বাজে জন্মদিন

 

 মুন্তাসীর আল মামুন

 

১০ মার্চ আমার ২৩তম জন্মদিন ছিল। জীবনের সবকটি জন্মদিন খুব আনন্দঘনভাবে উদযাপন না করলেও শেষের দিকের ৪-৫টা জন্মদিন খুব হই-হুল্লোড় করে বন্ধুবান্ধব নিয়ে পালন করেছি। সেইসব সুখস্মৃতি এখনো মনে পড়ে। কিন্তু এবারের জন্মদিনটি আমার জন্য ছিল মহা বিরক্তির। আর বন্ধুদের জন্য ছিল মহা ঠাট্টার। সব সুখস্মৃতি ম্লান করে এই বিরক্তিকর আর ঠাট্টার জন্মদিনটি।

রাত ১২টার পর থেকে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনরা ফেসবুকে, ক্ষুদে বার্তায় জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাচ্ছিল। খুব আনন্দ আর উত্সাহ নিয়ে সবার মেসেজের উত্তর দিয়েছিলাম। সকালে পরিপাটি হয়ে বের হলাম বাসা থেকে। কিছুদূর যাওয়ার পর কয়েকজন বন্ধুকে দেখলাম একটা দোকানে বসে আছে। আমাকে দেখেই সবাই এগিয়ে এলো। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একের পর এক ডিম ভাঙা শুরু হলো আমার মাথার ওপর। কেউ ডিম ভাঙছে আর কেউ আটা দিচ্ছে। এভাবে কতগুলো ডিম আর কত কেজি আটা তারা আমার মাথার ওপর বর্ষণ করেছে সেটা শুধু তারাই জানে। আশপাশের সবাই ছবি তুলছে আর অট্টহাসি হাসছে। চশমাটাকেও তারা রেহায় দেয়নি। পুরো শরীরের উপর ইঞ্চি খানেক ডিম-আটার স্তর বসেছে। যতই সময় গড়াচ্ছিল ততই সেগুলো শুকিয়ে শরীরের সাথে পোক্তভাবে এঁটে যাচ্ছে। কী যে বিশ্রী অবস্থা হয়েছে তা বলে বুঝানো যাবে না! চোখ মুছে দেখি তারা কেউ আর জায়গায় নেই। সবাই কোথায় যেন মিলিয়ে গেছে। রাগে, ক্ষোভে ইচ্ছে করছিল ফেটে পড়ি। কিন্তু লাভ হবে কী? এই ভেবে একটা রিকশা নিয়ে বাসায় ফিরলাম। সারাটা পথ মানুষ আমার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল আর হাসছিল। মনে হচ্ছে শহরে জোকার নেমেছি। বাড়িতে পৌঁছে ঘরে ঢুকতেই সবাই চিত্কার দিয়ে উঠল। আশপাশের সবাই দৌড়ে এলো। কেউই যেন চিনতে পারছে না আমাকে। তারপর সবাইকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বললাম। শোনার পর মা বিরক্ত হলো বন্ধুদের ওপর কিন্তু বাড়ির অন্য সবাই হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরিয়ে ফেলছে। যাইহোক, গোসল করে ফ্রেশ হয়ে গাল ফুলিয়ে বসে রইলাম। বিকালে আবার বেরুলাম বাসা থেকে। ভাবলাম একই দুষ্টুমি কি আর বারবার করবে? কিন্তু আবারও সেই ভয়ংকর পরিস্থিতিতে পড়লাম। কোথা থেকে যেন দশ-বারোজন ছুটে এলো। তবে সকালে যারা ছিল এখানে তাদের কেউ নেই। চারদিক ঘিরে ফেলেছে। তারপর একের পর এক ডিম ফাটানো আর আটা মাখানো শুরু করল। কয়েকজন ছবি তুলছে আর ভিডিও করছে। কিন্তু মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া কিছুই করার ছিল না। কারণ ক্ষোভ ঝাড়লে এরা আরও বেশি করবে। আর যেহেতু ভিডিও করছে সেহেতু বেশি একটা রিঅ্যাক্ট না করে অন্তরে ক্ষোভ চেপে মুখে হাসি ফুটিয়ে তুললাম। বাসায় ফিরে আবার গোসল করলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম যে আজ আর এলাকায় থাকব না। গাট্টিগোট্টা গুছিয়ে খালার বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিলাম রিকশায় করে। রিকশার হুডি ফেলে হালকা হালকা অন্ধকারে রওনা হলাম। কিন্তু এ যাত্রায়ও রেহাই পেলাম না। আরেকটা গ্রুপ এসে পথে রিকশা থামিয়ে একই কাণ্ড করল। কত কাকুতিমিনতি করলাম, কিন্তু কে শুনে কার কথা। অসহায়ের মতো আবারও ডিম-আটায় সং সাজলাম। বাসায় এসে আবারও গোসল করলাম। একদিনে এতবার সাবান আর গামছা দিয়ে ঘষতে ঘষতে শরীরের সমস্ত চামড়া লাল হয়ে গেলো। ব্যথাও হচ্ছে বিভিন্ন স্থানে। ঘণ্টাখানেকেরর মধ্যে শরীর অসাড় হয়ে জ্বর পেয়ে বসল। এভাবেই জীবনের তেইশতম জন্মদিনটি কাটল আমার।

এমন চরম লেভেলের ঠাট্টায় তারা মেতে উঠবে জানলে জন্মদিনের এক সপ্তাহ আগেই এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতাম। সিদ্ধান্ত নিয়েছি আর কোনো জন্মদিনে এলাকায় থাকব না। আর থাকলেও ঘর থেকে বের হবো না।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়