‘প্রকৃত শিল্পচর্চায় জানা প্রয়োজন কোথায় তাকে থামতে হবে’

 
পুরো একটা জনম আধুনিক গানের ক্ষেত্রে স্নিগ্ধতার রসদই জুগিয়েছেন যিনি; দেশের অত্যন্ত গুণী এই শিল্পী। তিনি সামিনা চৌধুরী।
 
নিজের কাজের ব্যস্ততার কথা জানতে চাইলেই খানিক থামিয়ে বলেন, ‘শিল্পী মানেই কি সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকতে হবে না-কিরে? সারাক্ষণ স্টুডিও, স্টেজে গাইতে থাকবো নাকি আমি ?  আমাদের কি অন্য কোনো কাজ নেই! নাকি তা করতে নেই। সংসার, সন্তানের দেখভাল করা, একজন মা হিসেবে পরিপূর্ণ দায়িত্ব পালন করাটাও তো আমারই কাজ। নাকি ?’
IMG0
 
এমনই নিরেট মনের এক শুদ্ধ শিল্পী তিনি। কিংবা তার সমান বড় মনের মানুষ। গান করছেন প্রায় ২ যুগেরও বেশি সময়। নিজের গানের ক্ষেত্রে পরিমিতি বোধের জায়গায় একচুলও বাড়তি আড়ম্বড় পাওয়া যাবে না তার কাছ থেকে। তিনিই সামিনা চৌধুরী।
 
নিজের এই দীর্ঘ ক্যারিয়ারে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির গল্প শুনতে চাইলে বলে বসেন ভিন্ন কথা।
 ‘ওসব হিসেব করিনি তো কোনোদিন। আর আমি অতকিছু বুঝিও না কিংবা বলতে পারিস বুঝতেও চাই না। আমার কাজ ভালো গান করা সেটাই করে যাই।’
বাবা এদেশের আধুনিক গানের কিংবদন্তী মাহামুদুন্নবী। যিনি লং প্লে যুগে সুরের রাজত্ব করে গেছেন। শ্রোতাদের কাছে এক মুগ্ধকর সুরের জাদুকর তিনি। তার যোগ্য কন্যা হিসেবে অডিও ক্যাসেট যুগে শ্রোতা দর্শকদের নিয়ে এদেশের আধুনিক গানের শীর্ষ শিল্পী তিনি নিঃসন্দেহে। তিনিই সামিনা চৌধুরী।
 
IMG1
কারণ হিসেবের খাতা উল্টে পাল্টে পড়লে হয়তো, অনেক শিল্পীই এদেশে গান গেয়েছেন বা গানের সাথে থেকে জীবনে অনেক কিছুই হয়েছেন। গানের খ্যাতি অন্য অংকে মেপে পেয়েছেন অনেক অনেক অর্জন বা বিসর্জন। অনেক খ্যাতিও যোগ হয়েছে অনেক গায়িকার যা তাদের গানের হিসেবের প্রাপ্তিতে পড়ে না। কিন্তু সেদিক দিয়েই নিরেট গানের ছন্দেই থেকেছেন একমাত্র শিল্পী তিনি সামিনা চৌধুরী। তাই কালের শ্রোতে আজ থেকে হয়ত আরো কয়েক দশক বা শতক পরের কোনো এক শ্রোতার মুগ্ধকর বিকেল রাঙাবে যার কণ্ঠের গানে। তিনি হয়তো আর কেউ নন। তিনি আমাদের সামিনা চৌধুরী।
IMG2
 
কিন্তু এই প্লে-ব্যাকে বা অডিওতে অল্প গাইছেন, সেটিই সারাদেশে আলোড়িত হচ্ছে প্রায় দুই প্রজন্ম সেও পেরিয়ে গেছে। এই প্রাপ্তিটাকে কিভাবে মূল্যায়ন করেন আপনি?
সামিনা চৌধুরী বলেন, ‘কই আমি কি খুব কম গান করি? আমার কাছে তো তা মনে হয় না। এর চাইতেও বেশি কাজ করারই বা কী আছে? আমার খুবই অসুস্থতা মনে হয়— এই অস্থিরতা, এইসব ব্যস্ততার গল্প। জীবনের জন্য বিরাম দিতে হয়। প্রকৃত শিল্পের জন্যও জানা প্রয়োজন কোথায় আমাকে থামতে হবে।
আমার কাছে তাই এইসব অস্থিরতার নাম হলো— এই যে বারে বারে আমাকে টিভিতে মুখ দেখাতেই হবে। ইদানিং আবার অনেকে বলে শুনি যে, এটা না করলে নাকি এখনকার শ্রোতারা শিল্পীকে ভুলে যায়। কী বাজে কথা! কী অপমানের কথা! আমি বলবো খুবই ভুল ও বাজে কনসেপ্ট। আর যদি এসব করে কোনো শ্রোতা বা শ্রোতাগোষ্ঠি একজনকে ভুলেই যায়, তাহলে ভাবতে হবে আমার বা তার গানের সেই শক্তি নেই যা আমার শ্রোতাকে আটকে রাখতে পারে। সে কারণে আমি বলবো শিল্পীকে যেমন দায়িত্বশীল হতে হবে তেমনি দায়িত্বশীলতা দেখানো প্রয়োজন একজন ভালো শ্রোতারও।’
এ কারণেই কী এই যে এত এত প্রতিদিনকার টিভি লাইভ অনুষ্ঠানগুলো এড়িয়ে চলেন বা কম আসেন আপনি?
— তা বলা যায়। কিন্তু আমার গানগুলোতে খানিক আলাদা উপস্থাপনা না করতে পারলে কেনই বা আসবো? শ্রোতাদের যদি লাইভ অনুষ্ঠানে নতুন কিছু না-ই দিতে পারি, কোনো প্রয়োজন আছে এরকম মুখ দেখানোর?
 
IMG3
ডিজিটাল এই অডিও যুগে আজকালকার শিল্পীরা নিজের ফ্যান পেজ নিজেই গড়ছে, তাতে ডলার খরচ করে ফ্যানের সংখ্যাও বাড়ছে। কিংবা একটি সিঙ্গেলস বের করে তার ভিডিও , প্রচার প্রসারের কাজটিও করতে হচ্ছে তাকেই। এই পন্থাকে কেমন চোখে দেখেন আধুনিক গানের বরেণ্য এই শিল্পী?
অনেকটা আত্মপলোব্ধি নিয়েই বললেন, ‘জানিস; আমার কাছে এটা খুবই কষ্টদায়ক ও অবিবেচক একটা কাজ বলে মনে হয়। যদিও এটাকে আমার একান্ত নিজস্ব মত হিসেবেই বলবো আমি। কারণ একজন শিল্পীর শুধু গানটার প্রতিই মনোসংযোগ দেয়া উচিত। তবেই দারুণ কিছুর জন্ম হবে। আমাকে যদি এত কিছুই মেনটেইন করতে হয়, তখন তো পাগল হয়ে যাওয়ার যোগাড় হবে আমার। আমি এই প্রথায় বিশ্বাসী নই। হয়ত আমি সেকেলে।’
 
এরপরও শুধুমাত্র সামিনা চৌধুরির কণ্ঠ মাধুর্যেই, শ্রোতাদের আকুল চাহিদায়, যখন বাংলা গানের বাজার যখন নানান নকল সুর বা বেসুরো অটোটিউনার শিল্পীতে বাজার সয়লাব হয়ে যায়, তখন এক পশলা বৃষ্টির মতোই কিছু ভালো গান আসে সামিনা চৌধুরীর কণ্ঠে। বাংলা গানের শুদ্ধতার সমতা একজন সামিনা চৌধুরী এভাবেই করে চলেছেন।
 
 তবুও তো অনেকদিন হলো সামিনা চৌধুরীর নতুন কোনো গান পাওয়া যাচ্ছে। একজন ভক্ত শ্রোতা হিসেবেই যখন তার কাছে নতুন গানের খবর অভিযোগের সুরে জানতে চাই, তখন তিনি আস্বস্ত করেন,
নতুন গান হয়ত আগামী ঈদেই পাওয়া যাবে।
একটি নয় দুটি গানের অ্যালবাম রিলিজের সম্ভাবনা রয়েছে তার। তারই কাজ চলছে এখন। এছাড়া দেশে ও দেশের বাইরে স্টেজ শো’র ব্যস্ততা তো রয়েছেই। প্লে-ব্যাকেও দুই প্রজন্মের নায়িকাদের কণ্ঠে দারুন কোনো রোমান্টিক গান মানেই সামিনা চৌধুরীর গান।
IMG4
 
শিল্পীদের দলবাজি বা রাজনৈতিকভাবে নতুন পরিচয় বা খ্যাতি নেবার যে দৌড়, সেই দৌড়েও এদেশের একাধিক শিল্পীরা সামিল হয়েছেন। এখানেও যেন বিরল ও প্রশংসিত ব্যতিক্রমী অবস্থানে থেকেছেন সামিনা চৌধুরী। কিছু জানতে চাইলে সেই অকপট সাধারণ-সাবলীল জবাব, ‘এত কিছু তো জানি নারে। আমি গানের মানুষ। গান নিয়েই থাকতে চাই, গান নিয়েই থাকতে চাই ।’
 
নিজের একাধিক গানের জনপ্রিয়তা যখন আকাশচুম্বী, তখন এই সাবলীল উত্তর যখন আসে কারো কাছ থেকে। তখনই বুঝা যায়— তিনিই প্রকৃত বা নিরেট এক শিল্পী। তিনিই সামিনা চৌধুরী।

শুভকামনা আপনার প্রতি ইত্তেফাক অনলাইনের পক্ষ থেকে।