জন্মদিনে হিরু

সাইফুল ইসলাম জুয়েল-এর

সাতসকালে হিরুদের ল্যান্ডফোনে বেশ ক’বার মিসডকল এসেছে। এটা অবশ্য হিরুর জানার কথা নয়। সে মোবাইল বন্ধ করে ঘুমিয়ে আছে।

হিরুর মা খুব ভোরে উঠে কেক বানাতে শুরু করে দিয়েছেন। আজ হিরুর জন্মদিন। গত ক’টা দিন ইউটিউবে কেক বানানোর দারুণ সব রেসিপি দেখেছেন তিনি। কমসে কম দশ পাউন্ডের একটা কেক না হলে কী চলে!

কিন্তু তার মাথা বিগড়ে দিচ্ছে যত্তসব মিসডকল। মোবাইলে হলেও নাহয় কথা ছিল। এ যুগে কেউ ল্যান্ডফোনে কাউকে মিসডকল দেয়! যেখানে মোবাইলেই মিসডকল দেওয়ার মতো পাবলিকই বিরল প্রাণীর খাতায় নাম লেখাতে চলেছে!

কিছুক্ষণ ফোনের পাশেই বসেছিলেন তিনি। ফের রিং হতেই রিসিভার তুলে কানে নিলেন। এবার অবশ্য ওপাশের কলার ভ্যাবাচ্যাকা খেলেও ফোনটা কাটল না। তবে, হিরুর মায়ের কণ্ঠে ‘হ্যালো’ শুনেই সে হেলে পড়ল, মানে ফোনটা রেখে দিল।

ঘটনাটা তিনি তার স্বামীকে বলে নিজের কাজে মনোযোগী হলেন।

একটু পরে আবারও ফোন এলো। এবার হিরুর বাবা ফোনটা তুলে বেশ মোলায়েম কণ্ঠে বললেন, ‘হ্যালো।’

ওপাশ থেকেও মিষ্টি-মধুর কণ্ঠে ভেসে এলো, ‘শুভ জন্মদিন!’

হিরুর বাবা যেন টাসকি খেলেন। আজ তো তার জন্মদিন নয়, তাহলে...? বিষয়টা ক্লিয়ার হতেই মুহূর্তেই পুরো চিত্রনাট্যটা সাজিয়ে ফেললেন। আগের মতোই নরম কণ্ঠে বললেন, ‘ওহ তুমি! অনেক অনেক ধন্যবাদ। কিন্তু এভাবে তো হবে না!’

ওপাশের কলার তখন বিগলিত। ‘তাহলে কী করতে হবে বলুন?’

‘জন্মদিনের গিফট কই?’

‘গিফট খানিকের ভিতরে পৌঁছে যাবে।’ বিগলিত হাসি হেসে ওপাশ থেকে বলল।

‘ওকে। গিফট দেখে আমিও ডিসাইটড করব কোথায় ট্রিট দেব—ফাইভস্টার নাকি ফুটপাতস্টারে!’

ওপাশের ব্যক্তিটির আনন্দ যেন ধরে না। হিরু তাকে ট্রিটও দেবে!

 

দুই.

ঘণ্টাখানেকের কথা বললেও বেশ সময় লাগল। বোধহয় আনন্দে গদগদ হয়ে ওপাশের শুভাকাঙ্ক্ষী আগেই কিনে রাখা গিফটের সঙ্গে নতুন করে আরও কিছু যোগ করেছে।

‘সে করুকগে, দেখি তো ভিতরে কী আছে!’ হিরুর বাবা এই বলে সাবধানে র্যাপিং পেপারে মোড়ানো ইয়া বড় গিফটের প্যাকেটটা খুলে চেক করলেন!

কী নেই সেখানে। যেন পুরো দোকান ভর্তি করে পাঠিয়েছে!

‘সর্বনাশ! মেয়েটা কোনো দোকানের শিক কাটেনি তো আবার!’ হিরুর বাবা বিড়বিড় করে বললেন।

প্যাকেটের গায়ে সুন্দর গোটা গোটা মেয়েলি হাতে জন্মদিনের শুভেচ্ছাবার্তা লেখা। প্রেরকের নাম নেই। মনে কিছুটা দ্বিধা কাজ না করলেও তিনি ঠিক করলেন, মেয়েটার পরিচয় শিগগিরই জানা যাবে এবং সে সিস্টেম তার ভালো করেই জানা আছে!

 

তিন.

কিছুক্ষণ পর হেলতে দুলতে হিরু তার রুম থেকে বেরিয়ে এলো। আজ বন্ধের দিন। সবাই ঘরেই আছে। হিরুর ঘুম ভাঙতেই গোটা বাসায় সাজসাজ রব পড়ে গেল।

ছোটকু হিরুর মাথায় দুটি ডিম ভাঙল। হিরু আঁতকে উঠল। ছোটকুকে তো সে ভালো করেই চেনে। নিশ্চিত পচা ডিম ফাটিয়েছে তার মাথায়!

হিরুর হাবভাব দেখে ছোটকু বলল, ‘ভয় পাসনে, ভাতিজা। পচা ডিম ভাঙিনি। আসলে এখন ডিমের যা দাম। ডিম ক্রাইসিসও বলতে পারিস। সে কারণে ডিম পচে যাওয়ার আগেই সাবাড়, আই মিন খাওয়া হয়ে যায়। দেখিস না আজকাল কত কত কাকশিল্পীর দেখা মেলে বাজারে। সবই বুঝলি এই ডিমের মূল্যবৃদ্ধির ফসল, পচা ডিম পাওয়া যায় না বলে ওইসব কাকশিল্পীদের দমিয়ে রাখা যাচ্ছে না! তাছাড়া...’

ছোটকু বাচালের মতো আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, হিরুর বাবা তাকে জোর করে থামালেন, ‘সকালবেলা কথা কম, কাজ বেশি। হিরুর জন্য কে কী গিফট এনেছিস বের কর!’

সবাই যেন আকাশ থেকে পড়ল। জন্মদিনে কেক কাটার রেওয়াজ থাকলেও গিফট প্রদানের চলটা যে নেই। সেখানে আজ হঠাত্ করে গিফটের কথা তুলে হিরুর বাবা সবাইকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছেন।

সবার এই থমথমে মুখের দিকে তাকিয়ে হিরুর বাবা মুচকি হেসে হিরুর হাতে একটা বড়সড় ধরনের গিফটের প্যাকেট তুলে দিলেন। ‘এটা আমার তরফ থেকে!’ বললেন তিনি। একটু আগেই এটা পেয়েছিলেন, সেই টেলিফোনওয়ালির পাঠানো!

 

এমন একটা গিফট পেয়েও হিরুর যেন কোনো ভাবান্তর নেই! ভাবখানা এমন—হিরু যেন পুরো ঘটনাটা জানে! তার বাবাও কিছুটা দ্বন্দ্বে পড়ে গেলেন! ‘ফোনে দুজনের মধ্যে কথাবার্তা হয়ে যায়নি তো?’ তিনি একটু আগেও হিরুর ফোনটা চেক করে এসেছেন। বন্ধই দেখেছেন। সবাই ফোন করে করে শুভেচ্ছাবার্তা জানিয়ে ঘুমের দফারফা করবে বলে গতরাতেই হিরু বুদ্ধি করে ফোনটা বন্ধ রেখে ঘুমিয়েছিল।

‘কীরে, তুই খুশি হসনি?’ হিরুর মা জিজ্ঞেস করলেন!

হিরু মুখ কালা করে বলল, ‘প্রতিবছর জন্মদিনে আব্বু আমাকে টাকা দেন। সেই টাকায় বন্ধুদের জম্পেশ ট্রিট দিই। এবছর গিফট দেওয়া মানে তো নগদপ্রাপ্তির সম্ভাবনা শূন্য!’

হিরুর কথা শুনে সবাই হোঃ হোঃ করে হেসে উঠল।

 

চার.

বাবা সত্যি সত্যিই তাকে কোনো টাকা দেননি। গিফট দিয়েই খালাস! সে কারণে সারাদিনে বাইরেও যেতে পারেনি সে। গেলেই তো বন্ধুরা চেপে ধরবে। ট্রিটের টাকা পাবে কই?

কিন্তু সন্ধ্যার পরে বেশিক্ষণ বাসায়ও বসে থাকতে পারল না। বন্ধুদের ফোনের পর ফোন পেয়ে অস্থির হওয়ার দশা। শেষমেশ তাকে বের হতেই হলো।

পাড়ার তোতা চাকলাদারের দোকানে মিলিত হতেই হইহই করে উঠল সবাই। হিরুকে ঘিরে ধরল তারা। তারপর পটাপট হিরুর মাথায় বেশ কয়টা ডিম ভাঙল।

হিরু অবশ্য তেমন একটা প্রতিক্রিয়া দেখাল না। ডিমের এই দুর্মূল্যের বাজারে এরা পচা ডিম পাবে কই! আর মাথায় তাজা ডিম লাগালে অসুবিধে কী! বরং চুলগুলো পুষ্টি পাবে!

একটু পরেই উটকো গন্ধে নাক বন্ধ করতে হলো। ‘সত্যিই তোরা পচা ডিম খুঁজে পেয়েছিস?’ হিরু আশ্চর্যান্বিত হয়ে বলল।

অন্যরা কাচুমাচু হয়ে বলল, ‘ইয়ে মানে... বাজারে মুরগির পচা ডিম পাইনি।’

‘তাহলে?’

‘এগুলো কাকের বাসা থেকে চুরি করতে হয়েছে!’

সবাই ভেবেছিল হিরু এবারে ‘ওয়াক থু’ বলে বমি করে দেবে। কিন্তু সে তেমন কিছুই করল না। বরং মুখ বাঁকিয়ে বলল, ‘তোরা দেশের কয়েকজন কবির সংখ্যা কমিয়ে দিলি রে!’

‘কিভাবে?’ সবাই অবাক।

‘জানিস না দেশের কাক ও কবির সংখ্যা সমান। এই কাকের ডিমগুলো থেকে যে কয়টা কাক জন্মাত, দেশেও ততজন নতুন কবির দেখা মিলত!’

অন্যরা বাকরুদ্ধ। কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না।

হিরু ফের বলল, ‘কাকের ডিম মাথায় নিয়ে বসে থাকা যাবে না। আমি তাহলে যাই!’

অন্যরা দ্বিধায় পড়ে গেল। হিরুকে তারা ছেড়ে দেবে? তাই কি হয়! এখন তাকে নিয়ে শহরের সবচে ভালো (দামের দিক থেকে) রেস্টুরেন্টে যাবে। বেশ টাকা খসাবে। তারপরে নাহয় ছেড়ে দেবে! কিন্তু মাথায় কাকের ডিম মাখানো হিরুকে নিয়ে সেখানে যাওয়াও যে মুশকিল! হিরুকে এখন ছেড়ে দিলে সে কি বাসায় গিয়ে গোসল করে আবার ফিরে আসবে!

তাদের ভাবনার মাঝেই হিরু বলল, ‘এখন বাসায় যাব না। তারচে কেউ দশটা টাকা দে। নুরু মিয়ার ওখান থেকেই গোসল করে আসি।’

একজন নয়, খুশি মনে গুনে গুনে নয়জন তাদের পকেট থেকে টাকা বের করে বাড়িয়ে ধরল। হিরু তাদের কাউকেই নিরাশ করল না। নব্বই টাকা উঠেছে। গোসল করা বাবদ দশ টাকা রেখেও গামছা কেনার মতো আশি টাকা থাকছে! হিরুকে জন্মদিনের ড্রেসে গোসল করতে হচ্ছে না!

যাওয়ার আগে হিরু তোতা চাকলারকে বলল, ‘তুমি তো টাকা দিলা না! একটা শ্যাম্পু গিফট করো। নাহলে মাথা থেকে গন্ধটা যাবে না!’

তোতা চাকলাদারও পেটে আলতো করে হাত বুলিয়ে খুশি মনেই শ্যাম্পুর পাতা থেকে একটা মিনিপ্যাক ছিঁড়ে হিরুর দিকে বাড়িয়ে ধরল।

 

পাঁচ.

হিরু ‘নুরুর গোসলখানা’য় ঢুকলে অন্যরা তার কঠিন পাহারায় নিয়োজিত হলো। হিরু যেন আজ কোনোমতেই পালিয়ে যেতে না পারে!

হিরুও ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে কোনো গাইগুই করল না। সবাইকে নিয়েই রেস্টুরেন্টের পানে ছুটল। তার পিছনের লাইনটা মোটামুটি ছোটখাটো একখানা মিছিলের মতোই হলো।

রেস্টুরেন্টে খাওয়ার মাঝখানে হিরু তার জন্মদিনের স্বাগত বক্তব্য আরম্ভ করল, ‘আমার জন্মদিনের আপনাদের উত্সাহ দেখে আমি শিহরিত! আপনাদের জন্য আমার মা বিশেষ কেক বানিয়েছেন। দশ পাউন্ডের কেকটা আমরা খেয়ে শেষ করতে পারছি না। আশা করছি, আপনারাও সহযোগিতার পেট বাড়িয়ে দেবেন! আর আমার জন্মদিনে আপনারা নিজেদের খরচে এমন মজা করে খাচ্ছেন দেখে আমারও বেশ ভাল্লাগছে। আমার পকেটে কোনো টাকা নেই। এবার আব্বু টাকা দেননি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আপনারা নিজ নিজ বিল দেওয়ার পাশাপাশি সবাই সমন্বয় করে আমার বিলটাও দিয়ে দেবেন। মা জোর করে অনেক কেক খাইয়েছেন, তাই বেশি খেতে পারলাম না। তাছাড়া বাসায় গিয়েও তো কিছু খেতে হবে। পেটটা অলরেডি ফুলে ঢোল। এখন আসি। সবাইকে ধন্যবাদ।’

কারওর মুখে কোনো রা নেই। এমনকি মুখের খাবারও আর পেটে ঢুকতে চাইল না। হিরুর তা খেয়াল করতে যেন বয়েই গেছে, ডাবল সুপারস্টার রেস্টুরেন্ট থেকে হেলতে দুলতে বেরিয়ে এলো সে।

 

ছয়.

হিরুর বাবা সারাদিন বেশ উসখুশ করেছেন! ক্রমশ কৌতূহলী হয়ে উঠছে তার মন। সকালে হিরুকে গিফটটা কোন মেয়ে পাঠাল? শত ভেবেও তিনি কূল-কিনার করতে পারেননি। এমনকি বাসার অন্য সবার সঙ্গে বিষয়টা শেয়ার করেও ন্যূনতম ধারণা নিতে পারেননি।

তখনই টেলিফোনটা বেজে উঠল। হিরুর মা ফোনটা ধরে ‘হ্যালো’ বলতেই ওপাশের ব্যক্তির কণ্ঠস্বর চেঞ্জ হয়ে গেল। মেয়েরা পুরুষের মতো করে বলার চেষ্টা করলে বিষয়টা অদ্ভুতই লাগে। হিরুর মা হেসে ফেললেন। বললেন, ‘এই মেয়ে, কথা বলো!’ এই বলে তিনি চোখ টিপে রিসিভারটা হিরুর বাবার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। হিরুর বাবা হিরু সেজে বালিকার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললেন। ট্রিট ভেন্যুও ঠিক করে দিলেন! শেষে বললেন, ‘আধঘণ্টার মধ্যেই চলে আসছি। বাই!’

তখন থেকে হিরুকে অবিরাম ফোন দিয়ে চলেছেন তিনি। উদ্দেশ্য, হিরুকে টাকা দিয়ে সেখানে পাঠাবেন। তারপর হিরুর পিছু পিছু গিয়ে তিনি মেয়েটিকে দেখে আসবেন।

হিরুর ফোন বন্ধ। রেস্টুরেন্টে সবাইকে রেখে বাইরে বেরিয়েই সে ফোনটা বন্ধ করে দিয়েছে। শেষমেশ হিরুর বাবা হিরুকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়লেন।

 

সাত.

আধঘণ্টা সেই কখন পেরিয়ে গেছে! কতক্ষণ পরে হিরুর দেখা মিলল। তার বাবা সোত্সাহে হিরুর হাতে অনেক টাকা গুঁজে দিয়ে বললেন, ‘এখুনি ডাবল সুপারস্টার রেস্টুরেন্টে যা।’

হিরু ভাবল, বন্ধুরা বোধহয় শেষমেশ তাকে না পেয়ে তার বাবাকেই ফোন দিয়েছে। তা কেন দেবে? ওদের কাছে কি পর্যাপ্ত টাকা নেই? সে কী করে হয়? এত্তগুলা মানুষ। সবার মিলে হয়ে যাওয়ার কথা।

টাকাটা নিয়ে সে বাসার পথ ধরল। বেশ খুশি সে। বাবা অনেকগুলো টাকা দিয়েছেন। তবে তিনি টাকাটা একটু লেট করে দিয়েছেন, এই যা। তাতে অবশ্য সুবিধাই হয়েছে। অন্যান্যবারের ন্যায় এবার ট্রিট দিতে গিয়ে তাকে পুরো টাকাটা হারাতে হলো না!

হিরুর বাবা শুকনো গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘কীরে! ওখানে না গিয়ে বাসার দিকে যাচ্ছিস যে...’

‘ওখানে ট্রিট হয়ে গেছে! এখন বাসায় গিয়ে বিছানায় গড়াগড়ি খাব।’

হিরু চলে গেলেও তার বাবা ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন। কিংকর্তব্যবিমূঢ় তিনি। হিরু ডেটিংয়ে যাবে বলে তিনি অন্যান্য বছরের থেকে এবার বেশি টাকা দিয়েছেন। কিন্তু ছেলেটা টাকাটা যে নিয়ে বাসার পানে চলেছে...! তাকে তিনি কী করে বলবেন—মেয়েটা তার ট্রিটের অপেক্ষায় ওই রেস্টুরেন্টে বসে আছে...

‘কী যে করি...’ মেয়েটিকে দেখার প্রবল ইচ্ছে তার। কিন্তু হিরু না গেলে চিনবেন করে? নাকি উল্টো হিরুই এরইমধ্যে বালিকার টাকায় রেস্টুরেন্টে ভরপেট খেয়ে এসেছে?