কারাগারে নিজামীর ছেলে ও আইনজীবীরা

 
যুদ্ধাপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর সঙ্গে দেখা করতে কাশিমপুর কারাগারে গেছেন তার ছেলে ও আইনজীবীরা। বুধবার দুপুর ১টার দিকে কাশিমপুর কারাগার পার্ট-২ এর কারা ফটকে আসেন নিজামীর ছেলে ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান এবং মশিউল আলমসহ কয়েকজন আইনজীবী। পরে তারা কারাগারের ভেতরে ঢোকেন।
 
আপিল বিভাগের ফাঁসির রায় পুনর্বিবেচনার জন্য রিভিউ আবেদনের বিষয়ে নিজামীর নির্দেশনা নেবেন তারা। 
 
কাশিমপুর কারাগার পার্ট-২ এর জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বণিক বলেন, 'দুপুর সোয়া ১টার দিকে নিজামীর ছেলে ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান ও তার আইনজীবী মশিউল আলমসহ আরো কয়েকজন তার সঙ্গে দেখা করতে আবেদন জানান। আমরা সে আবেদন মঞ্জুর করলে দেড়টায় কারাগারের ভেতরে ঢুকেছেন তারা।' 
 
সকালে মৃত্যু পরোয়ানা শোনার সময়ই নিজামী কারা কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন, তিনি আপিল মামলার চূড়ান্ত পূর্ণাঙ্গ রায়ের রিভিউ চেয়ে আবেদন করবেন। 
 
সকাল ৯টার দিকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে লাল কাপড়ে মোড়ানো নিজামীর মৃত্যু পরোয়ানা ও পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি এসে পৌঁছায়। পরে সকাল ১০টা ৫ মিনিটে কনডেম সেলে গিয়ে তাকে পরোয়ানা ও রায় পড়ে শোনান কাশিমপুর কারাগার পার্ট-২ এর জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বণিক ও জেলার নাসিরউদ্দিন। 
 
মঙ্গলবার যুদ্ধাপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামীর আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহাসহ আপিল বিভাগের চার বিচারপতির স্বাক্ষরের পর এ রায় প্রকাশ করা হয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন দাখিল করতে হলে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে নিজামীকে তা করতে হবে। তিনি যদি তা না করেন ওই ১৫ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর সরকার ফাঁসির জন্য যে তারিখ নির্ধারণ করবে জেল কর্তৃপক্ষকে সেদিনই তা কার্যকর করতে হবে। আর নিজামী যদি রিভিউ করেন তাহলে তার ফাঁসির বিষয়টি নির্ভর করবে আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়ের পর। এর আগে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ নিজামীকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছিল
 
এদিকে পূর্ণাঙ্গ রায় গতকাল সন্ধ্যায় সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার কার্যালয় থেকে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠিয়ে দেয়া হয়। আপিল বিভাগের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার অরুণাভ চক্রবর্তী রায়ের অনুলিপি নিয়ে যান। ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার শহীদুল আলম ঝিনুক তা গ্রহণ করেন। রায়ের অনুলিপি ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের সামনে উপস্থাপন করা হয়। এরপরই বিচারকরা মৃত্যুপরোয়ানা জারি করেন। পরে বিশেষ বার্তা বাহকের মাধ্যমে তা কারা কর্তৃপক্ষ, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেয়া হয়।
 
রায় প্রকাশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, এখন আসামি পক্ষ রিভিউ পিটিশন দায়েরের জন্য ১৫ দিন সময় পাবেন। আজ থেকে এই সময় গণনা শুরু হবে। এ সময়ের মধ্যে রিভিউ পিটিশন দায়ের না করলে নিজামীর দণ্ড কার্যকরে আইনগত কোনো বাধা থাকবে না। তবে রিভিউ পিটিশন দায়ের করা হলে দণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থগিত হয়ে যাবে।
 
নিজামীর প্রধান আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, রায় পর্যালোচনা করে অবশ্যই রিভিউ পিটিশন দায়ের করা হবে। যেসব অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে আশা করি রিভিউতে সেসব অভিযোগ থেকে তিনি খালাস পাবেন।
 
১৯৭১ সালে বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনাকারী ও উস্কানিদাতাসহ মানবতাবিরোধী তিনটি অপরাধের দায়ে দোষী জামায়াতের আমীর মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসির রায় বহাল রাখে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে নিজামীর করা আপিল আংশিক মঞ্জুর করে গত ৬ জানুয়ারি এ রায় ঘোষণা করা হয়। রায় ঘোষণার প্রায় আড়াই মাস পর পূর্ণাঙ্গ এ রায় প্রকাশ পেল।
 
প্রকাশিত রায়টি ১৫৩ পৃষ্ঠার। রায়টি লিখেছেন আপিল বিভাগের বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা। রায়ে একমত পোষণ করে তাতে স্বাক্ষর করেছেন প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। পরে রায়টি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েব সাইটে প্রকাশ করা হয়।
 
যে তিন অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড বহাল
দুই নম্বর অভিযোগে (একাত্তরের ১০ মে পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার বাউশগাড়ি গ্রামের প্রায় ৪৫০ জনকে পাকিস্তানি সেনারা হত্যা এবং ধর্ষণ করে প্রায় ৩০-৪০ জন নারীকে), ছয় নম্বর অভিযোগে (একাত্তরের ২৭ নভেম্বর ধুলাউড়া গ্রামে ৩০ জনকে হত্যায় নেতৃত্ব ও সম্পৃক্ততা) এবং ১৬ নম্বর অভিযোগে (১৯৭১ সালে নিজামী আল বদর বাহিনীর প্রধান ছিলেন। বুদ্ধিজীবীদের হত্যায় আল বদর সদস্যদের সহযোগিতা, অনুমোদন, নৈতিক সমর্থন ও তার কর্মের বিষয়ে নিজামী সম্পূর্ণরূপে সচেতন ছিলেন) নিজামীর মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে আপিল বিভাগ।