‘দুর্যোগে ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি-সরকারি সমন্বয় ফলপ্রসূ হবে’

প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেসরকারি ও সরকারি সমন্বয়ের মাধ্যমে মোকাবেলা করলেই সবার জন্য ফলপ্রসূ হবে বলে জানিয়েছেন সেন্টার ফর এক্সিলেন্স-দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার পরিচালক কর্নেল যোসেফ মার্টিন। তিনি বলেন, এইসব দুর্যোগের কারণেই আমি এবং আমার কর্মকর্তাগণ বাংলাদেশের সামরিক-বেসামরিক কমিউনিটির সাথে শক্তিশালী অংশীদারিত্ব বজায় রাখতে চাই।
 
মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ কথা বলেন তিনি।
 
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সামরিক প্রশিক্ষণে ইউএস অফিস অব ফরেন ডিজাস্টার অ্যাসিস্ট্যান্ট, দ্য ইন্টার্ন্যাশনাল কমিটি অব দ্য রেড ক্রস, দ্য ইউনাইটেড নেশনস অফিস ফর দ্য কো-অর্ডিনেশন অব হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাফেয়ার্স এবং ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রামের মত সংগঠনকে যুক্ত করার ফলে তাঁদের দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে যা দুর্যোগ-পরবর্তী সমন্বয়ে সহায়তা করবে।
 
গত বছর এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল বিশ্বে সবচেয়ে বেশি দুর্যোগপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ও জাপান প্রবল বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এবং নেপালের ভূমিকম্প কাঠমুন্ডুকে ধবংস করে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘূর্ণিঝড়, মহামারী, এবং প্রবল বন্যা হবে যা এই অঞ্চলকে প্রবলভাবে প্লেগের মত ছেয়ে ফেলবে।
 
যোসেফ মার্টিন বলেন,  এই দুর্যোগসমূহ আমাদের সারাক্ষণ একটি ব্যাপার স্মরণ করিয়ে  দিচ্ছে যে আন্তর্জাতিক অংশীদার ও বেসামরিক-সামরিক সহযোগিতা আগের তুলনায় আরও বেশী গুরুত্ববহ হয়ে উঠেছে।
 
তিনি বলেন, ১৯৯১ সালে বাংলাদেশের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় মেরিয়ানের পর যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ সরকারের সাড়া দেওয়া প্রচেষ্টায় সহযোগিতা করতে পেরে গর্বিত। বিশ্ব এর আগে কখনো দুর্যোগে সাড়া দেওয়ার এত দ্রুত ও বেসামরিক-সামরিক সহযোগিতা অপারেশন সি এঞ্জেল এর মত দৃষ্টান্ত দেখেনি, যা আজকের দিন পর্যন্ত বিশ্বে সর্ববৃহৎ বেসামরিক-সামরিক দুর্যোগ ত্রাণ তৎপরতার উদাহরণ।
 
অপারেশন সি এঞ্জেল এর কমান্ডার লে. জে. হেনরি স্ট্যাকপোল ১৯৯১ সালে বলেছিলেন যে বাংলাদেশ সরকারের কাছে দুর্যোগ মোকাবেলায় যথেষ্ট সরবরাহ মজুদ ছিল; চ্যালেঞ্জ ছিল ওগুলোকে দুর্গম এলাকা ও বিচ্ছিন্ন দ্বীপগুলোতে পোঁছে দেওয়া। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং বেসামরিক সংস্থাসমূহ, এনজিও, এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ও অংশীদার দেশগুলোর সহযোগিতায়, ত্রাণসামগ্রী সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগণের কাছে সময়মত ও যথার্থভাবে পোঁছান সম্ভব হয়েছে।  এছাড়াও ইউএসএআইডি, ফিড দ্য চিলড্রেন, ইউনিসেফ এর মত সংস্থা এবং অগনিত অন্যান্য সংস্থা সেনাবাহিনী চলে যাওয়ার অনেক পর অব্দি বাংলাদেশে ত্রাণ তৎপরতা চালিয়ে গেছে।
 
আসলে অপারেশন সি এ্যাঞ্জেল এর সময় যোগ্যতা ও সমন্বয় এর ক্ষেত্রে বেসামরিক-সামরিক সহযোগিতা এতটাই যথার্থ ছিল যে ১৯৯০-৯৩ সালে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম মাইলাম ২০১১ সালে বলেন, “সি এঞ্জেল এর সময় যে সমন্বয় মডেল আমরা গড়ে তুলেছিলাম এরপর থেকে আমাদের সরকারের সামরিক ও বেসামরিক পক্ষ সেই মডেলটিই অনুসরণ করে আসছে।
 
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ আরো অনেক কারণেই মডেল। বাংলাদেশ ঘূর্ণিঝড় ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে হুমকির সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও দেশটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা প্রস্তুতিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে।  এছাড়াও, দেশটি একটি জাতির সাহসী অগ্রগতির ভূমিকা রাখার ব্যাপারে এ অঞ্চলে দৃষ্টান্তস্বরূপ, এবং সময়ের প্রেক্ষিতে পরীক্ষিত সম্পর্ক  বেসামরিক-সামরিক নাগরিক প্রয়োজনে সরকারকে সহযোগিতা করতে সদা প্রস্তুত।
 
সামরিক-বেসামরিক সহযোগিতার এই  বন্ধন আরও পরীক্ষিত হয় ২০০৭ সালে যখন ঘূর্ণিঝড় সিডর বাংলাদেশের উপর আঘাত হানে। ১৯৯১ সালের সরকারি সংস্থাগুলোর দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় পর সেই সময় ক্ষয়-ক্ষতি ও মৃত্যু অনেক কম হয়েছে।
 
যোসেফ বলেন, বেসামরিক এবং সামরিক কমিউনিটির মধ্যে নিবিড় সমন্বয় অসংখ্য কারণে প্রয়োজনীয়।  প্রথমত, এর ফলে সবচেয়ে ভালো ও যথোপযুক্ত সম্পদকে কাজে লাগিয়ে দুর্যোগে সাড়া প্রদান এবং উদ্ধার কাজ গতিশীল করা যায়।  এর ফলে ত্রাণকর্মীরা হেলিকপ্টারের মত সম্পদকে কাজে লাগিয়ে বিধ্বস্ত, প্রত্যন্ত এলাকায় পৌছাতে পারেন এবং অন্যান্য সম্পদকে তুলনামূলকভাবে সহজগম্য এলাকায় কাজে লাগাতে পারেন।  সমন্বয়ের ফলে একই কাজের পুনরাবৃত্তি বন্ধ এবং প্রয়োজনীয় সময় এবং অর্থের অপচয় রোধ হয়।  সর্বোপরী, এই সমন্বয় ক্ষতিগ্রস্ত দেশটির সাথে সহায়তা প্রদানকারী দেশগুলোর বিভিন্ন সংস্থাগুলো এবং বিভিন্ন কমিউনিটির মানুষের মধ্যে সময়োপযোগী তথ্যপ্রবাহে সহায়তা প্রদান করে।
 
এই সবগুলো উপাদানের সম্মিলনে একটিই সুফল পাওয়া যায় যার অর্থ-মানুষের জীবন বাঁচান সম্ভব হয়।  আমরা অনিশ্চিত একটি ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি যেখানে অধিকতর শক্তিশালী ও ঘনঘন দুর্যোগের সম্ভাবনা রয়েছে।  কাজেই এমন একটি সময়ে দুর্যোগ পূর্ববর্তী সামরিক-বেসামরিক সমন্বয় আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে , এতে দুর্যোগ পূর্বে, সময়কালীন  এবং এর পরবর্তীতে মানুষের জীবন রক্ষা সম্ভব হবে।