মায়ের আকুতি

‘ভুল ক্রুটি ক্ষমা করে জোহাকে ফিরিয়ে দিন’

আমি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান। মুক্তিযুদ্ধে আমার বাবা আলমগীর হোসেন যশোরে শহীদ হন। সেই পরিবারের নাতি তানভীর হাসান জোহা আজ নিখোঁজ। প্রধানমন্ত্রী জাতির জনক ও মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার কাছে একটাই আকুতি ‘আমার সন্তানকে আমার কোলে ফিরিয়ে দিন।’ সন্তানের প্রতীক্ষায় থাকতে থাকতে এখন ষাটোর্দ্ধ মাকসুদা হাসান বিছানায় শয্যাশায়ী। যৌথ পরিবারে বসবাস করা রাজধানীর কলাবাগানের লেকসার্কাস এলাকার বশির উদ্দিন রোডের ১৮/৩ নম্বর বাড়ির প্রতিটি সদস্য এখন শোকে মূহ্যমান। কেউ কাঁদছেন। কেউবা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন জানালার গ্রিল ধরে। তাদের একটাই দাবি, ভুল ক্রুটি যাই হোক, ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখে জোহাকে ফিরিয়ে দেয়া হোক।
 
রাজধানীর কলাবাগানের লেকসার্কাস এলাকার বাড়িতে নিখোঁজ হওয়া সাইবার বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা সপরিবারে থাকতেন। স্ত্রী ডা. কামরুন নাহার স্বামীর খোঁজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। বাড়ির তিন তলায় থাকেন জোহার পরিবার। এই বাসায় শয্যাশায়ী হয়েছেন জোহার মা মাকসুদা হাসান। বাবা নজরুল হাসান ২০১৪ সালে মারা যান। পরিবারটিকে দেখাশুনা করছেন জোহার চাচা মাহবুব আলম। তিনি ১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার বন্ধু বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান একই সঙ্গে অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। 
 
জোহার মা মাকসুদা বেগমের দেখাশুনা করছেন তার মেয়ে ডা. রুমানা। জোহার স্ত্রী কামরুন নাহার চিকিৎসক। এ কারণে পুত্রের খোঁজে শয্যাশায়ী মাকসুদা হাসানের চিকিৎসা পারিবারিকভাবেই পরিচালনা করা হচ্ছে। 
 
চাচা মাহবুব আলম বলেন, জোহা তো বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের কাজ করছিল। সে তো কোন  টাকা চুরি করেনি। বরং বাংলাদেশ ব্যাংকের চুরি হওয়ার ৮শ’ কোটি টাকা নিয়ে কথা বলেছিল। সে আগে থেকেই বলে আসছিল বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সাইবার ক্রাইম। অথচ সেই জোহা আজ কিনা নিখোঁজ।
 
মাকসুদা হাসানের এখন একটাই চাওয়া, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান হিসাবে জোহাকে তার কোলে ফিরে দেয়া হোক। দুই বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর তার প্রিয় সন্তানের নিখোঁজের কষ্টের বেদনা সইতে পারছেন না। সন্তান ভুল করতেই পারে। সেই ভুল শুধরানোর দায়িত্ব তার। ত্রুুটি-বিচ্যূতি যাই হোক, প্রধানমন্ত্রী ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখে তাকে ফিরিয়ে দেয়া হোক। একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তার এটাই শেষ চাওয়া।
  
জোহার স্ত্রী ডা. কামরুন নাহার বলেন, কী বলব। কত জনের কাছে গেলাম স্বামীর সন্ধানে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সব দফতরে গিয়ে ‘ভিক্ষা’ চেয়েছি স্বামীকে। আমি তাদের কাছে অনুরোধ করেছি, আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী একটি পরিবার। আমরা বর্তমান সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করছি। আমরা কেন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবো ? জোহা সবসময় সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে থেকে দেশের জন্য কাজ করে আসছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার কাছে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে যখনই কোনো সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে, তখনই সে তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ, তিনি যেনো আমার স্বামীকে ফিরিয়ে দেন।
 
হিউম্যান রাইটস ফোরামের উদ্বেগ : জোহা নিখোঁজ নিয়ে ১৯টি মানবাধিকার সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত হিউম্যান রাইটস ফোরাম উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংগঠনের আহ্বায়ক সুলতানা কামাল স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বলা হয়,  জোহার পরিবারের সদস্যরা থানায় অভিযোগ করতে গেলে যেভাবে তাদের এক থানা থেকে অন্য থানায় ফেরত পাঠানো হয় এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের তরফ থেকে দেয়া পরস্পরবিরোধী বক্তব্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। নিখোঁজ বা অপহৃত হওয়া যে কোনো ব্যক্তিকে খুঁজে বের করার সাংবিধানিক দায়িত্ব আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এবং সরকারের। আমরা তানভীর হাসানের নিরাপত্তার বিষয়ে উদ্বিগ্ন। তার পরিবার পরিজনের নিদারুন মানসিক যন্ত্রণার এই ক্ষণে আমরা তাদের প্রতি সহমর্মিতা জানাই। তানভীর হাসানের সন্ধানে সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের জন্য জোরদাবি জানাই। পাশাপাশি দ্রুত এ ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি।