দ্বিতীয় ধাপে যশোর সদর উপজেলায় নির্বাচনী সহিংসতায় একজন নিহত ও তিন জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ যুবলীগ কর্মীর শারীরিক অবস্থা আশংকাজনক। আর সহিংসতা ও কারচুপির অভিযোগে অন্তত ৬টি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। ভোট কারচুপিতে সহযোগিতার অভিযোগে তিন জন প্রিজাইডিং অফিসার ও সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারকে আটক করা হয়েছে। আর দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে বিকেলে একজন এএসআই-কে ক্লোজ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সদর উপজেলার চাঁচড়া ইউনিয়নের চাঁচড়া ভাতুড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে বোমাবাজি ও গোলাগুলিতে আবদুস সাত্তার বিষে (৬০) নামের এক ফেরিওয়ালা নিহত হন। এ ঘটনায় আবদুল হক (৫৬) নামের আরও একজন আহত হন। নিহত আবদুস সাত্তার বিশে যশোর শহরের খোলাডাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা। আহত আবদুল হক চাঁচড়া মধ্যপাড়া এলাকার নুরুল ইসলামের ছেলে। গোলযোগের পর এই কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়।
IMG0
যশোরের পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান জানান, স্থানীয় বিল্লাল মেম্বর ও লালের নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা বোমা হামলা চালায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ১০ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা সোয়া ১১টার দিকে একদল সন্ত্রাসী ব্যাপক বোমাবাজি করতে করতে কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা আত্মরক্ষায় গুলিবর্ষণ শুরু করে। গোলাগুলি ও বোমা হামলার মধ্যে পরে ফেরিওয়ালা (বাদাম বিক্রেতা) আবদুস সাত্তারের কপালে গুলি ও শরীরে বোমা লাগে। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। তার লাশ উদ্ধার করে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়।
কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার মোহাম্মদ সেলিম বলেন, সোয়া এগারটার দিকে কেন্দ্রের বাইরে দুই পাশ থেকে সন্ত্রাসীরা ব্যাপক বোমাবর্ষণ শুরু করে। এরপর আত্মরক্ষায় কেন্দ্রের ভিতর থেকে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা গুলিবর্ষণ করেছে। একপর্যায়ে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। তিনি আরও জানান, গোলাগুলি ও বোমা হামলার ঘটনার পর কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। ওই কেন্দ্রে মোট ভোটার ৩ হাজার ৫৫০ জন। বেলা সোয়া ১১টা পর্যন্ত ৩৩ শতাংশ ভোটগ্রহণ হয়েছিল।
কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা স্টাইকিং ফোর্সের প্রধান ও যশোর ডিবি পুলিশের ওসি আলী আহমেদ হাসমী জানান, সন্ত্রাসীরা বোমাবাজি শুরু করলে পুলিশ গুলিবর্ষণ করে। গোলাগুলি ও বোমা হামলা চলাকালে একজন আহত হয়। তাকে উদ্ধার করে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয় ।
IMG1
এদিকে সদর উপজেলার নওয়াপাড়া ইউনিয়নের আড়পাড়া স্কুল কেন্দ্রের বাইরে প্রতিপক্ষের হামলায় হাসান আলী (৩০) নামে এক যুবলীগ কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে কেন্দ্রের বাইরে সন্ত্রাসীরা হাসানকে লক্ষ্য করে গুলি করে। তার শরীরে ৩টি গুলি বিদ্ধ হয়। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে। যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, আহত হাসানের শরীরে ৩টি গুলি বিদ্ধ হয়েছে। তার শারীরিক অবস্থা আশংকাজনক।
চুড়ামনকাটি ইউনিয়নে প্রতিপক্ষ মেম্বর প্রার্থীর হামলায় আহত হয়েছেন ৫ নং ওয়ার্ডের মেম্বর প্রার্থী শুকুর আলী (৪০)। তিনি চুড়ামনকাটির খোদাবক্সের ছেলে। তাকে যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে এ ঘটনা ঘটেছে।
এদিকে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে বিকেলে উপশহর মহিলা কলেজ কেন্দ্রে দায়িত্বরত এএসআই হুমায়ুন কবিরকে ক্লোজ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে ১৫টি ইউনিয়নের ১৬২টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর সমর্থকরা কেন্দ্রের বাইরে ও ভিতরে নানাভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে বলে অভিযোগে জানা যায়। অধিকাংশ কেন্দ্রে বিএনপি সমর্থকরা ভোট দিতে পারেনি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনেক কেন্দ্রের বিএনপি প্রার্থীর এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়। উপশহর ইউনিয়নের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী রেজাউল ইসলাম কামাল ও তার ছেলেকে মারপিট করা হয়েছে। ভোটের আগের দিন রাতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিএনপি কর্মী সমর্থকদের হুমকি ধামকি দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সাবেরুল হক সাবু।
সহিংসতা ও কারচুপির অভিযোগে সদর উপজেলার অন্তত ৬টি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। স্থগিত হওয়া কেন্দ্রগুলো হলো চুড়ামনকাঠি ইউনিয়নের চুড়ামনকাঠি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কাশিমপুর ইউনিয়নের বিজয়নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চাঁচড়া ইউনিয়নের চাঁচড়া-ভাতুড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চাঁচড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়, গোয়ালদহ-কন্যাদহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র ও উপশহর শহীদ স্মরণী বিদ্যালয় কেন্দ্র। ৬ কেন্দ্রে ভোট স্থগিতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জেলা নির্বাচন অফিসার তারেক আহমেমদ।
বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আবদুস সালামের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত চুড়ামনকাঠি ইউনিয়নের চুড়ামনকাঠি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কাশিমপুর ইউনিয়নের বিজয়নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অভিযান চালান। সিল মারা ব্যালট পেপার জিম্মায় রাখার অভিযোগে বিজয়নগর সরকারি প্রাথমিক কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার রফিকুল ইসলাম ও সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ইসরাত জাহান এবং চুড়ামনকাঠি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের সরকারি প্রিজাইডিং অফিসার মোহাম্মদ বিন আকবরকে আটক করা হয়।
যশোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মুহম্মদ সোহেল হাসান বলেন, কেন্দ্র দুটির প্রিজাইডিং ও দুজন সহকারি প্রিজাইডিং অফিসারদের জিম্মায় সিল মারা ব্যালট পেপার পাওয়া গেছে। যে কারণে দুটি কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ বাতিল করে কর্মকর্তাদের আটক করা হয়েছে।