মহসীন। ‘সেন্টার ফর দ্যা রিহ্যাবিলিটেশন অব দ্যা প্যারালাইজড’ বা সিআরপি’র সহযোগিতায় দল দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন, একই রকম চেষ্টা করেছেন বাংলাদেশ প্যারা অলিম্পিকের কোচ মাকসুদুর রহমানের পরামর্শ ও তদারকিতেও। দলও গঠিত হয়েছে।  তবে সেই দলে জায়গা হয়নি 'প্রকৃত' প্রতিবন্ধীদের! এমনকি, মহসীন নিজেও বাদ পড়েছেন দল থেকে!
 
তবু ক্ষান্ত হননি মহসীন। 'প্রকৃত' প্রতিবন্ধীদের নিয়ে দল গঠনের আশায় এখনো নানা চেষ্টা করে যাচ্ছেন। ক্রিকেটের সাথে জড়িত হর্তাকর্তা ছাড়াও বিভিন্ন দাতা সংস্থা, সরকারি-বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ বা যোগাযোগের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।
 
IMG2
 
এতো বঞ্চনার ভিড়ে কোনো প্রাপ্তি নেই, এমন প্রশ্নের জবাবে মহসীন বললেন, না, প্রাপ্তিও আছে। আমার নেতৃত্বে ২০১৪ সালে মার্চে ভারতে অনুষ্ঠিত তাজমহল ট্রফি জিতে বাংলাদেশ শারীরিক প্রতিবন্ধী দল। তিন ম্যাচ সিরিজে ২-১ ব্যবধানে জয়লাভ করে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করি আমরা। এর সূত্র ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে পুরস্কারও পেয়েছি। এসব তো অনেক বড় অর্জন।
 
মহসীন জানান, এমন অর্জনের পরও শেষ পর্যন্ত হয়ত তার চেষ্টায় দল গঠন না-ও হতে পারে, অধরাই রয়ে যেতে পারে তার মাশরাফি হওয়ার স্বপ্নও। কিন্তু তারপরও নিঃচেষ্ট হতে নারাজ তিনি। কারণ তিনি জানেন, তিনি পারলে তা শুধু তার নয়, গোটা দেশের জন্য হবে একটা বিরাট জয়।
 
ডানার সক্ষমতায় আকাশ সমান উচ্চতা খুঁজে নিতে পারে শঙ্খচিল, সদিচ্ছা আর চেষ্টার জোরে কেন স্বপ্ন সমান ক্রিকেটার হতে পারবেন না মহসীন?
 
IMG3