রিজার্ভের অর্থ হ্যাক

মূল হোতা চিহ্নিত হচ্ছে না

ফিলিপাইনে পাচার হওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার আদায়ে ক্যাসিনো ও জাঙ্গেট অপারেটরদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে মামলা করবে দেশটির মুদ্রা পাচার প্রতিরোধ কর্তৃপক্ষ (এএমএলসি)। চুরির ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজন হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে এ মামলা করা হবে।
 
আগামী সপ্তাহেই এ মামলা করা হবে বলে জানা গেছে। আর জাঙ্কেট অপারেটর কিম অং আরও ৯৭ লাখ ডলার ফিরিয়ে দেবেন বলে জানিয়েছেন।
 
গতকাল মঙ্গলবার দেশটির সিনেটের ব্লু রিবন কমিটির চতুর্থ দফায় শুনানিতে জেরার মুখোমুখি করা হয় সন্দেহভাজনদের। তবে তারা পরস্পর বিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন। ফলে পাচারের ঘটনায় যুক্ত মূল হোতাদের এখনও চিহ্নিত করা যায়নি। ফিলিপাইনের গণমাধ্যম ইনকোয়ারার ও র‌্যাপলার সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
 
এদিকে চুরির ঘটনা তদন্তে সহায়তা করতে মঙ্গলবার রাতেই সিআইডির তিন সদস্যের একটি দল ফিলিপাইনের ম্যানিলার উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন। সিআইডির ডিআইজি সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের এই দলে অন্য দু’জন সদস্য হলেন সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (অর্গানাইজড ক্রাইম) মির্জা আব্দুল্লাহেল বাকী ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রায়হানুল ইসলাম।
 
অন্যদিকে আজ বুধবার সকাল সাড়ে ১১টায় শ্রীলঙ্কার কলোম্বোর উদ্দেশে আরো একটি তদন্ত সহায়তাকারী দল রওনা দেবে। পুলিশ সদরদফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এনসিবি) রফিকুল রনি’র নেতৃত্বে এ দলে অপর দুই সদস্য হলেন, সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার জান্নাত আরা ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার নাজমূল আলম।
 
গতকালের শুনানিতে এএমএলসির নির্বাহী পরিচালক জুলিয়া বাকে-আবাদ বলেছেন, আমরা এর মধ্যেই মামলার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছি। আশা করছি আগামী সপ্তাহেই এ (বেসামরিক সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ) মামলা করতে পারব।
 
জানা গেছে, ফিলিপাইনে এই ধরনের মামলায়, অবৈধ সম্পদ ব্যবহার করা হয়েছে এমন প্রমাণ পেলে সরকার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে। তবে সম্পদের মালিকের আইনী লড়াইয়ের অধিকার থাকে। কিন্তু তাকে প্রমাণ করতে হবে যে, তার সম্পদ বৈধ অর্থ থেকে এসেছে।
 
এদিকে কিম অং আরো ৯৭ লাখ ডলার ফেরত দিতে রাজি হয়েছেন। এর আগে দু’দফায় তিনি ৫৪ লাখ ডলারের বেশি অর্থ এএমএলসির কাছে ফেরত দিয়েছেন। শুনানিতে কিম অং জানান, আগামী ১৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে ওই পরিমাণ অর্থ তিনি সিনেট কমিটির কাছে জমা দেবেন।
 
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার বেইজিংয়ের শুহুয়া গাও এবং ম্যাকাওয়ের ডিং জিজে নামে দুই জাঙ্কেট এজেন্ট (জুয়ার মক্কেল) ফিলিপাইনে নিয়ে যায় বলে সিনেট কমিটির শুনানিতে দাবি করেছেন কিম অং। আর শুহুয়ার কাছ থেকে পাওয়া ধার উসুল হিসেবে পাওয়া অর্থই তিনি ফেরত দিচ্ছেন, চুরির সঙ্গে তার সম্পর্ক নেই।
 
গতকালের শুনানিতে জেরার মুখোমুখি করা হয় ব্যবসায়ী কিম অং, রিজাল ব্যাংকের সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক মায়া সান্তোস দেগুইতো এবং ফিলরেম সার্ভিসের প্রধান বুতিস্তাকে। তারা অর্থ লেনদেনের বিষয়ে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন। ফলে ঘটনার পিছনে কারা ছিল সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেনি সিনেটের তদন্ত কমিটি। মূল হোতাদের চিহ্নিত করা না গেলেও, কিভাবে এ অর্থ গেলো, সেই রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা চালাচ্ছে ফিলিপাইনের সিনেট।
 
শুনানিতে রিজাল ব্যাংক থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলরেম সার্ভিসে স্থানান্তরের কথা জানান ব্যাংকটির সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক দেগুইতো। তবে ফিলরেম বলছে, নির্দেশনা অনুযায়ী এ অর্থ সরবরাহ করা হয়েছে, ব্যবসায়ী উইক্যাং জু আর দুটি ক্যাসিনোতে। ৫ কোটি ডলারের হিসাব মিললেও বাকি ৩ কোটি ১০ লাখ ডলারের এখনও সন্ধান মেলেনি। এএমএলসি সিনেট কমিটিকে জানায়, রিজাল ব্যাংকে থাকা ফিলরেমের দুটি হিসাব জব্দ করা হয়েছে। যেখানে পাওয়া গেছে ২৯ হাজার ফিলিপিনো পেসো। এ নিয়ে ফিলিপাইন কর্তৃপক্ষের কাছে সব মিলিয়ে ৫৫ লাখ ডলার জমা পড়েছে।
 
মায়া সান্তোস দেগুইতো বলছেন, এ ঘটনার সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা নেই। আমি এখানে কেবল ঊর্ধ্বতন ব্যাংকার ও বড় ব্যবসায়ীদের ‘দাবার গুটি’ হিসাবে ব্যবহূত হয়েছি।
 
তিনি বলেন, সমপ্রতি চুরির ঘটনায় সম্পদশালীরা সব দোষ নির্দিষ্টভাবে শুধু আমার ওপরেই চাপিয়ে দিয়েছে। সত্য বলতে এ ধরনের বিশাল মাত্রার অপরাধ কেবল সর্বোচ্চ ধনী ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণে সম্ভব হতে পারে। যাদের অনেক ক্ষমতা রয়েছে এবং যারা বিভিন্ন দেশে প্রভাব বিস্তার করে।
 
মায়া দেগুইতো চুরির টাকা স্থানান্তরে ব্যবহারের জন্য পাঁচটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ করে দেন। তিনি বলেন, এটা ষড়যন্ত্র ছিল। কিন্তু এ সম্পর্কে তার কোনো ধারণা ছিল না।
 
ফেব্রুয়ারির শুরুতে ভুয়া নির্দেশনা পাঠিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্কে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইনের রিজল কমার্শিয়াল ব্যাংকে পাঠানো হয়। রিজল ব্যাংকের চারটি অ্যাকাউন্ট থেকে ওই অর্থ ক্যাসিনোর জুয়ার টেবিলে হাতবদল হয়ে ফিলিপাইনের মুদ্রা ব্যবস্থায় মিশে যায় বলে স্থানীয় পত্রিকাগুলো খবর প্রকাশ করে।