পাটের সুদিন ফিরছে

পাটকে অভিহিত করা হয় ‘সোনালি আঁশ’ হিসাবে। এ দেশের অর্থনীতিতে একসময় পাটের অবস্থান ছিল প্রাণভোমরার মতো। স্বাধীনতার আগে বৈদেশিক মুদ্রার সিংহভাগ আসত পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি থেকে। দেশের শিল্প খাতও ছিল অনেকটা পাটনির্ভর। তবে সময়ের ব্যবধানে পাট তার অবস্থান হারিয়েছে। কৃত্রিম তন্তুর আবিষ্কার পাটকে বহুক্ষেত্রে কোণঠাসা করে ফেলে। এজন্য গবেষণাগত ঘাটতিও কম-বেশি দায়ী। কৃত্রিম তন্তুর দাম সস্তা হওয়ায় পাট বাজার ধরার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে। তবে পাটের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত হলে এর সুদিন ফিরিয়ে আনা সম্ভব। আর এখন সেদিকেই নজর দিয়েছে সরকার।
 
ইতোমধ্যে পাটকে কৃষিপণ্য হিসাবে ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বলেছেন, এখন থেকে পাট উত্পাদন, বিপণন ও রপ্তানির ক্ষেত্রে কৃষিপণ্য যেসব সুবিধা পায় তা পাটের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। গত কয়েক বছর ধরে পাটের বহুমুখী ব্যবহারের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর এমন ঘোষণায় পাটের সুদিন ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে।
 
চলতি মাসে একটি অনুষ্ঠানেও পাটের সুদিন ফিরে আসার ইঙ্গিত দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আজকের বাংলাদেশ তথা তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের পাট রপ্তানির অর্থ পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হতো। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে পাকিস্তানের মোট রপ্তানি আয়ের দুই-তৃতীয়াংশ আসত পাট থেকে। বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে বছরে পাট ব্যাগের চাহিদা ১০ কোটি থেকে বেড়ে ৭০ কোটি হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি পাটকলে কর্মচাঞ্চল্য ফিরেছে। বন্ধ পাটকল পুনরায় চালু করায় ব্যাপক কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।
 
কদর বাড়ছে পাটজাত হস্তশিল্পের: পাট থেকে প্রয়োজনীয় পণ্য তৈরি করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন শৌখিন পণ্যও তৈরি করা যেতে পারে। পাট থেকে সাধারণত চট তৈরি করা হয়। এই চট বিভিন্ন আকৃতিতে কেটে নিয়ে সেলাই ও নকশা করে নানা ধরনের শৌখিন পণ্য যেমন— ব্যাগ, ম্যাট, কলমদানি, পাপোশ ইত্যাদি তৈরি করা যায়। ঘর সাজানোর নানা সামগ্রী তৈরি হচ্ছে পাট থেকে। এর মধ্যে রয়েছে শতরঞ্জি, গায়ের ব্লেজার, জুতা, রং-বেরঙের ব্যাগ, মেয়েদের হ্যান্ড ব্যাগ, ঝুড়ি, ওড়নার মতো বিচিত্র সব পণ্য। এগুলোকেই পাটজাত হস্তশিল্প বলা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের কদর বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই পাটকে ঘিরে অর্থনীতিতে নতুন প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়েছে।
 
নতুন আইন :পাট দিয়ে উন্নতমানের কাপড়, জুতা, কার্পেটসহ নানা পণ্য তৈরি করা সম্ভব। আশার কথা, সরকার সেদিকে এগোনোর চেষ্টা চালাচ্ছে। দেশে এখন ১৩১ ধরনের পাটপণ্য তৈরি হচ্ছে। চাল, চিনি, গম, ধান, ভুট্টা ও সারের মোড়কে পাটের বস্তার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে ২০১০ সালে পণ্যে পাটজাত মোড়কের ব্যবহার বাধ্যতামূলক আইন করা হয়েছে। কৃত্রিম তন্তুর আগ্রাসন থেকে দেশের প্রকৃতিকে বাঁচানোর লক্ষ্যে ‘প্যাকেজিং অ্যাক্ট’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশেই ২০ লাখ কাঁচা পাটের অভ্যন্তরীণ বাজার তৈরি করা হয়েছে।
 
বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মো. কামাল উদ্দীন বলেন, পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক আইন করায় স্থানীয় পর্যায়ে পাটের চাহিদা ২০ থেকে ৩০ ভাগ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। এ কারণে মোট চাহিদাও বেড়ে গেছে। তিনি জানান, দেশে পাট উত্পাদন হচ্ছে ৭৫ লাখ বেল। উত্পাদন আরো বৃদ্ধির জন্য নানামুখী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ফলন পার্থক্য কমানো হচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চলে পাটের উত্পাদন বৃদ্ধির কাজ চলছে।
 
কম সুদে ঋণ পাবে চাষিরা :পাটকে কৃষিপণ্যের মর্যাদা দেয়ায় এ পণ্যের উত্পাদন, বাজারজাত এবং রপ্তানিতে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত হবে। দেশের কৃষি অর্থনীতিতে পাট এখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাটের সুদিন ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের নানামুখী পদক্ষেপ সে কারণে প্রশংসার দাবিদার। কৃষি বিজ্ঞানী এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, পাট কৃষিজাত পণ্য হওয়ায় পাট উত্পাদনের ক্ষেত্রে কৃষকরা ১০ শতাংশের কম সুদে ঋণ পাবে। এছাড়া পাট নিয়ে যারা কাজ করছেন সকলেই পাবেন নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা। তিনি জানান, দেশে এখন পাটের জাত ৩৮টি, আরো জাত উদ্ভাবনের জন্য গবেষণা চলছে।
 
প্রয়োজন আরো গবেষণা: তবে পাটের অস্তিত্ব রক্ষায় বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিতকরণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। এ জন্য পাট নিয়ে গবেষণা বাড়াতে হবে। বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে এর বাজার আরও সমপ্রসারণ হবে। পাট আবারও হয়ে উঠবে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম মাধ্যম। অন্যদিকে পাটের ‘জিনোম’ আবিষ্কার এ পণ্যের সুদিন ফিরে আসার সম্ভাবনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়া ন্যায্যমূল্যে যথাসময়ে পাট চাষিদের কাছ থেকে পাট ক্রয়, পাটকলগুলোর সার্বিক সংস্কার করে এগুলোর উত্পাদন ক্ষমতা বাড়ানোর বিশদ পরিকল্পনা, দেশে-বিদেশে পাটের বাজার বাড়াতে পাটজাত পণ্যের প্রদর্শনী, মেলা, প্রচার ও জনগণের মধ্যে দেশীয় পণ্যের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টিতে নানামুখী পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। 
 
পাট চাষিদের ন্যায্য সুবিধা আদায়ের কাজে সম্পৃক্ত ‘পাটের লড়াই’র নির্বাহী পরিচালক নাসিমুল আহসান বলেন, সর্বনাশা পলিথিনের ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে সুলভ ও আকর্ষণীয় পাটপণ্য তৈরি করার প্রতি জোর দিতে হবে। পাটকলগুলোর উত্পাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে ঋণ প্রদানে ব্যাংকগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। সেই সঙ্গে শ্রম ব্যবস্থাপনায় আধুনিক ও প্রযুক্তিগত উত্কর্ষ, শ্রমিক স্বার্থ সংরক্ষণে মনোযোগী হতে হবে। পাটজাত পণ্যের জনপ্রিয়তা বাড়াতে আরো প্রচার অভিযান চালাতে হবে। একই সঙ্গে পাট শ্রমিকদের মজুরি সময়োপযোগী করার ব্যাপারেও দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন।
 
রপ্তানি ও চাহিদা চিত্র :পাট রপ্তানিকারকদের সংগঠন জুট এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যানুযায়ী, এখন বাংলাদেশ থেকে প্রতিমাসে ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার পাটপণ্য বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ২৫ দেশের বাইরেও দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়াসহ ১২০টি দেশে এসব পণ্যের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। বিশ্ববাজারে ৫০০ বিলিয়ন পিস শপিং ব্যাগের চাহিদা রয়েছে। পাটজাত শপিং ব্যাগ রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভালো সুযোগ গ্রহণ করতে পারে। তবে এ ব্যাপারে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। প্রকৃতপক্ষে আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে আগামী কিছুদিনের মধ্যে পাট শিল্প বিশ্বের নজর কাড়বে।
 
এছাড়া পলিথিন শপিং ব্যাগ ব্যবহার ও বহন একটি অপরাধ, স্বাস্থ্যসম্মতও নয়। এ কারণে স্থানীয় পর্যায়ে পাটের চাহিদা বেড়েছে। ফ্যাশনে বৈচিত্র্য আনতেও দিন দিন বাড়ছে পাটজাত পণ্যের চাহিদা। ঐতিহ্যবাহী পণ্য বলেই ক্রেতারা পাটজাত পণ্য দেখছেন এবং কিনছেন। বিভিন্ন মেলায় পাট জাতীয় পণ্যের স্টল আর প্যাভেলিয়নে গেলে এর প্রমাণ পাওয়া যায়।
 
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) পরিচালিত ‘জুট এন্ড বাংলাদেশ ইকোনমি’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, পণ্যে পাটজাত মোড়কের ব্যবহার বাধ্যতামূলক আইন বাস্তবায়ন সম্ভব হলে পাটের ব্যাগ ব্যবহারের বার্ষিক চাহিদা ৮৪ কোটি পিসে উন্নীত হবে। বর্তমানে এ চাহিদা মাত্র ৯০ হাজার পিস। এছাড়া সরকার ঘোষিত চাল, চিনি, গম, ধান, ভুট্টা ও সারের মোড়কে পাটের ব্যবহার নিশ্চিত হলে বছরে ৫০ থেকে ৫৫ কোটি পাটের বস্তা প্রয়োজন পড়বে।
 
মন্ত্রী যা বলেন:পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম জানিয়েছেন, পাট থেকে শুধু ছালা, বস্তা, চট এগুলোই উত্পন্ন হয় না। আজকের বাংলাদেশে আমাদের প্রাইভেট ইনভেস্টররা ১৩১ ধরনের পাটপণ্য উত্পাদন করছে এবং বিদেশে এই পণ্যগুলোর খুবই চাহিদা। এছাড়া আমাদের অভ্যন্তরীণ মার্কেটেও এই চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি জানান, আমরা ইতিমধ্যেই নতুন প্রযুক্তি পেয়েছি। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বল্প দামে পলিথিন ব্যাগের বিকল্প হিসেবে পাটের ব্যাগ তৈরি করবো। এতে করে আমাদের পরিবেশ রক্ষা পাবে, পাশাপাশি পাটের হারানো ঐতিহ্য, গৌরব ফিরে আসবে। কৃষক পাট চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে এবং তাদের ন্যায্যমূল্যও পাচ্ছে। এ বছর কৃষক এক মণ পাট বিক্রি করে ১ হাজার ৭শ’ টাকা পেয়েছে। ক্রমেই আমরা এভাবে পাটের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে নিয়ে আসবো।