ফুলবাড়ীয়া উপজেলার ১৩ টি ইউনিয়নের মধ্যে ৫ টি ইউনিয়নে পাহাড়ি লাল মাটিতে এক সময় প্রচুর পরিমাণে আঁখের আবাদ হত। অন্যান্য ফসলের তুলনায় দামের দিক দিয়ে কম হওয়ায় আঁখ চাষিরা আখ আবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করে কৃষক। সেই সাথে উৎপাদন কমতে থাকে আখ থেকে উৎপন্ন করা লাল চিনি। দেশের কোথায় লাল চিনির উৎপাদন না হলেও দিনের পর দিন এর উৎপাদন কমছে।
লাল চিনি শুধু মজাদারই নয়, স্বাস্থ্য সম্মত। লাল চিনির তৈরি ফুকা পিঠা, তিলে লাড়ু, মুড়ির মোয়া, নারিকেলের তক্তি খেতে খুব মজাদার ও সু-সাদু। এ ছাড়াও লাল চিনি তৈরি হয় মজাদার খাবার 'খীর'। এখনো ফুলবাড়ীয়ায় নতুন জামাইকে শাশুড়ি গরম খীর খাইয়ে জামাই আদার করে থাকেন। জামাই তাতে তুষ্ট হন। গ্রামে প্রবাদ রয়েছে 'করলে তৈরি লাল চিনির খীর' খাওয়ার জন্য পড়ে যায় ভিড়। লাল চিনির মিঠাই ও খুব মজাদার। ঘরের বৌ-ঝি'রা চিনির মিঠাই কাঁচের বৈয়ামে ভরে রাখে মাসের পর মাস। সারাদিন বাড়ির কাজ শেষে বৌ-ঝি'রা যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন লাল চিনির একটুকরো মিঠাই খেয়ে ক্লান্তি দূর করে। আঁখের কাচা রস যেমন সুস্বাদ তেমনি উপকারী। আর পাকা (জালকরা) রস অনেক দিন বোতল জাত করে। বোতল-জাত রস আত্মীয় স্বজনদের বাড়ী নিয়ে যাওয়ার ঐতিহ্য যুগ যুগ ধরে চলছে ফুলবাড়ীয়ায়।
পৌষ মাসের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে একটানা ফাল্গুন মাস পর্যন্ত আঁখ মাড়াই ও লাল চিনি তৈরির কাজ চলে। আঁখ চাষিরা সাধারণত ফাল্গুন মাসের শেষের দিক থেকে শুরু করে বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি আখের চারা রোপণ শেষে খর কুটা দিয়ে রোপণকৃত আঁখ ক্ষেতের আইলে ঢেকে দেয়া হয়। কিছুদিন পর চারা হতে অংকুর গজিয়ে বড় হয়ে আঁখ গাছে রূপ নেয়। এর পর শুরু হয় আঁখ ক্ষেতের পরিচর্যা।
প্রয়োজন মতো জৈব ও রাসায়নিক সার দেয়ার পর পূর্ণাঙ্গ আঁখে পরিণত হয়। আঁখ মাড়াইয়ের পূর্বে চাষিরা লাল চিনি তৈরির জন্য জালঘর তৈরি করে। লাল চিনি তৈরিতে প্রথমে ৩ শলা বিশিষ্ট লোহার চাপ যন্ত্রের সাহায্যে সেলু মেশিন অথবা যন্ত্রে বিদ্যুৎ চালিত মটর সংযোগ দিয়ে আবার কেউ কেউ চাপ যন্ত্রটি গরু-মহিষ দ্বারা ঘানি টেনে আঁখ মাড়াইয়ের মাধ্যমে রস বের করে। জালঘর চুলায় দেয়া লোহার বড় কড়াইয়ে পরিমাণ মতো কাঁচা আঁখের রস দিয়ে আধাঘণ্টা পরিমাণ জ্বাল দিতে হয়। এক পর্যায়ে ঘন গরম সর আগুনের চুল্লী থেকে নামিয়ে পাত্রটিতে লাল চিনি তৈরির কারিগর কাঠের তৈরি হাতল দিয়ে দ্রুত ঘর্ষণ শুরু করে। আস্তে আস্তে ঠাণ্ডা হতে থাকে এবং এক পর্যায়ে ঘন জ্বাল দেয়া সর মিহি লাল দানায় রূপ নেয়।
প্রতি কাঠায় ৪৫ থেকে ৫০ টিন আখের রস হয়। প্রতিদিনে ১৫ থেকে ১৬ কেজি কাঁচা রস হয়। ১টিন কাঁচা আখের রস থেকে লাল চিনি পাওয়া যায় ৪ থেকে ৫ কেজি। হাতে তৈরি লাল চিনি কৃষক প্রথমে রৌদ্রে শুকিয়ে ঝর ঝরা করে বিক্রি করে দেয় বেপারীদের কাছে। জ্বাল ঘরের চুল্লীতে কাঁচা রস জ্বাল দেয়ার কাজটি করে আঁখের শুকনো পাতা দিয়েই।
উপজেলার পলাশতলী বয়ারমারা গ্রামের আঁখ চাষি আলহাজ আব্দুস ছোবহান জানান, তিনি এক সময় প্রতি একর জমিতে আঁখের আবাদ করতেন। দামের দিক দিয়ে কম হওয়ায় তিনি এখন ৩/৪ কাঠা জমিতে আঁখের আবাদ করেন।
উপজেলা কৃষি অফিসার ড. নাসরিন আক্তার বানু জানান, উপজেলায় প্রায় ৭ হাজার কৃষক ১২৮০ হেক্টর জমিতে আখের চাষ করেছে। রাধাকানাই কালাদহ, পলাশতলী, বাকতা, বিদ্যানন্দ এসব এলাকার আঁখ চাষিদের উন্নত প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি দেয়া হলে ফুলবাড়ীয়ায় অধিক লাল চিনি উৎপাদন হবে।
বর্তমান বাজারে সাদা চিনি প্রতি কেজি ৪৫ টাকা আর লাল চিনি প্রতি কেজি ৬৫থেকে ৭০ টাকা কেজি। কৃষকের মতে গত বছরের চেয়ে এ বছর লাল চিনির বাজার অনেক ভালো। মৌসুমের শুরুতেই পাইকারি প্রতি মণ লাল চিনি বিক্রি হচ্ছে ২৩শ থেকে ২৫শ টাকা মণ দরে।
উপজেলার কৈয়ারচালা, বিদ্যানন্দ, পলাশতলী, কালাদহ, বাকতা ও সোয়াইতপুর গ্রামের কৃষক আ. খালেক, তৈয়ব আলী, রুহুল, দৌলত ইকবাল ও হোসেন আলী নামের কৃষক বলেন, সারের মূল্য বৃদ্ধি, মাড়াই সমস্যা, শ্রমিক মজুরী বৃদ্ধি, উন্নত আখের চাড়াসহ চাষিদের প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোন সু-দৃষ্টি না থাকায় আঁখ চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।