প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন নতুন রোগের চিকিত্সা এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চিকিত্সকদের আরো গবেষণার তাগিদ দিয়ে বলেছেন, জনগণের দোরগোড়ায় উন্নত চিকিত্সাসেবা পৌঁছে দেয়া আমাদের মৌলিক দায়িত্ব। সব পর্যায়ের মানুষের কাছে উন্নত চিকিত্সাসেবা পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। আর এ জন্য সিলেটে একটি মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে এবং জনসংখ্যা বিবেচনায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রতি জেলায় একটি করে মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া জেলা-উপজেলার হাসপাতালে চক্ষু বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে চিকিত্সাসেবা দেয়ার ব্যবস্থা থাকবে। আর চিকিত্সা শাস্ত্রে গবেষণা আরো বাড়াতে ঢাকার পর চট্টগ্রাম, রাজশাহী এবং সিলেটে পূর্ণাঙ্গ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে।
গতকাল বুধবার সকালে খামারবাড়িস্থ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বাংলাদেশ চক্ষু চিকিত্সক সমিতির ৪৩তম বার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন।
চট্টগ্রাম এবং রাজশাহীতে পূর্ণাঙ্গ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অনেকেই মনে করেন চট্টগ্রাম এবং রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজই বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হবে। কিন্তু আমরা তা করছি না এবং করবোও না। বিশ্ববিদ্যালয় দুটি সম্পূর্ণ পৃথক ও পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠান হবে। যেখানে শিক্ষার্থীরা স্নাতকোত্তর শিক্ষা লাভ করবে ও গবেষণার সুযোগ পাবে। স্নাতকোত্তর পর্যায়ের নিচের শিক্ষার্থীরা মেডিক্যাল কলেজে পড়াশোনা করতে পারবে।’
তিনি বলেন, বিভিন্ন বিভাগ এবং জেলা পর্যায়ের মেডিক্যাল কলেজগুলো এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হবে। এক্ষেত্রে উদাহরণ তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ যেমন বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত, একইভাবে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ এবং রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজও যথাক্রমে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হবে।
চোখের চিকিত্সকদের প্রতি দেশের মানুষের উন্নত ভবিষ্যত্ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা যারা চক্ষু চিকিত্সক, চক্ষু বিশেষজ্ঞ আছেন, বাংলাদেশ যেন সব সময় আলোকিত ভবিষ্যত্ পায় সে লক্ষ্যে কাজ করবেন। চক্ষু চিকিত্সার যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয়ার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, আমাদের দেশের মানুষ যেন মানসস্মত চিকিত্সা পায়, সেদিকে লক্ষ্য রেখেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’ উন্নত চক্ষু চিকিত্সাসেবার লক্ষ্যে গোপালগঞ্জে শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
সাধারণ মানুষকে চোখের যত্ন নেয়ার প্রতি আরও সচেতন করে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করে শেখ হাসিনা বলেন, জন্মগত চোখের রোগ এড়াতে গর্ভকালীন সময়েই মায়েদের সচেতনতা বাড়াতে হবে। গ্রামের মানুষের স্বাস্থ্যসেবার জন্য হেলথ কমিউনিটি ক্লিনিক করার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর গ্রামাঞ্চলে কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের কাজ শুরু হয়। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর তা বন্ধ করে দেয়। ২০০৯ সালে আমরা আবার ক্ষমতায় এসে হেলথ কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করেছি। সেখান থেকে মানুষ সেবা পাচ্ছে। বর্তমানে সারাদেশে সাড়ে ১২ হাজারেরও বেশি হেলথ কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে বিনামূল্যে সেবা ও ৩০ ধরনের ওষুধ দেয়া হচ্ছে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত সাত বছরে দেশে ২৪টি সরকারি হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়েছে। এই সময়েই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। বর্তমানে সারাদেশে ৬১২টি সরকারি হাসপাতাল এবং সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মেডিক্যাল কলেজ রয়েছে ১০০টি। হাসপাতালগুলোতে সার্বক্ষণিক চিকিত্সাসেবার ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২৪ ঘণ্টা স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা আমরা করছি। তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি জেলায় মেডিক্যাল কলেজ করার চিন্তা-ভাবনা রয়েছে তার সরকারের। তবে এক্ষেত্রে ঢাকার বাইরে শিক্ষক পাওয়ার সমস্যা রয়েছে। পোড়া রোগীদের জন্য বার্ন ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি-জামায়াত আন্দোলনের নামে যেভাবে মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করে যে অবস্থার সৃষ্টি করেছে তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। মানুষ মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করতে পারে এটা চিন্তারও বাইরে। কিন্তু তাদের আন্দোলন মানে মানুষ হত্যা, জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে মারা। সরকারের পক্ষ থেকে নার্সিং পেশায় সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নার্সিং সন্মানজনক পেশা- এটা মানুষকে বোঝাতে হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, মানুষের চিকিত্সাসেবা দেয়া আমাদের কর্তব্য, আমাদের সরকার তাই মনে করে। ইদানিং নতুন নতুন আরো রোগ দেখা দিচ্ছে। সেগুলোও কিভাবে মোকাবিলা করা যায়, সেগুলোর চিকিত্সা কিভাবে মানুষকে দেয়া যায়, সে বিষয়ে আরো সচেতনতা দরকার।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত হওয়ায় কমেছে শিশু ও মাতৃ মৃত্যু। দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে, নিশ্চিত করা হচ্ছে পুষ্টি নিরাপত্তা। আর এ কারণে মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। ইতিমধ্যে আমরা যুগোপযোগী স্বাস্থ্য নীতি প্রণয়ন করেছি। যে স্বাস্থ্য নীতিমালার ভিত্তিতে আমরা বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছি।
বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে বলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার দেশের প্রতিটি খাতের উন্নয়নে দূরদর্শিতার সাথে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। কর্মসূচিগুলোর সফল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার ও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। বিএনপি-জামায়াতের আন্দোলনের নামে মানুষ পুড়িয়ে হত্যার সমালোচনা করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, নারী-শিশু-অন্তঃসত্ত্বা মহিলা কেউই তাদের আগুন সন্ত্রাসের হাত থেকে রেহাই পায়নি। আগামী তিন এপ্রিল জাতীয় বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট উদ্বোধন করা হবে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশ চক্ষু চিকিত্সক সমিতির সভাপতি ডা. শরফুদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক, বিশিষ্ট চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. সৈয়দ মুদাচ্ছের আলী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. দীন মোহাম্মদ নুরুল হক প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. দীন মোহাম্মদ নুরুল হককে তার পেশাগত দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে শহীদ ডা. আলিম চৌধুরী স্বর্ণপদকে ভূষিত করেন। তিনি চোখের রোগে করণীয় শিরোনামে একটি বইয়ের মোড়কও উন্মোচন করেন। মন্ত্রীবর্গ, সংসদ সদস্যবৃন্দ এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও চিকিত্সক সমাজের প্রতিনিধিগণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।